কান চলচ্চিত্র উৎসবে এবার বাংলাদেশি ছবি, আবেগে ভাসছে দুই বাংলা

ওপার বাংলা থেকে কথা বললেন ছবির অভিনেত্রী ও সহ-প্রযোজক

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে ইতিহাস সৃষ্টি করে এই প্রথম সেদেশের কোনও বাংলা ছবি ফ্রান্সের কুলীন কান চলচ্চিত্র উৎসবে মনোনয়ন পেয়েছে ‘আঁ সার্তে রিগা’ বিভাগে, প্রতিভাবান ও প্রতিশ্রুতিমান তরুণ পরিচালকদের সঙ্গে বিশ্বকে পরিচয় করিয়ে দিতে ১৯৭৮ সালে যে বিভাগটি চালু করেছিলেন জিল জ্যাকব। এই বিভাগে সারা বিশ্বের বিভিন্ন নন-ট্র্যাডিশনাল ছবিকে পুরস্কৃত করা হয়। 

আগামি ৬ জুলাই থেকে কান-এ বসবে ৭৪তম চলচ্চিত্র উৎসবের আসর। সেই উৎসবে এবার সামিল হচ্ছে বাংলাদেশের তরুণ পরিচালক আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ নির্মিত বাংলা ছবি ‘রেহানা মরিয়ম নূর’, যে ছবি নিয়ে আবেগে ভাসছে দুই বাংলাই। 

কান চলচ্চিত্র উৎসবের সঙ্গে বাংলা ছবির যোগাযোগ অনেকদিনের, তাই তাকে ঘিরে বাঙালির আবেগ একটু বেশিই। ‘আঁ সেত্রাঁ রিগা’ বিভাগে সত্যজিৎ রায়ের শেষ ছবি ‘উত্তরণ’ নির্বাচিত হয় ১৯৯৪ সালে, তাঁর মৃত্যুর দুবছর পর। অবশ্য ১৯৯২ সালে ছবির শুটিং শুরুর এক মাস আগে হাসপাতালে ভর্তি হন সত্যজিৎ, তাই ছবির কাজ শেষ করেন তাঁর পুত্র সন্দীপ । কান-এর সঙ্গে জড়িয়ে আছেন মৃণাল সেনও, যিনি ১৯৮২-তে ছিলেন চলচ্চিত্র উৎসবের জুরি মেম্বার, ‘খারিজ’ তৈরি হচ্ছে তখন। চার্লি চ্যাপলিন-এর কন্যা জেরাল্ডিন ছিলেন মৃণালের সহ বিচারক, বিচারক ছিলেন কিংবদন্তী কলম্বিয়ান ঔপন্যাসিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজও। শিল্পভাবনার বীজ কীভাবে গেঁথে যায় মাথায়, তা নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দিতেন তাঁরা।

এবার ‘আঁ সার্তে রিগা’ বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছে ১৫টি দেশের ১৮টি ছবি, যেগুলির মধ্যেই রয়েছে ‘রেহানা মরিয়ম নূর’। প্রয়াত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের পর এই প্রথম বাংলাদেশের কোনও ছবি কানের একটি মর্যাদাপূর্ণ বিভাগে জায়গা করে নিল। এর আগে ২০০২ সালে ৫৫ তম উৎসবের প্যারালাল সিনেমা বিভাগে ‘ডিরেক্টরস ফোরনাইট’-এ নির্বাচিত হয় তারেক মাসুদ পরিচালিত ‘মাটির ময়না’, পেয়েছিল FIPRESCI পুরস্কার। 

রেহানা মরিয়ম নূর চলচ্চিত্রের এর দু’টি দৃশ্য

সাদের জন্ম বাংলাদেশের চট্টগ্রামে। পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে। ছাত্রাবস্থায় শূন্য দশকের শেষভাগে টিভি নাটকের চিত্রনাট্য লেখা শুরু করেন, পাশাপাশি বেশ কয়েকটি ছোট ছবি বানিয়েছেন তিনি। ২০০৯ পরবর্তী সময়ে সাদের ‘অগাস্টে লেখা গল্পসমগ্র’, ‘লিটল অ্যাঞ্জেল আই অ্যাম ডায়িং’, ও ‘একটি যথাযথ মৃত্যু’ সহ বেশ কয়েকটি টিভি নাটক পরিচালনা করেন ওয়াহিদ তারেক। 

আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ 

২০১৬ সালে সাদ তৈরি করেন তাঁর জীবনের প্রথম ছবি, ‘লাইভ ফ্রম ঢাকা’, যা মুক্তি পায় ২০১৯ সালে। মুক্তির পর ছবিটি প্রশংসিত হয় এবং বাংলাদেশে মুক্তির আগে ছবিটি সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা পরিচালক ও অভিনেতার পুরস্কারও পায়। এ ছাড়াও রটারডাম, লোকার্নো, সিনেইউরোপা সহ বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় এটি। 

অথচ এ পর্যন্ত কোনও সাক্ষাৎকার বা টক শোতে দেখা যায়নি সাদকে। ফেসবুক বা অন্য কোনও সামাজিক মাধ্যমে তাঁর অ্যাকাউন্ট নেই, এমনকি ইন্টারনেটে তাঁর দু-একটার বেশি ছবিও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর! বরাবরই কাজে ডুবে থাকতে ভালোবাসেন ৩৬ বছর বয়সী এই পরিচালক। কান-এর অফিসিয়াল সিলেকশনে জায়গা করে নিয়ে দেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনে হৈচৈ ফেলে দেওয়ার পরও ছবিটি নিয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া জানাননি সাদ। বাংলাদেশে এখন ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ ব্যক্তি বোধহয় তিনিই।  

অনেক খোঁজাখুঁজি, অনুরোধের পর দেশ-বিদেশের সংবাদমাধ্যমের জন্য একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে সাদ জানিয়েছেন, “কান চলচ্চিত্র উৎসবের অফিশিয়াল সিলেকশনে বাংলাদেশের প্রথম ছবি হিসেবে ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ আমন্ত্রিত হওয়ায় আমি আনন্দিত এবং সম্মানিত। এই অর্জন পুরোপুরি আমার টিমের। তাঁরা সবাই মিলে অমানুষিক কষ্ট করেছেন আর সর্বোচ্চ উদ্যমটা দিয়েছেন। আমি কৃতজ্ঞ এই মেধাবী টিম এবং আমার খুব সেনসিটিভ অভিনয় শিল্পীদের কাছে। তাঁরা ছাড়া আমি কখনোই এতটুকু আসতে পারতাম না।”

বিবৃতিতে নিজের ছবির গল্প প্রসঙ্গেও জানিয়েছেন সাদ। বলেছেন, “মধ্যবিত্ত পরিবারে অনেক ভাইবোনের মধ্যে আমি বেড়ে উঠেছি। আমার চিন্তাভাবনায় তাঁদের অনেক প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে আমার বড় তিন বোনের। রেহানাকে নিয়ে লিখতে শুরু করি সম্ভবত সেরকম একটা জায়গা থেকেই। একটু একটু করে রেহানাকে নিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করতে শুরু করি। তার ভেতরের ক্ষোভ আর অবিশ্বাস নিয়ে ভাবি। তার ভেতরের কমপ্লেক্সিটি এবং কনট্রাডিকটরি আচরণ বোঝার চেষ্টা করি। রেহানা কী চায় এবং কেন চায়, এটা নিয়ে লিখতে লিখতে ক্রমে আরও প্রশ্ন বের হয়ে আসতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত ওই প্রশ্নগুলোই আমাকে ইন্সপায়ার করে ছবিটা করতে।”

রেহানা মরিয়ম নূর নামে একজন সহকারী অধ্যাপকের জীবন সংগ্রামের ভিত্তিতে নির্মিত এই ছবির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন অভিনেত্রী আজমেরি হক বাঁধন। তিনি জানিয়েছেন “এটা বাংলাদেশের একটি অর্জন। এটা আমাদের সবার অর্জন।”

(পরিচালককে সরাসরি পাওয়া না গেলেও আমার সঙ্গে ওপার বাংলা থেকে ফোনের মাধ্যমে ছবির বিষয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা ভাগ করে নিয়েছেন ছবির সহ-প্রযোজক রাজীব মহাজন। এখানে রইল সেই ফোনালাপের কিছু অংশ।)

সাদ কি বরাবরই এরকম অন্তর্মুখী? 

