উত্তরপাড়ার জীবনস্মৃতি আর্কাইভের উদ্যোগে শুরু হল কুমার রায়ের উপর প্রদর্শনী
নবান্ন নাটকে কুমার রায়
বহুরূপী নাট্যদলের (১৯৪৮) ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবর্ষ এবং কিংবদন্তি কুমার রায়ের (১৯২৬–২০১০) ৯৭তম জন্মদিবস উপলক্ষ্যে আজ অর্থাৎ ২ মার্চ ২০২৩, উত্তরপাড়ার জীবনস্মৃতি আর্কাইভের উদ্যোগে বহুরূপীর কুমার রায় পর্বে (১৯৭৯-২০১০) তাঁর পরিচালিত নাটকের দুষ্প্রাপ্য মূল নাট্য পুস্তিকার প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। এই প্রদর্শনীতে থাকছে বহুরূপীর চল্লিশ, পঞ্চাশ ও ষাট বছর উপলক্ষ্যে প্রকাশিত ইতিহাস-গ্রন্থ, প্রযোজনা বিষয়ক তথ্যপঞ্জী ও ছবির দুষ্প্রাপ্য অ্যালবাম। বিশেষ সহযোগিতায় বহুরূপী, কুমার রায়ের পরিবার এবং কুমার রায় স্মৃতিরক্ষা কমিটি।
জীবনস্মৃতি আর্কাইভের কর্ণধার অরিন্দম সাহা সরদার এ প্রসঙ্গে জানাচ্ছেন, “প্রত্যেক নাটকের প্রযোজনার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল পুস্তিকা। যাতে নাটকের অভিনেতা ও নেপথ্য কর্মীদের পরিচয়ের সঙ্গে সঙ্গেই থাকতো একটি করে ছোটো লেখা। যার উদ্দেশ্য ছিল নাটকের মূল ভাবনার একটা ধরতাই দর্শকদের দিয়ে দেওয়া। এই ট্র্যাডিশন বহুরূপীর প্রথম যুগ থেকেই অব্যাহত। এই কাজটি ১৯৭৯-এর পর থেকে প্রায় এককভাবে সামলেছেন কুমার রায়। বিন্যাস এবং লেখন এই সব ক্ষেত্রেই তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নাটকের শুরুতে এবং বিরতির সময় পুস্তিকাগুলি নামমাত্র মূল্যে প্রেক্ষাগৃহের বাইরে ও ভেতরে পাওয়া যেত।”

কালসন্ধ্যা এবং মৃচ্ছকটিক নাট্যপুস্তিকা
একই দিনে ‘কুমার-কুলায়’ শিরোনামে কুমার রায়কে নিয়ে জীবনস্মৃতি’র ঘরে একটি স্থায়ী সংগ্রহশালারও শুভ সূচনা করা হবে। নট, নির্দেশক, নাট্যকার, নাট্য-প্রশাসক, শিক্ষক এবং কর্মী কুমার রায়কে নিয়ে এই সংগ্রহশালায় সংরক্ষণ করা হয়েছে, তাঁর জীবন ও সৃজন বিষয়ক বই, পত্র-পত্রিকা, সংবাদ-কর্তিকা, তাঁর লেখা বই, তাঁকে লেখা শম্ভু মিত্রের চিঠি, বহুরূপী পত্রিকার নানা সংখ্যা, তাঁর অভিনীত, পরিচালিত, লিখিত এবং মঞ্চ পরিকল্পনায় সমৃদ্ধ নাটকের ছবি, মূল পুস্তিকা, আমন্ত্রণ পত্র ও অনুষ্ঠান-পুস্তিকার সম্ভার। তাঁর পরিচালিত ‘রাজদর্শন’, ‘গালিলেও’, ‘মি. কাকাতুয়া’, ‘মুক্তধারা’ এবং ‘যযাতি’ নাটকের সম্পূর্ণ ভিডিও কপি। কুমার রায় বিষয়ে তাঁর দলের প্রবীণ ও নবীন কর্মী ও অন্যান্য নাট্যদলের বহু নাট্যকর্মীদের অডিও-ভিডিও সাক্ষাৎকার। প্রদর্শনী এবং স্থায়ী সংগ্রহশালার উদ্বোধন করবেন কুমার রায়ের স্ত্রী লতা রায়। প্রদর্শনী এবং স্থায়ী সংগ্রহশালার ভাবনা, পরিকল্পনা এবং রূপায়ণে আর্কাইভের অবেক্ষক অরিন্দম সাহা সরদার।
এই প্রদর্শনীতে থাকছে বহুরূপীর চল্লিশ, পঞ্চাশ ও ষাট বছর উপলক্ষ্যে প্রকাশিত ইতিহাস-গ্রন্থ, প্রযোজনা বিষয়ক তথ্যপঞ্জী ও ছবির দুষ্প্রাপ্য অ্যালবাম।
