প্রত্যন্ত গ্রামে রাত-বিরেতে প্রসূতিদের কাছে স্কুটি নিয়ে পৌঁছে যান ‘আপা’

গ্রামের মানুষ তাঁকে এক ডাকে চেনে

শবেবরাতের রাতে নামাজ পড়তে যাবেন সুলতানা বেগম, হঠাৎ মোবাইল ফোন বেজে উঠল। এক মহিলার প্রসববেদনা উঠেছে। স্কুটি নিয়ে ছুটলেন তিনি। দক্ষ হাতে প্রসব করালেন। কোনো দুর্ঘটনা ঘটল না। মা-শিশু দু’জনেই নিরাপদ। সুলতানা ফিরে স্নান করে ফের নামাজের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, আবারও বেজে উঠল ফোন। ছুটলেন সঙ্গে সঙ্গে। নির্বিঘ্নে আরেকটি প্রসব করিয়ে বাড়ি ফিরলেন মাঝরাতে। নামাজে বসার আগে ফোন এল আবারও। আরেকটি শিশুকে পৃথিবীর আলো দেখাতে হবে। নামাজ না পড়েই রওনা দিলেন সুলতানা। যখন ফিরলেন, পুবের আকাশ তখন ফরসা হয়ে এসেছে। সুলতানা বেগমের কাছে এটা নিত্তনৈমিত্তিক ঘটনা। তা বলে শবেবরাতের নামাজ আর পড়া হল না, এই দুঃখ বড়ো বাজছিল তাঁর বুকে। মসজিদের ইমামের কাছে পরামর্শ নিতে  গেলেন। ইমাম বললেন, ৩ জন শিশুকে ভূমিষ্ঠ হতে সাহায্য করেছেন সুলতানা। ৬ জন মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছেন। এই মহান কাজের জন্য নামাজ পড়তে না পারার অপরাধ নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ ক্ষমা করবেন।

বাংলাদেশের মহেশখালি দ্বীপের মাতারবাড়ি ইউনিয়ন। আগে এখানে কোনো প্রসূতি পরিষেবা ছিল না। সন্তান প্রসবের জন্য মহিলাদের সমুদ্র পার করিয়ে চকরিয়া নিয়ে যেতে হত। অনেক সময়ে রাস্তাতেই ঘটে যেত বড়োসড়ো বিপদ। গ্রামের অদক্ষ দাইদের হাতে পড়েও অনেক প্রসূতি মা ও শিশুর মৃত্যু ঘটত। এখন সুলতানা থাকায় আর ভয় নেই গ্রামবাসীদের। কোনো মহিলার প্রসববেদনার খবর পেয়েই স্কুটি নিয়ে বেরিয়ে পরেন সুলতানা। রাত হোক, দিন হোক, শীত হোক বা বর্ষা, ঝড়-বৃষ্টি-বিপর্যয় উপেক্ষা করে প্রসূতির কাছে পৌঁছন। নির্বিঘ্নে প্রসব করান। গ্রামের মানুষজন তাঁকে ‘সুলতানা আপা’ নামে এক ডাকে চেনে। 

১৯৮৫ সাল, তখন স্কুলে পড়তেন সুলতানা। তাঁর ভাবি হঠাৎ প্রসববেদনায় কাতর হয়ে পড়েছিলেন। কাছেপিঠে কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র ছিল না, হাসপাতাল ছিল ৩৫ কিলোমিটার দূরে। তখনই সুলতানা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, অসহায় প্রসূতিদের পাশে থাকবেন। 

মাতারবাড়ি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে সুলতানা পরিবারকল্যাণ সহকারী হিসেবে যোগ দেন ১৯৯২ সালে। কক্সবাজার সদর হাসপাতাল এবং মা ও শিশু হাসপাতাল থেকে কমিউনিটি স্কিলড বার্থ অ্যাটেনডেন্ট বা সিএসবিএ-র ৬ মাসের প্রশিক্ষণ নেন ২০০৫ সালে। তারপর ধাত্রীবিদ্যা নিয়ে নোয়াখালি জেনারেল হাসপাতাল থেকেও ট্রেনিং নেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ২ ছেলে ও ২ মেয়ের জননী। স্বামী-সন্তানকে নিয়ে বর্তমানে মাতারবাড়ির সিকদারপাড়ায় বসবাস করেন।

আগে সুলতানা বাড়ি বাড়ি গিয়ে মহিলাদের প্রসব করাতেন। তাতে নানারকম সমস্যা দেখা দিত। সব যন্ত্রপাতি প্রয়োজন মতো হাতের কাছে মিলত না। গরম জল এবং অ্যান্টিসেপটিক পেতেও সমস্যা হত। তাই এখন তিনি স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই প্রসব করিয়ে থাকেন। তার জন্য যে কোনো সময়ে বাড়ি থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার দূরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে স্কুটি করে পৌঁছে যান সুলতানা। এছাড়া তিনি সপ্তাহে ৩ দিন মা সমাবেশের আয়োজন করেন। যে সব মা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সমাবেশে যোগ দিতে পারেন না, তাদের জন্য করেন উঠোন বৈঠক। বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রসূতি মা ও শিশুদের খবর নেন। ২০০৭ সালে সারা বাংলাদেশের সেরা ধাত্রী হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছেন সুলতানা। এছাড়াও পেয়েছেন বেশ কিছু পুরস্কার ও সম্মাননা। তবে, সবথেকে বড়ো সম্মাননা অবশ্যই মানুষের ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা। সমস্ত মাতারবাড়ির মানুষ এখন ‘সুলতানা আপা’ বলতে অজ্ঞান। 

Developed by DXDasia