শম্ভু মিত্রের কাছে জীবন আর রঙ্গমঞ্চ কোনোদিন ভিন্ন ছিল না

আজ শম্ভু মিত্রের ১১০তম জন্মবার্ষিকী

ভাঙার শব্দ বহুবার তিনি শুনেছেন। কিন্তু তাকে বুকের মধ্যে গেঁথে ফেলে অন্ধকারকে আলিঙ্গন করে নেননি। নিজেই বলেছেন, “স্বপ্ন তো দেখতেই হবে।  স্বপ্নগুলো সব কাচের মতো ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে। আবার সেগুলো তো জড়ো করতে হবে”। তাই অসফলতা, বিশ্বাসঘাতকতা, নৈরাশ্যের কালো ছায়া সরিয়ে ফের উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা তাঁর সত্ত্বায়। বাস্তব আর অভিনেতার রঙ্গমঞ্চকে আলাদা করে না দেখার এক অনবদ্য উপাখ্যান তাঁর জীবন। তিনি প্রবাদপ্রতীম নাট্য ব্যক্তিত্ব। তিনি শ্রী শম্ভু মিত্র, অতি সাধারণ মধ্যবিত্ত জীবনেও তিনি অতি পরিচিত নাম। অথচ, জীবন যেমন তাকে সেভাবেই মঞ্চে তুলে ধরা এই মানুষটি কিন্তু নিজের বর্ণনায় সাধারণের চেয়েও সাধারণ। কন্যা শাঁওলী মিত্রকে লেখা ‘ইচ্ছাপত্র’-এ শম্ভু মিত্র লেখেন, “আমি সামান্য মানুষ, জীবনে অনেক জিনিস এড়িয়ে চলেছি। তাই মরবার পরেও আমার দেহটা যেন তেমনি নীরবে, একটু ভদ্রতার সঙ্গে, সামান্য বেশে, বেশ একটু নির্লিপ্তির সঙ্গে পুড়ে যেতে পারে।” কাকপক্ষীও টের পায়নি তাই। বাবার ইচ্ছে মতো তাঁর দাহকাজ শেষ করে তারপর শম্ভু মিত্রের মৃত্যুর কথা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন শাঁওলি। এমনই নিঃশব্দ গহীনতাকে ছুঁয়ে ছিল শম্ভু মিত্রের জীবন। 

হুগলির ‘কলাছড়া’ গ্রামে জমিদার পূর্বপুরুষের বসত ভিটে কোনকালেই টানেনি শরৎকুমারকে। আট ছেলেমেয়ের মেজো ছেলে শম্ভুও পেয়েছিলেন বাবার ধারা। মা শতদলবাসিনী ছিলেন বিখ্যাত ডাক্তার আদ্যনাথ বসুর মেয়ে। কলকাতার ডোভার রোডে একটা বাড়ি আদ্যনাথ যৌতুক দিয়েছিলেন জামাই শরৎকুমারকে। ঐ বাড়িতেই ১৯১৫-র আজকের দিনে শম্ভু মিত্রের জন্ম। খুব কম বয়সেই মা’হারা হন শম্ভু। অথচ সেই মায়ের প্রভাব তাঁর জীবন জুড়ে। কোনো নেতিবাচক কিছু করার কথা ভাবতেও পারতেন না শম্ভু মিত্র। তাঁর শুধু মনে হত, “মা আকাশ থেকে সব দেখছেন”। 

তৈরি হতে থাকে বাংলার বুকে গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের ভিত্তিভূমি 

ইলাহাবাদের পাবলিক লাইব্রেরিতে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়াশোনায় নীরবে নিজেকে তৈরি করেছিলেন শম্ভু মিত্র। সেইসময়েই একদিন শুনলেন, পাশের কোন এক বাড়িতে ‘আলমগীর’ নাটকের রেকর্ড বাজছে। নিজেই বলেছেন সে কথা, “মনে হল শ্যামের বাঁশি বাজল। নাটক ছাড়া আমার গত্যন্তর নেই”।

বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুলে পড়ার সময় থেকেই অভিনয় ও আবৃত্তিতে শম্ভু মিত্রের আগ্রহ জন্মায়। তাঁর ভাগ্নে, সহপাঠী দুর্গার সঙ্গেই কখনও স্কুলে আবার কখনও বকুলবাগানের ‘গোল মাঠে’ চলত চেনা অচেনা নাটকে ঘরোয়া অভিনয়। পাশাপাশি চলত মুখস্থ করে কবিতা আবৃত্তি। আর এভাবে ছোট থেকেই শম্ভু মিত্র বই না খুলেও অবলীলায় বলে দিতে পারতেন কোথায় কোন পৃষ্ঠায় কোন কবিতা আছে। যেন এটা পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ কাজ। স্কুল পেরিয়ে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন শম্ভু মিত্র। কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই প্রথাগত পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে স্বশিক্ষিত হওয়ার প্রয়াসে বাবার সঙ্গে চলে যান উত্তরপ্রদেশে। সেখান থেকে লখনউ, তারও পরে পরে ইলাহাবাদে। ইলাহাবাদের পাবলিক লাইব্রেরিতে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়াশোনায় নীরবে নিজেকে তৈরি করেছিলেন শম্ভু মিত্র। সেইসময়েই একদিন শুনলেন, পাশের কোন এক বাড়িতে ‘আলমগীর’ নাটকের রেকর্ড বাজছে। নিজেই বলেছেন সে কথা, “মনে হল শ্যামের বাঁশি বাজল। নাটক ছাড়া আমার গত্যন্তর নেই”। ১৯৩৬-৩৭ সালে কলকাতায় ফিরে নানা জায়গায় থেকেছেন। জ্যোতিনাথ ঘোষের বাড়িতে থাকার সময় তার ছেলেমেয়েদের পড়াতেনও। এই জ্যোতিনাথই তাঁকে ‘শম্ভু মিত্র’ হয়ে ওঠায় দিশা দেখালেন প্রথম। 

তাঁকে সঙ্গে করে সিনেমা, থিয়েটার দেখানো, বিদেশি বই জোগাড় করে তাঁকে পড়ানো, এইসবই জ্যোতিনাথের কৃতিত্ব। এরপর প্রথাগত থিয়েটারে এলেন শম্ভু মিত্র ১৯৩৯-এ।  যুক্ত হলেন ‘রঙমহলে’, এখানেই তিনি পেলেন তাঁর ‘গুরু’, ‘মহর্ষি’ মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যকে। তাঁর স্নেহ, ভালবাসার আশ্রয়ে অভিনেতা, নাট্যকার শম্ভু মিত্র জীবনভর তাঁর ডালপালা বিস্তার করে গেছেন।  

নিঃশব্দ গহীনতাকে ছুঁয়ে ছিল শম্ভু মিত্রের জীবন 

ভাঙনের বাঁশি বাজছিলই, অতঃপর ‘মালা রায়’, ‘রত্নদীপ’, ‘ঘূর্ণি’তে শম্ভু মিত্রের অভিনয়ের পরপরই ‘রঙমহল’ বন্ধ হয়ে যায়। বিশিষ্ট অভিনেতা ভূমেন রায় এরপর শম্ভু মিত্রকে নিয়ে যান ‘মিনার্ভা’য়। কিন্তু তাঁর ‘গুরু’কে অপমানিত হতে দেখে একদিন সেখান থেকেও বেরিয়ে আসেন শম্ভু মিত্র। এরপরের ঠিকানা ‘নাট্যনিকেতন’। তারাশঙ্করের ‘কালিন্দী’র ‘মি.মুখার্জি’ শম্ভু মিত্রের অভিনয়ে এই নাট্যনিকেতনেই জীবন্ত হয়ে ওঠে। ‘নাট্যনিকেতন’ নতুন করে ‘শ্রীরঙ্গম’ নাম নিয়ে শিশির ভাদুড়ির হাতে শুরু হলে শম্ভু মিত্র তাঁর ‘মহর্ষি’ মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যকে নিয়ে এখানেই চলে এলেন। রতনে রতন চিনে নিতেই ঝলমল করে উঠল চারদিক। কলকাতার নাট্যমঞ্চে নতুন নতুন ইতিহাস লেখার অপেক্ষা শুরু হল। কিন্তু এরই মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঘোর অন্ধকার জনমানসে ছায়া ফেলেছে ভীষণভাবে। যুদ্ধ, ফ্যাসিবাদ, মন্বন্তর উত্তাল করে তুলেছে চল্লিশের দশককে। 

এইসময়ই তৈরি হয় ‘অ্যান্টি ফ্যাসিস্ট রাইটার্স অ্যান্ড আর্টিস্টস অ্যাসোসিয়েশন’, ‘গণনাট্যে’র জন্ম যার গর্ভে। যুদ্ধে সাধারণ মানুষের নিঃসহায়তা কুরে কুরে যন্ত্রণা দিয়েছে সৃজনশীল ব্যক্তিত্বদের। তাই দেখা যায়, ‘গণনাট্য’-ই এইসময় শম্ভু মিত্রের মনপ্রকাশে একটা ‘প্ল্যাটফর্ম’ হয়ে উঠছে। ‘জবানবন্দী’, ‘নবান্ন’ ইত্যাদি তো এই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়েই থেকে যাবে চিরকাল। এইসময়েই প্রখ্যাত নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্যের মাসতুতো বোন তৃপ্তি ভাদুড়ির সঙ্গে পরিচয় হয় শম্ভু মিত্রের। বিজন ভট্টাচার্যই এদের দু’জনকে গণনাট্যে এনেছিলেন। পরবর্তীতে এরা দুজনেই খাজা আহমদ আব্বাসের পরিচালনায় ‘ধরতী কে লাল’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য মুম্বাই যান একসঙ্গে। সেখানেই বিয়ে হয় এই বিখ্যাত নাট্যদম্পতির। 

