পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে গাছপালা-জীবজন্তুর বৈচিত্র্য
অনেকেই সম্ভবত জানে না, ‘বক্সা’ নামটি এসেছে কোথা থেকে? তারা শুনলে অবাক হবেন, বাঘ সংরক্ষণ কেন্দ্রের অনেক আগে থেকেই সেখানে ছিল এক দুর্গ। পূর্ব ভারতের সবথেকে প্রাচীন দুর্গ বলা হয় তাকে। ১৮৬৫ সালে কোচ রাজার আমন্ত্রণে সিঞ্চুলা চুক্তির মাধ্যমে এটির দখল নেয় ব্রিটিশরা। বাঁশের কাঠামো বদলে তাঁরা পাথরের স্থাপত্য গড়ে তোলেন।

১৯৩০-এর দশকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মোড়কে জেলখানা এবং ডিটেনশন ক্যাম্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এই দুর্গ। অনেকে বললেন, দুর্গমতা এবং নির্যাতনের কথা ধরলে আন্দামানের কুখ্যাত সেলুলার জেলের পরেই আসত বক্সার নাম। অনুশীলন সমিতি, যুগান্তর দলের মতো বিপ্লবী সংগঠনের ‘তারকা’ স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বন্দি রাখা হত এখানে। যেমন কৃষ্ণপদ চক্রবর্তী কারাবাস করেছিলেন বক্সায়। স্বাধীনতার পরও কয়েদ করা হয় কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়-সহ কমিউনিস্ট বিপ্লবী এবং বুদ্ধিজীবীদের।

তবে এখন বক্সা আর দুর্গম নয়। নানা পথ ধরে সহজেই পৌঁছে যেতে পারেন। পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে গাছপালা-জীবজন্তুর বৈচিত্র্য। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮৬৭ মিটার (২৮৪৪ ফুট) উঁচুতে আলিপুর দুয়ার জেলায় বক্সা বাঘ সংরক্ষণ কেন্দ্রের মধ্যেই রয়েছে দুর্গ। সবথেকে কাছের শহর আলিপুর দুয়ার। দূরত্ব মোটামুটি ৩০ কিলোমিটার। অনেক অনেক আগে ভুটানের রাজা রেশম পথের একটা অংশ সুরক্ষিত রাখতে দুর্গ তৈরি করেছিলেন। তিব্বত থেকে ভারতের মধ্য দিয়ে গিয়েছিল রেশম পথ। ১৯৫০-এর দশকে চিনা আগ্রসনে তিব্বত থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীরা আশ্রয় নিতেন দুর্গে।
৭৬০ বর্গকিলোমিটার জুড়ে বক্সা বাঘ সংরক্ষণ কেন্দ্রের বিস্তার। প্রায় ২৮৪ রকমের পাখি, ৭৩ রকমের বড়ো আকৃতির স্তন্যপায়ী প্রাণীর বাস এখানে। রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, এশিয়ান হাতি, গৌড় (ভারতীয় বাইসন), সম্বর হরিণ, ক্লাউডেড লেপার্ড, ভারতীয় লেপার্ড, বুনো শুয়োর, দৈত্যাকার কাঠিবেড়ালি এবং আরও অনেক জীবজন্তু। এই বাঘ সংরক্ষণ কেন্দ্রকে ১৯৯৭ সালে জাতীয় উদ্যানের মর্যাদা দেওয়া হয়।
জাতীয় উদ্যানের দক্ষিণ সীমান্তে রয়েছে ভুটানের আন্তর্জাতিক সীমানা। তাই বক্সার খুব কাছেই ভুটানের ফিবসু অভয়ারণ্য। দক্ষিণ সীমানা ঘেঁষে চলে গিয়েছে জাতীয় সড়ক ৩১সি। পূর্বদিকে আসামের মানস জাতীয় উদ্যান। যার ফলে ভারত এবং ভুটানের মাঝখানে এশিয়ান হাতি চলাচলের আন্তর্জাতিক করিডোর হয়ে উঠেছে বক্সা বাঘ সংরক্ষণ কেন্দ্র। দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে জলদাপাড়া অভয়ারণ্য পর্যন্ত হাতি চলাচলের করিডোর হয়ে উঠেছে চিলাপাতা জঙ্গল।

