সাইকেল চড়ে আশেপাশের গ্রামে বই পৌঁছে দেন তিনি
বাংলাদেশের ময়মনসিংহ বিভাগের জামালপুর জেলা। তার সরিষাবাড়ী উপজেলায় হাসড়া মাজালিয়া গ্রামের বাসিন্দা শেখ মুহম্মদ আতিফ আসাদ। গ্রামের সবাই আতিফ আসাদ নামেই তাঁকে চেনে। ছোটোবেলা থেকেই তিনি বইপাগল। যখন তিনি ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র, একটি বেসরকারি লাইব্রেরি থেকে নিয়ে বই নিয়ে এসে গোগ্রাসে গিলতেন। তারপর হরখালী মুজিবুর রহমান আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে যখন ভর্তি হলেন, স্কুলের লাইব্রেরির বই পড়েই সময় কাটত তাঁর। কিন্তু স্কুল ছাড়তেই বই পড়ার সুযোগ আর তেমন রইল না। পোগলদিঘা ডিগ্রি কলেজে অধ্যয়ন শুরু করলেন বটে, কিন্তু একটি ভালো লাইব্রেরির অভাব বোধ করতেন সর্বদা। বাড়ির কাছাকাছিও কোনো লাইব্রেরি নেই। আসাদের স্বপ্ন ছিল, তিনি নিজেই একটা গ্রন্থাগার বানাবেন, তাতে থাকবে অনেক অনেক বই। চারপাশের মানুষজন অনেক অনেক বই পড়বেন।
আরও পড়ুন
নজরুলের জীবনে বুলবুল
তাঁর এই ইচ্ছের কথা শুনে অনেকেই ঠাট্টা করত। তবে, আসাদের বড়ো দাদা রবিউল ইসলাম মিলন কিন্তু ভাইকে নিজের স্বপ্ন সার্থক করার সাহস জোগাতেন। দুই ভাই মিলে পরামর্শ করে বাড়ির বারান্দাতেই শেষ পর্যন্ত এক গ্রন্থাগার চালু করলেন। ২০১৮ সালের ২৭ জুলাই মাত্র ২০টি বই নিয়ে শুরু হল সেই লাইব্রেরির পথ চলা। আসাদের প্রতিবেশী মাহমুদা-সালাম মহিলা কলেজের সমাজবিজ্ঞানের ছাত্রী শর্মী আক্তার দিয়েছিলেন এই ২০টি বই। গ্রামের মানুষ আসাদের লাইব্রেরিতে বিনামূল্যে বই পড়তে পারেন, বাড়িও নিয়ে যেতে পারেন।
এরই মধ্যে দুর্যোগ নেমে এল আসাদের পরিবারে। জমি নিয়ে বিবাদের জেরে এলাকার প্রভাবশালীদের হাতে খুন হলেন রবিউল ইসলাম মিলন। তবে আসাদ দমে যাননি। বড়ো ভাইয়ের নামেই তিনি লাইব্রেরির নাম রাখলেন, ‘শহীদ মিলন স্মৃতি পাঠাগার’।
দারিদ্র আসাদের পরিবারে নিত্যসঙ্গী। আসাদের বাবা এক সময়ে দিনমজুরের কাজ করতেন। এখন তিনি বৃদ্ধ হয়েছেন। নিজের পড়াশোনা ও লাইব্রেরির খরচ জোগাতে কখনো রাজমিস্ত্রি, কখনও দিনমজুর, খাট বার্নিশ, ধান কাটা রডমিস্ত্রির কাজ করতে লাগলেন আসাদ। তাঁর আরেক দাদা আল আমিন পেট্রল পাম্পে চাকরি নিলেন। এভাবেই লড়াই করে বছর কুড়ির আসাদ এখন জামালপুর সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজে উদ্ভিদবিদ্যা নিয়ে স্নাতক স্তরের অধ্যয়ন করছেন।

এখন শহীদ মিলন স্মৃতি পাঠাগারে ৫০০টির মতো বই আছে। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজবিদ্যা, ইতিহাস – অনেক রকমের বইয়ে সেজে উঠেছে সেই লাইব্রেরি। আসাদ যখন ব্যস্ত থাকেন, লাইব্রেরি সামলান, পাঠকদের বই ধার দেন তাঁর বন্ধু সবুজ প্রামাণিক। আসাদের মা জয়নব বিবিও সাধ্যমতো লাইব্রেরির দেখাশোনা করেন। আসাদ সপ্তাহে ৩-৪ দিন সাইকেলে চড়ে আশেপাশের গ্রামে পাঠকদের হাতে বই পৌঁছে দেন, পড়া হয়ে গেলে সেই বই আবার ফেরত নিয়ে আসেন। এই গ্রন্থাগার তাঁর কাছে আন্দোলন। এখন তাঁর সংগ্রামের কথা জানতে পেরে বেশ কিছু মানুষ অর্থসাহায্য করছেন। লাইব্রেরির জন্য বই কিনে দিচ্ছেন। আসাদ চান, এরকম আরো লাইব্রেরি তৈরি হোক গ্রামে গ্রামে, সাধারণ মানুষ আরো বেশি বই পড়ার সুযোগ পান।
এছাড়া, গত বছর আসাদের উদ্যোগে তৈরি হয়েছে ‘আদর্শ গ্রাম সমবায় সমিতি’। এই সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে গ্রামের গৃহবধূরা অনেকেই হাঁস-মুরগির চাষ করে স্বনির্ভর হয়েছেন।
ছবিসূত্র – ফেসবুক