সাফল্য আর ভাঙন পরতে পরতে জড়িয়ে রেখেছে শম্ভু মিত্রের জীবনকে। বহু পুরস্কার প্রাপ্তি, ‘রক্তকরবী’ ও ‘পুতুল খেলা’-র দেশ বিদেশের সাফল্য যেমন আছে সেখানে, একইভাবে আছে বার বার নাট্যদল বদলানো, অপমান, অসম্মান পাওয়ার অসহ্য যন্ত্রণা। তাই একদিন ‘বহুরূপী’ও বহু রূপে ছিন্নভিন্ন হয়েছে।

সময় গড়ালে আদর্শ থেকে প্রতিষ্ঠান ক্রমশ ভিন্ন হতে থাকে, মতপার্থক্যে জোরালো হয়। গণনাট্য থেকে শম্ভু মিত্র-সহ আরও বিখ্যাত অভিনেতাদের বেরিয়ে আসাও তেমনি কারণে। এদের হাতেই ১৯৫০-এ বিকল্প হিসেবে জন্ম হয় ‘বহুরূপী’র। দেশের মানুষের জন্যই ভালো নাটক ভালো করে করা এই ভাবনা থেকেই ‘পথিক’, ‘বিভাব’, ‘ছেঁড়া তার’, ‘চার অধ্যায়’, ‘রক্তকরবী’, ‘বিসর্জন’, ‘মুক্তধারা’, ‘বাকি ইতিহাস’, ‘রাজা অয়াদিপাউস’, ‘চোপ আদালত চলছে’ প্রভৃতি মঞ্চস্থ হতে লাগে ‘বহুরূপী’র ছায়ায়, শম্ভু মিত্রের প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতে। আর এভাবেই অলক্ষ্যে তৈরি হতে থাকে বাংলার বুকে গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের ভিত্তিভূমি। এইসময় শম্ভু মিত্রের নিজের মতে ‘ক্ষুন্নিবৃত্তি’ করতে তিনি ‘শুভ বিবাহ’, ‘কাঞ্চনরঙ্গ’, ‘পান্না’র মতো ছবিও তৈরি করেছেন। 

সাফল্য আর ভাঙন পরতে পরতে জড়িয়ে রেখেছে শম্ভু মিত্রের জীবনকে। বহু পুরস্কার প্রাপ্তি, ‘রক্তকরবী’ ও ‘পুতুল খেলা’-র দেশ বিদেশের সাফল্য যেমন আছে সেখানে, একইভাবে আছে বার বার নাট্যদল বদলানো, অপমান, অসম্মান পাওয়ার অসহ্য যন্ত্রণা। তাই একদিন ‘বহুরূপী’ও বহু রূপে ছিন্নভিন্ন হয়েছে। ‘বহুরূপী’ ছেড়ে এসে বাকি জীবনটায় কন্যা শাঁওলি মিত্রের ‘পঞ্চম বৈদিক’-এ প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে যুক্ত থেকেছেন শম্ভু মিত্র। যে জীবন ভাঙার শব্দ শুনে শুনে অভ্যস্ত হয় সেই জীবনেই বোধ হয় এমন করে অক্ষয় আলো জ্বলতে পারে। জীবনের ট্রাজেডি যন্ত্রণার আবর্তে ফেললেও ক্রমগত জীবন সংগ্রামের অমোঘ কাহিনি লিখে গেছে শিল্পী শম্ভু মিত্রের জীবন জুড়ে। তাঁর কাছে জীবন আর রঙ্গমঞ্চ কোনোদিন ভিন্ন ছিল না। ‘ডাকঘর’, ‘তাহার নামটি রঞ্জনা’য় শম্ভু মিত্রের আন্তরিক কন্ঠস্বর তাই ভোলার নয়। ফাঁপা সমাজের বাহ্যিক বহর দেখে তাই তিনি ডাকেন ‘রঞ্জন’কে। শম্ভু মিত্রের ‘চাঁদ বণিকের পালা’র চাঁদ যেন তাঁর নিজেরই জীবন প্রতিভূ, যে সাফল্য ও ব্যর্থতার পালাগানকে দূরে সরিয়ে রেখে কেবল ‘পাড়ি দেওয়া’য় বিশ্বাস করে। জীবনের যে কোন লগ্নে ‘চরৈবেতি’ যাঁর মূলমন্ত্র।

____________

ঋণ: আনন্দবাজার আর্কাইভ

Developed by DXDasia