বাঘ, হরিণ, লেপার্ড, হাতি ছাড়াও বক্সায় থাকে অসংখ্য প্রজাতির মাছ, সরীসৃপ, উভচর। ২০১৮ সালে প্রথম দাগওয়ালা এশিয়াটিক সোনালি বেড়ালের দেখা মেলে এখানে। আরও অনেক বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির জীবজন্তু রয়েছে, যাদের দেখা আপনি পাবেন না। সবুজ অরণ্যের মোহময় সৌন্দর্য আপনার মন ভরিয়ে দেবে। আট রকমের বন আছে বক্সায়, যা উদ্ভিদবিদদের গবেষণার বিষয়। তাঁদের কাছে বক্সা জাতীয় উদ্যান স্বর্গের থেকে কম লোভনীয় নয়।

পর্যটকদের আরেকটি আকর্ষণ রাজাভাতখাওয়া শকুন প্রজনন কেন্দ্র। লুপ্তপ্রায় ভারতীয় শকুন সংরক্ষণ করা হয় সেখানে। ভারতে এমন প্রতিষ্ঠান কেবল আর একটি রয়েছে। বক্সায় ঢোকার প্রধান মুখেই রয়েছে রাজাভাতখাওয়া। জয়ন্তী নদীর ধার দিয়ে জয়ন্তী পাহাড় অবধি বিস্তৃত ছবির মতো সুন্দর রাস্তায় গাড়ি নিয়ে চলার মজাই আলাদা। জঙ্গল সাফারির অনেকগুলো রুট আছে বক্সায়। যার বেশিরভাগই বুক করা যায় কিংবা শুরু হয় জয়ন্তী থেকে।

বক্সা ঘুরতে গেলে থাকার জায়গা রয়েছে অনেক। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগমের নিজস্ব অরণ্য ট্যুরিজম প্রপার্টিতে (পূর্বতন জলদাপাড়া ট্যুরিস্ট লজ) আত্মীয়-পরিবার-বন্ধুদের নিয়ে থাকতে পারেন নিশ্চিন্তে। ভাড়া সাধ্যের মধ্যেই। চারদিকে নয়নাভিরাম প্রকৃতি। দেখতে পারেন চিলাপাতা ফরেস্ট। বক্সা থেকে ১ ঘণ্টা ড্রাইভ করে পৌঁছনো যায় সহজেই। দূরত্ব প্রায় ৫০ কিলোমিটার।

বেশিরভাগ পর্যটক বক্সা যান নিউ জলপাইগুড়ি অথবা আলিপুর দুয়ার স্টেশন দিয়ে। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে রাজাভাতখাওয়া ১৬০ কিলোমিটার প্রায়। ৪ ঘণ্টার মতো সময় লাগে। আলিপুর দুয়ার স্টেশন থেকে রাজাভাতখাওয়া চেকপোস্ট অনেক কাছে। ১০ কিলোমিটারের মতো। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে ৩ ঘণ্টা ড্রাইভ করে জলদাপাড়া পৌঁছনো যায়। আলিপুর দুয়ার স্টেশন থেকে ১ ঘণ্টায় যেতে পারবেন। কলকাতা থেকে সড়কপথে বক্সা যেতে চাইলে বাসের বন্দোবস্ত আছে। দূরত্ব প্রায় ৬১০ কিলোমিটার। বাগডোগরা বিমানবন্দরে নেমে গাড়ি করে জলদাপাড়া যেতে পারেন। ৩ ঘণ্টার মতো সময় লাগবে।
ট্যুরিজম প্রপার্টি এবং বক্সা নিয়ে বিস্তারিত জানতে যোগাযোগ করুন –
West Bengal Tourism Development Corporation Ltd
DG Block, Sector-II, Salt Lake
Kolkata 700091
Phone: (033) 2358 5189, Fax: 2359 8292
Website: https://www.wbtdcl.com/
Email: visitwestbengal@yahoo.co.in, mdwbtdc@gmail.com, dgmrwbtdc@gmail.com