বাংলা নাটকের পুরোধা ব্যক্তিত্ব কুমারেন্দ্রনারায়ণ রায় পরে জনপ্রিয় হন কুমার রায় নামে। ১৬ বছর বয়সে কারাবন্দি হন। ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দেন সংশোধনাগার থেকেই। এরপর কলেজ জীবনে চলে আসেন রাজশাহী কলেজে। সেখানেই আলাপ হয় পরবর্তীকালের দিকপাল চলচ্চিত্র নির্মাতা ঋত্বিককুমার ঘটকের সঙ্গে। কুমার এবং ঋত্বিক তাঁদের কলেজ জীবনে বেশ কয়েকটি নাটক প্রযোজনা ও অভিনয় করেন। তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা’ নাটকটি। ঋত্বিকই পরবর্তীকালে আলাপ করিয়ে দেন বাংলা নাট্য মঞ্চের প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব শম্ভু মিত্রের সঙ্গে। এই সাক্ষাতের কিছু দিনের মধ্যেই কুমার রায় যোগ দিলেন বহুরূপীতে, যার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেন আজীবন।

গালিলেও নাটকে কুমার রায়, ছবি- নিমাই ঘোষ
তখন বহুরূপীতে শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি মিত্রের জুড়ি ছাড়াও যেসব তারকারা একত্রিত হয়েছিলেন তাঁরা হলেন, মহর্ষি মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, বিজন ভট্টাচার্য, গঙ্গাপদ বসু, ঋত্বিক ঘটক, কলিম শরাফি, তুলসী লাহিড়ী প্রমুখ। তাঁরা অনেকেই স্বপ্ন দেখতেন এমন একটা সংগঠনের, যেখানে নিবেদিত প্রাণ কিছু ছেলে মেয়ে ভালো করে ভালো নাটক করবে। যে নাটকে সময় প্রতিফলিত হবে, সামাজিক দায়িত্ববোধ প্রকাশ পাবে। শুধু অভিনয়ই নয়; উচ্চারণ, ছন্দবোধ, গলার চর্চা, শরীর চর্চার সঙ্গে সঙ্গে মঞ্চ নির্মাণ, আলোক সম্পাত, রূপসজ্জা, পোশাক তৈরি, এমনকি মহলাকক্ষ পরিষ্কার রাখা কিংবা হিসেব রক্ষার কাজও সকলেই শিখবে যাতে তারা নাট্য শিল্পের যৌথ এবং সামগ্রিক রূপটা নিজেরাই চিনে নিতে পারে। কুমারেন্দ্রনারায়ণ ততদিনে কুমার রায় – নিজেকে এই ধারাতেই গড়ে তুলবেন থিয়েটারের একজন একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে। পরবর্তী ছয় দশক ধরে অভিনেতা, পরিচালক, সম্পাদক, সংগঠক, শিক্ষক, লেখক, মঞ্চ শিল্পী, রূপসজ্জাকার ইত্যাদি বিবিধ বিষয়ে নিজের বিশিষ্টতার ছাপ রাখবেন।
১৯৫৪ সালে শম্ভু মিত্র নির্দেশিত রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’-তে গোঁসাইয়ের ভূমিকায় প্রথম কোনো মুখ্য চরিত্রে কুমার রায়ের আত্মপ্রকাশ।
১৯৫৪ সালে শম্ভু মিত্র নির্দেশিত রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’-তে গোঁসাইয়ের ভূমিকায় প্রথম কোনো মুখ্য চরিত্রে কুমার রায়ের আত্মপ্রকাশ। তারপর ইবসেন অবলম্বনে ‘পুতুল খেলা’-য় (১৯৫৮) ডা: রায়, গ্রীক নাটক ‘রাজা অয়দিপাউস’-এ প্রধান কোরাস, রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা’-য় (১৯৬১) ঠাকুরদা, ‘বিসর্জন’ (১৯৬১)-এ গোবিন্দমাণিক্য, বাদল সরকারের ‘বাকি ইতিহাস’–এ (১৯৬৭) শরদিন্দু আর সীতানাথ, ‘পাগলা ঘোড়া’ নাটকে শশীর ভূমিকা এবং বিজয় তেন্ডুলকারের নাটক ‘চোপ আদালত চলছে’-তে (১৯৭২) মি. কাশিকারের ভূমিকায় নিজ প্রতিভার বিচিত্র এবং বহুমাত্রিক উন্মেষ তাঁকে