মুগ-মসুর-মটর : পাতে পড়ুক জৈব পদ্ধতিতে চাষ করা, ক্ষারমুক্ত তিন ডাল

বাঙালির পাতে ভেজাল মুক্ত পুষ্টিকর খাবার

রম ভাতের সঙ্গে একবাটি ডাল; পুষ্টিবিদদের মতে বাঙালি-খাদ্যাভ্যাসের অত্যন্ত পুষ্টিকর একটি দিক। শুধু বাংলা কেন, ভারতের অন্যান্য অংশেও, যেমন গুজরাট, পাঞ্জাব, রাজস্থান, মহারাষ্ট্রেও ডালের বিভিন্ন পদ অতি জনপ্রিয়। ‘তড়কা ডাল’, ‘ডাল মাখানি’, ‘ডাল বাহার’, ‘খাট্টা ডাল’, ‘ডাল বাটি চুরমা’- রকমারি নাম আর স্বাদ।

ভারতে ডাল চাষের ইতিহাস অতি দীর্ঘ। ভারতে ডাল চাষ হয় প্রধানত গাঙ্গেয়-ভাগীরথী উপত্যকায়। ২৫০০-২০০ খ্রিস্টপূর্ব সময়কালের প্রত্ন-উদ্ভিদবিদ্যায় ভারতে ডাল চাষের সাক্ষ্য মেলে। মহাভারতে উদাহরণ মেলে ‛পঞ্চরত্ন ডাল’-এর। মুঘল সম্রাট শাজাহান, ঔরঙ্গজেবের প্রিয় ছিল ‘মোরদাবাদি ডাল’। সেই সময় থেকেই বঙ্গে ডাল চাষের রমরমা, যা চলে আসছে এখনও। মুগ, মসুর, মটর, মাষকলাই, ছোলা, অড়হড়, বিউলি, সোনামুগ- এ সবই বাংলার বিভিন্নরকমের ডালের নাম। 

ডাল প্রধানত শুঁটিজাতীয় মৌসুমী ফসলের শুকনো বীজ। ডাল শরীরের জন‍্য অত্যন্ত উপকারী। এতে প্রোটিনের পরিমাণ শতকরা ২০-২৫ ভাগ থাকে এবং প্রচুর পরিমাণে লাইসিন থাকে। এক কালে দাম সস্তা হওয়ায় এবং প্রভূত পরিমাণ পুষ্টিগুণ থাকায় ডালকে ‘গরিবের আমিষ’ও বলা হত। ডালে প্রোটিনের পরিমাণ গমের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ এবং চালের তুলনায় প্রায় তিনগুণ। ডালে থাকে পর্যাপ্ত পরিমাণ শর্করা ও ফ্যাট।  

বাংলাতে মটর ও মসুর ডালের চাষ হয় নদিয়াতে। মুগ ডালের চাষ হয় মালদায়। এছাড়াও মুর্শিদাবাদ, উত্তর ২৪ পরগনার অনেক অঞ্চলেও ডাল চাষ হয়। 

প্রথমেই বলা যাক মসুর ডালের কথা। শুঁটিজাতীয় এই শুকনো বীজটি বাদামি রঙের খোসাযুক্ত এবং কমলা-লাল রঙের হয়ে থাকে। এই ডালে থাকে হালকা সুগন্ধ। সুনিষ্কাশিত দো-আঁশলা বেলে মাটিতে এই ডাল বেশি চাষ করা হয়। পুরো কার্তিক মাস জুড়েই এই ডাল চাষ করা হয়, তবে পৌষের দ্বিতীয় বা তৃতীয় সপ্তাহে বীজ বপন করতে পারলে ফলন ভালো হয়। মসুর ডালের বীজ জমিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বা সারিবদ্ধভাবে বপন করা হয়। মাটির কিছুটা গভীরতায় বীজ বপন করা হয়। অল্প জলে চাষ করা হয়। ফাল্গুন মাসের মাঝামাঝি থেকে চৈত্র মাসের মাঝামাঝি ফসল সংগ্রহ করা হয়। সার হিসাবে ‍ব্যবহার করা হয় গোবর সার। মসুর ডালে থাকে প্রোটিন, অ্যামিনো অ্যাসিড, পটাশিয়াম, আয়রন ও ভিটামিন বি১ (Vitamin B1)। এই ডাল কোলেস্টেরল ও ডায়াবেটিস কমাতে সাহায্য করে। এই ডালে থাকা ফাইবার ওজন কমায় এবং ক্যালশিয়াম, হাড় এবং দাঁত শক্ত করে। এমনকী, ত্বক-পরিচর্যায়ও কাজে দেয় মসুর ডাল।