হ্যাঁ, সেরকমই বলা যায়। ওর ছবি কানে নির্বাচিত হওয়ার পর ওর সঙ্গে যখন দেশ-বিদেশের সংবাদমাধ্যম থেকে যোগাযোগ করা হচ্ছিল, ও প্রথম প্রথম কথা বলার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ওর ‘অ্যাংজাইটি’ থাকায় এত কথা বলা, সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা ওর পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। কথায় নয়, কাজে বিশ্বাস করে ও। কথা বলে কাজ হয় না, কাজ হয় কাজের মাধ্যমে – এটা সাদ আমাদের নতুনভাবে উপলব্ধি করিয়েছে। সাদ চায় ওর দৃশ্যগুলো ওকে তুলে ধরুক, ওকে পরিচয় করিয়ে দিক। আমার মনে হয়, প্রত্যেক শিল্পীরই নিজস্ব কিছু চিন্তা থাকে। তাই ওর সিদ্ধান্ত আমরা মেনেই নিয়েছি। আড়ালে থেকে কাজ করাটা হয়তো সেই চিন্তারই বহিঃপ্রকাশ। এটাকে আমরা শ্রদ্ধাও করি।

২০১৮ সালে বুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সাদ এবং ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ ছবির প্রযোজক জেরেমি চুয়াও-এর সঙ্গে আপনাকে একটি ছবিতে দেখা যায়, সাদের সঙ্গে আলাপের সূত্রপাত কি তখন থেকেই?

না, সাদের সঙ্গে আমার পরিচয় অনেক আগের। ২০১৭ সালে ওর দ্বিতীয় ছবির ব্যাপারে সাদ আমার সঙ্গে কথা বলে। আমরা প্রযোজক খুঁজতে থাকি। আমাদের সঙ্গে যুক্ত হন এই ছবির অন্যতম প্রযোজক জেরেমি চুয়াও। এক্ষেত্রে একটা কথা বলি, শুরুতে ছবির প্লটে রেহানা ছিল না, ছিল ব্যাঙ্ককের এক যুবকের গল্প। কিন্তু সেই চিত্রনাট্য বাস্তবের সঙ্গে কানেক্ট করাটা মুশকিল হয়ে যাচ্ছিল। টাকার সঙ্গে এমন অনেক কিছুর প্রয়োজন ছিল, যা আমাদের জন্য সহজলভ্য ছিল না। 

বিভিন্নরকম সমস্যার কারণে ছবির চিত্রনাট্য পাল্টানো হয়। কিন্তু…সমস্যা তাতেও মিটল না। ‘রেহানা মরিয়ম নূর’-এর চিত্রনাট্য ফিরিয়ে দিলেন একের পর এক প্রযোজক। তারপর আমরা আর বসে থাকতে পারিনি। নিজেরাই ছোট্ট টিম বানিয়ে বন্ধুদের কাছ থেকে অর্থ সাহায্য নিয়ে, লোন নিয়ে ছবির কাজ শুরু করি। কম বাজেটে কীভাবে ছবিটা বানানো যাবে, তার পরিকল্পনা করে ফেলি। খুব ছোট্ট একটা টিম নিয়ে পুরো ছবির শুটিং হয়েছে। কুমিল্লার ইস্টার্ন মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হসপিটাল এবং হোস্টেলেই পুরো ছবিটা শুট করা হয়।একটাই লোকেশন, একটাই ক্যামেরা, একটাই লেন্স, এবং দিন-রাতের পার্থক্য বোঝাতে স্টুডিও লাইট ব্যবহার করি আমরা। এই ছবিটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে পৌঁছে যাবে, এ বিষয়ে আমাদের কোনও ধারণা ছিল না। আমরা খুবই খুশি।

২০১৮ সালে বুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের এশিয়ান প্রজেক্ট মার্কেটে ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ ছবির পরিচালক আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ, প্রযোজক জেরেমি চুয়াও এবং সহ–প্রযোজক রাজীব মহাজন।

সাদ এখন কী করছেন, কী ভাবছেন?  

এই মুহূর্তে সাদ ছবিটিকে উৎসব উপযোগী করে তোলার কাজে ব্যস্ত রয়েছে। গুলশন অফিসে চলছে ছবির মিউজিক, পোস্টার সহ নানা কাজ। এখন সেদিকেই মনোযোগ দিয়েছে। উৎসবে ছবির প্রিমিয়ার হওয়ার পর সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলবে সাদ।

সাধারণ দর্শক কবে দেখতে পাবেন?

আপাতত বিশ্বের বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হবে, তারপর বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহে এবং ওটিটি সহ অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পাবে ‘রেহানা মরিয়ম নূর’।

 

ছবিগুলি বঙ্গদর্শন-কে দিয়েছেন রাজীব মহাজন

 

 

Developed by DXDasia