মহরমের শোক আর জারি গান

এক সময়ে দুর্গাপুজোতে থাকত জারি গানের আসর

বাঙালি সংস্কৃতিতে ধর্মীয় গানের ঐতিহ্য বেশ সমৃদ্ধ। হিন্দু এবং মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের মানুষই তাঁদের প্রিয় উপাস্যের কাছে মনের ভাব প্রকাশ্যের জন্য নানা ধরনের গান বেঁধেছেন। মধ্যযুগে সাহিত্য ছিল প্রধানত ধর্মকেন্দ্রিক। সেগুলোকে গানের মতো সুর দিয়ে গাওয়াই ছিল দস্তুর। সাহিত্য আর গানের বিভাজন আধুনিক যুগের আগে সেভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। পয়ার ছন্দেই তখন বাঁধা হত বেশিরভাগ গান। কারবালার যুদ্ধক্ষেত্রে ইমাম হোসেনের মৃত্যু উপলক্ষে জারি গান মধ্যযুগের বাংলায় প্রচলিত হয়েছিল। এটিও পাঁচালির মতো করে পয়ার ছন্দেই গাওয়া হয়। এখনও বাংলাদেশ অঞ্চলে এই গানের ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। আসলে কারবালার যে ট্র্যাজিক আবেদন, তা নাড়া দিয়ে যায় জাতি-ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সব মানুষকেই। একটা সময়ে হোসেনের মৃত্যুকে স্মরণ করার জন্য ছোটো ছোটো মর্সিয়া গানই শুধু গাওয়া হত। পরে তার সঙ্গে যুক্ত হয় বড়ো আকারের জারি গান। ধুয়া বলে আরও একটা রীতির গানও প্রচলিত রয়েছে মহরমে।  

ফার্সি শব্দ ‘জারি’-র অর্থ ‘কান্না’, ‘বিলাপ’ অথবা ‘শোক’। ১৬৪৫ সালে কবি মুহম্মদ খান লিখেছিলেন ‘মকতুল হোসেন’ নামের একটি শোকগাথা। এই বইটি সুর করে পাঠ করা হত আশুরার সময়ে। এটিকেই জারি গানের প্রথম নিদর্শন বলে মনে করা হয়। আশুরা মূলত শিয়া মুসলমানদের উদযাপন হলেও পরে সুন্নি মুসলমানদের ভেতরও ছড়িয়ে পড়েছিল এই অনুষ্ঠান। তার সঙ্গে সঙ্গে জারি গানও সুন্নিদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে আশুরার গল্পের পাশাপাশি আরব-পারস্য অঞ্চলের নানান কাহিনি জারি গানে ঢুকে পড়েছিল। জহরনামা, সাদ্দাদের জারি, শাহজালালের জারি, সোহরাব-রোস্তমের জারি গেয়ে বেড়াতে থাকেন স্থানীয় কবিয়ালরা। এদের মাধ্যমেই জারি হয়ে উঠেছিল বাংলা লোকগানের একটা বলিষ্ঠ শাখা। 

জারিতে দুটো দল থাকে। প্রত্যেক দলে থাকে একজন করে বয়াতি বা মূল গায়ক। দুই জারিয়াল দলের মধ্যে প্রশ্নোত্তর হয় তিনটে পর্বে – বন্দনা, গোষ্ঠগান আর মূল জারি গান। মেয়ে-পুরুষ, জীবাত্মা-পরমাত্মা, রাম-হনুমান, আদম-শয়তান, গণতন্ত্র-রাজতন্ত্র, সুফি-মোল্লার মতো বিষয় নিয়ে গান চলে সওয়াল আর জবাবের আকারে। গানের শেষে খানিকটা কবিগানের মতো দুই দলের যে চাপান-উতোর হয়, তাকে ‘জোটক’ বলে। জারি গানের মরসুম হচ্ছে মহরম মাস। মহরমের ৫ তারিখে থেকে ২২ তারিখ পর্যন্ত বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার নেত্রকোণা ও কিশোরগঞ্জ অঞ্চলে প্রায় নিয়মিত আসর বসে জারি গানের। এছাড়াও বছরের অন্য সময়ে মেলা, উৎসব ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও জারি গানের অনুষ্ঠান হয়ে থাকে এখনকার দিনে। এই গান বাংলাদেশ অঞ্চলে এতটাই জনপ্রিয় যে, একটা সময়ে দুর্গাপুজোতেও জারির আসর বসানো হত বলে জানা গেছে।

তথ্যসূত্র – জারীগান, জসীমউদ্দীন; বাংলাদেশী জারীগান, এস.এম লুৎফর রহমান; বাংলাদেশের লোকনাটক : বিষয় ও আঙ্গিক-বৈচিত্র্য, সাইমন জাকারিয়া।

Developed by DXDasia