রোগ নিরাময়ে, স্বাদ ও সৌন্দর্য বাড়াতে আজও অব্যর্থ খাঁটি সরষের তেল

বিষমুক্ত, নির্ভেজাল সরষের তেলের হাজারো গুণ

বাঙালির জীবনে সরষের তেলের অপার মহিমা! সরষের তেল ছাড়া যেকোনও ভর্তা বা ইলিশ ভাপা? ভাবাই যায় না! আবার ধরুন সান্ধ্যকালীন মুড়িমাখা, কয়েক ফোঁটা সরষের তেলের ঝাঁঝ না হলে চলে না। সরষের তেলের অন‍্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য এর ঝাঁঝ এবং তীক্ষ্ণ গন্ধ। আচার ও সস তৈরিতেও অবশ্যম্ভাবী উপাদান এই তেল। গরম ভাতে লঙ্কা, পেঁয়াজ আর আলুসিদ্ধ বা ডিমসিদ্ধের সঙ্গে কয়েকফোঁটা সরষের তেল, পরম উপাদেয় আহার। শুধু রাঁধাবাড়া, খাওয়া-দাওয়া নয় ত্বকের যত্ন, রোগ নিরাময়, ঘর আলোকিত করতেও এই তেল দারুণ কার্যকরী। অথচ, আজ অনেকেই দূরে ঠেলে দিয়েছেন সরষের তেলকে।

নদিয়ার শান্তিপুর অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে চাষ করা হয় সরষের। সেই সরষের বীজ পেষাই করে পাওয়া যায় বিশুদ্ধ সরষের তেল। নদিয়া ছাড়াও বাংলার আরও অনেক জেলাতেই সরষের চাষ হয়, যেমন- উত্তর ২৪ পরগণা। সরষের বীজগুলিকে প্রথমে মাটিতে ছড়ানো হয় এবং জল দেওয়া হয়। তারপর সেই মিশ্রণকে ভাপ দেওয়ার মাধ‍্যমে বিশুদ্ধ করে পেষাই করলেই পাওয়া যায় সুপাচ্য সরষের তেল। 

ভেজালমুক্ত সরষের তেল যে শুধুমাত্র রান্নাকে সুস্বাদু করে তোলে, তাই নয়, সরষের তেলের আছে অনেকরকমের স্বাস্থ্যগুণ। সরষের তেলের উপকারিতা বলে শেষ করার নয়। এই তেল নিয়মিত মাখলে গায়ের ত্বক চকচকে হয় ও মাথার চুল বড়ো হয়। কাশি-সর্দি কমাতেও উষ্ণ সরষের তেল কার্যকরী। এই তেলে প্রচুর পরিমাণে মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে, যা শরীরের ট্রাইগ্লিসেরাইডের পরিমাণ কম করে, ব্লাড প্রেশার ও সুগারকে নিয়ন্ত্রিত রাখে। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় এও দেখা গেছে যে, সরষের তেলের নিয়মিত ব‍্যবহার নিয়ন্ত্রন করতে পারে কিছু বিশেষ ধরনের ক্যান্সারকেও।

খাঁটি সরষের তেলের খাদ্যগুণ প্রচুর। এর ক্যালোরিফিক মূল্য প্রতি ১০০ গ্রামে ৮৭৬ কিলো ক্যালোরি, যা শিশুদের বেড়ে ওঠার পক্ষে খুবই উপযোগী। সরষের তেলে আছে ভিটামিন ই (Vitamin E), যা দেহকোষকে সজীব রাখে। এছাড়াও এতে আছে উপকারী ওমেগা-৩ এবং ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড, উচ্চ রক্তচাপকে নিয়ন্ত্রন করে। এই তেলে কোলেস্টেরল-মুক্ত। এই তেলে আছে আয়রন, যা রক্তের দূষিত পদার্থকে কম করে রক্তকে পরিচ্ছন্ন রাখে। 

তবে অনেকক্ষেত্রে সরষের তেলে মেশানো হয় ভেজাল। মেশানো হয় রাসায়নিক, শেয়ালকাঁটা বীজের তেল, রেডির তেল, খনিজ তেল, ধুতুরা (তেলের ঝাঁঝ বাড়ানোর জন্য)। এই তেল গ্রহণ করলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় হার্ট, অন্ত্র, যকৃত। ভেজাল তেলের নিয়মিত ব্যবহারে হতে পারে ড্রপসি রোগ। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া স্বরূপ দেখা দেয় পা ফোলা, বমিভাব, ডায়রিয়া, চোখের গ্লুকোমার মতন রোগ। তাই ক্রেতাদের এই বিষয়ে আরও সতর্ক হওয়া দরকার। ভেজাল তেলের বদলে কেনা উচিত বিষমুক্ত সরষের তেল। বর্তমানে বাংলার বিভিন্ন চাষি সংগঠন, স্বর্নিভর গোষ্ঠী ক্রেতাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতিতে চাষ করা নির্ভেজাল সরষের তেল। যেমন- 

দ‍্য বেঙ্গল স্টোরের (The Bengal Store) এক কর্মী জানাচ্ছেন, “আমরা নদিয়ার শান্তিপুর থেকে সরষের তেল কিনি। সরষে  চাষের সময় চাষিরা গোবর সার ব‍্যবহার করেন। ফলে, আমাদের সরষের তেল সম্পূর্ণ খাঁটি, সবরকমের বিষ ও রাসায়নিক-মুক্ত। তাছাড়া আমরা খড়গপুর আইআইটির পরীক্ষাগার থেকে এই তেল পরীক্ষা করে নিই। কাজেই গ্রাহকেরা ভরসাও করেন।”

ল্যাবরেটরি ছাড়া বাড়িতেও আপনি ঘরোয়া কিছু পদ্ধতির মাধ্যমে পরীক্ষা করে নিতে পারেন তেল খাঁটি না ভেজাল। তবে হ্যাঁ, ভোজ্য তেলে ভেজাল ধরা পরীক্ষাগার ছাড়া প্রায় অসম্ভব। তবে সাধারণভাবে কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে। উনুনে চাপালে তেলে যদি বেশি ফেনা হয়, অস্বাভাবিক গন্ধ ছাড়ে বা কিছুক্ষণ ফোটালে রং চলে যায়, তাহলে বুঝতে হবে ভেজাল আছে। টেস্টটিউবে তেল নিয়ে প্রায় দ্বিগুণ নাইট্রিক অ্যাসিড ঢেলে ঝাঁকাতে হবে। অ্যাসিড স্তর লাল হয়ে গেলে বোঝা যাবে যে, ওই তেলে শিয়ালকাঁটা বীজের তেলের মিশেল আছে। অথবা, টেস্টটিউবে তেল ও ইথার নিয়ে ভালো করে ঝাঁকিয়ে নিন। তারপর মিশ্রণটি পাঁচ মিনিট ধরে ঠান্ডা করুন। ইথার দ্রবণ আস্তে আস্তে ঘোলাটে হয়ে এলে, বুঝতে হবে যে তেলে রেডির তেল মিশেছে। 

পরিশেষে বলি, বাজার থেকে দাম দিয়ে ভেজাল খাবেন না খাঁটি, তা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে একমাত্র ক্রেতাদেরই। অতএব, কী খাব-কেন খাব, কোনটা খাঁটি, কোনটা ভেজাল বুঝে, সচেতন হয়ে তবেই যা কেনার কিনুন। বিষমুক্ত খাবার খান,  সুস্থ থাকুন।  

*দ‍্য বেঙ্গল স্টোর থেকে সরষের তেল কিনতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন। 

Developed by DXDasia