
কলসি কাঁখে রাধার বেশে গ্রামের মেয়েরা, আবহমান…
সেই মানুষেরা কোনো প্রথাগত লেখাপড়া শেখেননি। এক লাইন লিখতেও পারেন না হয়তো। অথচ মুখে মুখেই বেঁধে ফেলেন আশ্চর্য সব গান। প্রাণবন্ত সেই গানের সুর, সাবলীল তার কথা, এবং সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ, সে গানের জীবনদর্শন তাক লাগিয়ে দেবে ইউনিভার্সিটি ফেরত গবেষকদেরও। এরকমই জাদু রয়েছে গ্রামীন বাংলার লোকসংগীতে। সেই প্রাচীন সময় থেকেই এই গানের ধারা অত্যন্ত সমৃদ্ধ। বিষয় ভেদে, অঞ্চল ভেদে কতই না বৈচিত্র্য তাতে। ভাদু, চটকা, ভাটিয়ালি, আখড়াই, জাওয়া, ঝুমুর, গম্ভীরা, কীর্তন, জারি – নাম বলে শেষ করা যাবে না। কোনো গান গাওয়া হয় মৃত্যু উপলক্ষ্যে, তো কোনো গান মানুষের জন্ম নিয়ে। বিয়ের অনুষ্ঠানেই কত রকমের গান রয়েছে গ্রাম বাংলায়। কনে সাজানোর আলাদা গান, কনে বিদায়ের আলাদা গান, আলপনার আলাদা গান, কনে সম্প্রদানের আলাদা গান।
আরও পড়ুন
মহরমের শোক আর জারি গান
বিয়ের গানে সব জায়গাতেই রয়েছে মেয়েদের কর্তৃত্ব। মেয়েরাই গান বাঁধেন, পরিবেশন করেন, শ্রোতারাও মেয়ে। মেয়েদের মুখে মুখেই বিয়ের গান বেঁচে রয়েছে, ছড়িয়ে পড়েছে দিকে দিকে। বিয়ের অনুষ্ঠানে তো নানান ধরনের গান হয়, তার মধ্যে ‘জল আনার গান’ কিন্তু বেশ মজার। এই গানগুলো বিয়ের অনুষ্ঠান ছাড়া অন্য কোথাও গাওয়া হয় না। বাঙালি হিন্দু রীতির বিয়েতে থেকে বেশ কিছু স্ত্রী-আচার। অর্থাৎ বিবাহিত মেয়েরাই শুরু ওইসব রিচ্যুয়ালে অংশ নিতে পারেন। সেরকমই একটা আচার হল ‘জল ভরা’। বিয়ের দিন বর আর কনেকে স্নান করানোর জন্য তাদের বাড়ি থেকে এয়োস্ত্রীরা কাছাকাছি কোনো নদী বা পুকুর থেকে জল নিয়ে আসে। নিয়ম হল, সেইসব মেয়েরা থাকবেন বিজোড় সংখ্যায়, অর্থাৎ, ৭ জন অথবা ৯ জন অথবা ১১ জনের মতোই যেতে পারবেন ঘাটে। কাঁখে থাকবে কলসি, সঙ্গে থাকবে বিয়ের আরও বেশ কিছু উপকরণ।
আরও পড়ুন
সম্প্রীতির আলকাপ
এরপর ঘাটে গিয়ে গাওয়া হয় ‘জল ভরার গান। সঙ্গে উলু দেওয়া হয়, বাজানো হয় শঙ্খ। নানা ধরনের চটুলতা, রসিকতাও মিশে থাকে গানের মধ্যে। গানে উঠে আসে রাধাকৃষ্ণের লীলা। যারা জল আনতে গেছে, তাদের একাত্ম করে দেওয়া হয় রাধার সঙ্গে। কৃষ্ণের প্রতি রাধার পূর্বরাগ, অনুরাগ, বিরহ, কপট ক্রোধ – অনেক কিছুই সেখানে উঠে আসে। যেমন –
"ওগো, সাঁঝের বেলা কে তোরে
জল আনতে বলেছে।
কে, জল আনতে বইলাছে।
ঘরের জল বাইরে ফেলে
যমুনার জল আনতে গেলে,
না জানি কোন কালার
সনে প্রেম মইজাছে।
কে, জল আনতে বইলাছে।"
গ্রাম বাংলার সেই সব মানুষ হয়তো রোমিও-জুলিয়েটের নাম শোনেননি, জানেন না লায়লা-মজনুর নাম, কিন্তু তাতে কীই বা যায় আসে? কৃষ্ণ আর রাধা কোনো ঐশ্বরিক মহিমা নিয়ে নয়, নেহাতই সাধারণ মানুষের মতো তাদের জীবন ভরিয়ে রেখেছে মধুর রসে। ‘জল ভরার গান’-এ যেমন রয়েছে রাধাকৃষ্ণের লীলা, তেমনই গ্রামীন মেয়েদের সুখদুঃখের কথা, এয়োস্ত্রীদের দৈনন্দিন যাপনের নানা ছোটোখাটো ছবিও ফুটে উঠছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। আর যে কথা না বললেই নয়, গানগুলোর সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশে আছে প্রকৃতির আমেজ, যা শহরে বসে ঠিক উপলব্ধি করা যাবে না।
তথ্যসূত্র – বঙ্গীয় লোকসংস্কৃতিকোষ, ড. বরুণকুমার চক্রবর্তী সম্পাদিত; প্রবাসী পত্রিকা, ৩৩ তম ভাগ, ২য় খণ্ড।
ছবি কৃতজ্ঞতা – শেখ আফজাল