 

বাঙালির আর এক প্রিয় ‍খাদ্য মুগ ডাল। দো-আঁশলা বেলে আর এঁটেল মাটিতে এই ডাল চাষ হয়। ভালো সূর্যালোক ও মাঝারি পরিমাণ জলে এর চাষ করা হয়। সার হিসাবে ব‍্যবহার করা হয় গোবর সার। মুগ ডালে থাকে সোডিয়াম, পটাশিয়াম, প্রোটিন, ভিটামিন সি (Vitamin C), ভিটামিন বি৬ (ভিটামিন B6), আয়রন, ম্যাগনেশিয়াম, ক্যালশিয়াম। এতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকায় হার্টের নানান রোগ, ক্যান্সার, পেটের রোগ প্রতিরোধে এই ডাল কার্যকরী। শরীরের তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করে মুগডাল। ফলে গরমকালে নিয়মিত এই ডাল খেলে হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি কমে। আয়রন থাকায় কমে রক্তাল্পতার সমস্যা। 

মটর ডালের মু‍ইঠ্যা, মটর ডালের বড়া, মটর ডালের ঘুগনি, মটরের ডালনা, মটর-পনির, বাঙালির অতি প্রিয়। মটর ডালের মুইঠ্যাতে মজেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মটর হলো কলাই বা ডালজাতীয় ‍শস্য। এটি শীতকালের ফসল। পলি বা এঁটেল মাটিতে মটর চাষ ভালো হয়। গোবর সার ব‍্যবহার করা হয়। মটরে থাকে অনেকরকমের ভিটামিন, যেমন- ভিটামিন বি১ (Vitamin B1), ভিটামিন বি৫ (Vitamin B5), ভিটামিন এইচ (Vitamin H), ভিটামিন কে (Vitamin K) ইত্যাদি। এছাড়াও থাকে বিভিন্নধরনের খনিজ যেমন, আয়রন, কোবাল্ট, ম্যাগনেশিয়াম, ফসফরাস, সিলিকন, ইত্যাদি। মটর ডাল বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে দারুণ কার্যকর, যেমন- স্থূলত্ব, রক্তাল্পতা, গাইটার। মটর ডালে লেসিথিন, ইনোসিটল, কোলাইন, ইত্যাদি পদার্থ থাকায় এটি হৃদরোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে এবং শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রাকে নিয়ন্ত্রন করে।

তবে, অনেকক্ষেত্রে ডাল চাষে ‍ব্যবহার করা হয় ক্ষতিকর রাসায়নিক সার। সেসব ডাল খেলে উপকারের থেকে অপকার হয় বেশি। গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা, আলসার, যকৃতের ক্যান্সার, গলব্লাডারের ক্যান্সার সহ হতে পারে ব্লাড প্রেসার, সুগার বিভিন্ন রোগ। স্নায়ু দুর্বল হয়ে যেতে পারে। অনেক জায়গায় ডালে মেশানো হয় ক্ষার, তাই ডাল ধোওয়ার সময় ফেনা তৈরি হয়। তাই ক্রেতাদের সতর্ক থাকা উচিত। এমন জায়গা থেকেই ডাল কেনা উচিত, যাঁরা জৈব পদ্ধতিতে চাষ করা ডাল রাখেন। 

দ্য বেঙ্গল স্টোর (The Bengal Store)-এর এক কর্মীর কথায়, “আমরা সরাসরি চাষিদের কাছ থেকে ডাল কিনি। সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতিতে চাষ করেন তাঁরা, শুধুমাত্র গোবর সার ব‍্যবহার করেন। তাছাড়াও আমরা খড়গপুর আইআইটির পরীক্ষাগার থেকে ডালের গুণমান যাচাই করে নিই। তাই গ্রাহকেরা ভরসা করেন আমাদের উপর।”

অতএব, সুষম আহারের জন্য খাদ্য তালিকায় এক বাটি ডাল রাখতেই হবে। এখন জৈব পদ্ধতিতে চাষ করা ডাল মানুষের পাতে তুলে দিচ্ছেন বাংলার চাষিরা। যা কিনবেন দেখেশুনে কিনুন। কী খাব-কেন খাব, কোনটা খাঁটি, কোনটা ভেজাল তা ঠিক করার দায়িত্ব কিন্তু ক্রেতাদেরই। তবে, বিশেষ কিছু শারীরিক সমস্যা বা রোগের ক্ষেত্রে কিছু ডাল খাওয়া চলে না, সেক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।  

______________
*দ্য বেঙ্গল স্টোরের ডাল কিনতে হলে এখানে ক্লিক করুন 

Developed by DXDasia