বহুরূপীর একজন প্রধান অভিনেতার সম্মান এনে দিয়েছে। এর মধ্যেই বাংলা নাটমঞ্চ প্রতিষ্ঠা সমিতির জন্য অনেক দলের সম্মিলিত অভিনয়ে ভাস-এর সংস্কৃত নাটক ‘মুদ্রারাক্ষস’-এ রাক্ষস এবং গিরিশ কারনাডের ‘তুঘলক’-এ আজিজ-এর ভূমিকায় তাঁর অভিনয় বিশেষ ভাবে সমাদৃত। পাশাপাশি ‘ঘরে বাইরে’ (১৯৭৪), ‘সুতরাং’ (১৯৭৫), ‘গীতরত্ন’ (১৯৭৬) এবং নান্দীকার দলে ‘আন্তিগোনে’ নাটকের মঞ্চ স্থপতির কাজও করেছেন। বহুরূপীর প্রযোজনায় তাঁর নির্দেশিত প্রথম নাটক ‘গীতরত্ন’। যদিও এই নাটকের কোন পাবলিক শো হয়নি। একটি মাত্রই শো হয়েছিল একেবারে দলের মধ্যেকার লোকজনদের জন্য।
একই সঙ্গে সামলেছেন বহুরূপীর কোষাধ্যক্ষের ভূমিকাও। পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করেছেন বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রেও। যার মধ্যে শম্ভু মিত্র, অমিত মৈত্রের যুগ্ম নির্দেশনায় ‘একদিন রাত্রে’, পীযুষ বসু-র ‘জীবন জিজ্ঞাসা’, তপন সিংহের ‘সাগিনা মাহাতো’, ‘এখনই’, ‘হারমোনিয়াম’ ও ‘এক যে ছিল দেশ’ এবং সত্যজিৎ রায়ের ‘তিন কন্যা’-র মণিহারা-য়। ১৯৮৬-তে বিশ্বভারতীর আমন্ত্রণে শান্তিনিকেতনে যান অতিথি অধ্যাপক এবং ফেলো হিসেবে। সেখানেও কলাভবন এবং সংগীত ভবনের ছাত্র অধ্যাপকদের নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা’ নাটকের পরিচালনা করেন, যা এখনও অনেকেরই স্মৃতিতে অমলিন।

জীবনস্মৃতি আর্কাইভের নিবেদন
১৯৭৯-তে কুমার রায়ের জীবনের দ্বিতীয় পর্বের শুরু। ‘মৃচ্ছকটিক’ (১৯৭৯), ‘গালিলেও’ (১৯৮০), ‘রাজদর্শন’ (১৯৮২), ‘কিনুকাহারের থেটার’ (১৯৮৮), ‘যযাতি’ (১৯৮৮)-তে তাঁর অভিনয় সর্বমহল বিদিত। নবপর্যায়ে ‘নবান্ন’ (১৯৮৯) নাটকের পরিচালনা এবং প্রধানের চরিত্রে অভিনয়ও করেছেন। ১৯৭৯ থেকে পরবর্তী তিন দশকে একটি হিন্দি-সহ মোট ২৩টি নাটকের পরিচালনা এবং ৭টি নাটকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। ১৯৮০ থেকে ২০০৩-এর মধ্যে তাঁর লেখা প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা আটটি। এছাড়াও প্রচুর লেখা এবং বক্তৃতা একত্রিত হবার অপেক্ষায়। ২০০৬ থেকে আমৃত্যু পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমির সভাপতির দায়িত্ব সামলিয়ে মিনার্ভা থিয়েটারের পুনরুজ্জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন।
এর আগে জীবনস্মৃতি আর্কাইভ পরিচালক নৃপেন গঙ্গোপাধ্যায় (ন্যাপাদা)কে নিয়ে একটি স্মরণ সন্ধ্যার আয়োজন করেছিল। তৈরি হয়েছে মৃণাল সেনের জীবন ও সৃষ্টি নিয়ে একটি গবেষণাধর্মী আর্কাইভ। নজরুল ইসলামকে নিয়েও বড়ো কাজ আছে তাদের। এবার নাট্য গবেষকদের জন্য কুমার রায়ের এই সুবিশাল কর্মকাণ্ড একত্রিত করল জীবনস্মৃতি আর্কাইভ। জানা গিয়েছে, এই সংগ্রহশালা ২ মার্চের পর থেকে প্রতি সপ্তাহে সোম, বুধ এবং শুক্রবার দুপুর ১২টা থেকে ৩টে পর্যন্ত খোলা থাকবে।
____
জীবনস্মৃতি – ৭০ রাম সীতা ঘাট স্ট্রিট, ভদ্রকালী -৭১২২৩২, হুগলি, থানা – উত্তরপাড়া