এক অপ্রাসঙ্গিক সংলাপ : স্বল্প পরিসরে মুক্তির উপায় খুঁজেছেন পরিচালক মৈনাক গুহ

এখনও পর্যন্ত ১৮টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উৎসবে মনোনীত হয়েছে এই ছোটো ছবি

নরওয়ের প্রখ্যাত সাহিত্যিক জো নেসবো (Jo Nesbo) একবার বলেছিলেন, “Losing your life is not the worst thing that can happen. The worst thing is to lose your reason for living.” একটি জীবন। পুরোটাই যেন সাঁকো। তার এপার ওপার আছে। হাঁটাচলা আছে। ঝগড়া, ব্যথা, উৎসাহ, উত্তেজনা, বাঁচার মতো বাঁচা কিংবা মৃতের মতো বাঁচা — সবই আছে। কিন্তু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যেমন নিজেকে প্রশ্ন করেন, “আমি কীরকম ভাবে বেঁচে আছি” — তার উত্তর অনেকসময় জীবিত মানুষটির কাছে থাকে না। তখন সে একই প্রশ্ন নিয়ে হাজির হতে চায় প্রিয় মানুষের কাছে। কিন্তু সেই মানুষটির কি উত্তর জানা আছে? তার জীবনেও হয়তো একই প্রশ্নের ঘাত-প্রতিঘাত এবং একই উত্তরের সন্ধান-ব্রত। তবে যতক্ষণ আমাদের শরীরে প্রশ্ন আছে, ততক্ষণ আমরা জীবিত। যদি সেই প্রশ্নের জায়গায় আসে স্টেটমেন্ট? যদি সেই মানুষটি ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে সোচ্চার হন “মৃত্যু আমার জন্মগত অধিকার”। মৃত্যু তখন ব্যক্তি মানুষের ফ্যাসিনেশন নয়, সমষ্টির কোরাস। আমাদের দেশের লেখক সমরেশ মজুমদার এটাকেই বোধহয় ‘সহজ’ ‘নিঃশব্দ’ বলেন। বলেন, “মৃত্যু কি সহজ, কি নিঃশব্দে আসে অথচ মানুষ চিরকালই জীবন নিয়ে গর্ব করে যায়।”

ছবির একটি দৃশ্য

মৈনাক গুহর (Moinak Guho) ছবিতে মৃত্যু আসে বেঁচে যাওয়ার তাগিদে। যেন মরে গেলেই বাঁচা যাবে। মৈনাকের আধ ঘণ্টার ছবি ‘এক অপ্রাসঙ্গিক সংলাপ’ (An Irrelevant Dialogue) ছুঁড়ে দেয় অনেকগুলো প্রশ্ন এবং জীবন সম্পর্কে বোধ। অশীতিপর দুই বয়স্ক দম্পতি (শংকর এবং ইলা বাগচি) যে যার মতো একা। যেখানে খাবার টেবিল, ঘরের জীর্ণ সিলিং, অবেলার বৃষ্টি, চোখের ড্রপ, স্বামী-স্ত্রীর শাড়ি ভাঁজ করা, ভাঙা বারান্দা, মধ্যরাতের ট্রাম, এমনকি শেষ দৃশ্যে বেদানা খাওয়ার দৃশ্য প্রত্যেকটি স্বয়ংসম্পূর্ণ চরিত্র হয়ে ওঠে। শেষ বয়সে এসে শরীর দিতে না পারার নিস্তেজতা ধরা পড়ে দীর্ঘ এক একটি ফ্রেমে। সত্যি ঘটনা অবলম্বনে বানানো এই ছবির ইন্সপিরেশন নিয়ে লেখক-পরিচালক মৈনাক গুহ বলেন, “মুম্বাইয়ের প্রবীণ দম্পতি নারায়ণ লাভাতে এবং ইরাবতী লাভাতেকে নিয়ে একটা খবর পড়েছিলাম ২০১৮-র শুরুতে৷ তখনই সেটা লিখে রেখেছিলাম পরে বড়ো ছবি করব বলে। পরবর্তীতে কিছু সমস্যার কারণে বড়ো ছবি বানাতে পারিনি। এসআরএফটিআই (SRFTI)-এর প্রযোজনায় ছোটো ছবি করলাম। মিস্টার লাভাতের জীবনদর্শনের সঙ্গে আমি নিজের ভাবনা-চিন্তার একটা মিল পাই। উনি যে ধরনের চিন্তাধারা নিয়ে ষাট-সত্তরের দশক থেকে জীবনযাপন করছেন, সেগুলো আমার মনে হয় আজকের সময়ে দাঁড়িয়েও অত‍্যন্ত আধুনিক।”

ছবির একটি দৃশ্য

একটা আইসোলেটেড জীবনযাপন করতে করতে দম্পতি যেন নিজেদেরই দোষ দিতে থাকেন। রাষ্ট্রপতিকে চিঠি লিখে বলেন, নিজেদের অপরাধ এবং সেই অপরাধকে বিশ্বাস করার কথা। অকপটে দোষ স্বীকার করে নেন। পরিণতির জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। কীসের অপরাধ? ছত্রে ছত্রে ধরা আছে পুরো ছবিতে।

শুটিং-এর দৃশ্য

এসআরএফটিআই-এর ছাত্র মৈনাকের ভালোলাগা ছিল অল্টারনেটিভ ছবির প্রতি। ফিল্মস ডিভিশনের গ্র‍্যান্ট পেয়ে ২০১৬ সালের পরবর্তী সিঙ্গুর নিয়ে একটি কাজ করেন। কাজ করেছেন উত্তরবঙ্গের চা বাগান নিয়েও। ‘বাপি গ্রিন ট্যাক্সি’ নিয়ে প্রথম একটি তথ্যচিত্র বানান, পুরস্কৃতও হয়। এছাড়াও সহযোগী পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন নিষ্ঠা জৈন, সৌরভ সারঙ্গী, নাঈম মোহাইমিন, অনির্বাণ দত্তের সঙ্গে।‘এক অপ্রাসঙ্গিক সংলাপ’ এযাবৎকাল পর্যন্ত ১৮টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উৎসবে মনোনীত হয়েছে। সাউথ এশিয়ান শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল থেকে ঋত্বিক ঘটক সিলভার অ্যাওয়ার্ড, কলিঙ্গ গ্লোবাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল থেকে বেস্ট স্টুডেন্ট শর্ট ফিকশন অ্যাওয়ার্ড, জার্মানির মিউনিখ ফিল্মস্কুল ফেস্ট থেকে সেরা চিত্রগ্রাহকের পুরস্কার-সহ মোট ৭-৮টি পুরস্কার পেয়েছে মৈনাক গুহ এবং টিম।মৈনাকের ছবির চরিত্রেরা মৃত্যুর মিছিলে হাঁটেন না। বরং বন্দিজীবন থেকে খুঁজে নিতে চান মুক্তি এবং একার অস্তিত্ব ভিড়ের অস্তিত্বে মিশে বলে মৃত্যু তাঁদের জন্মগত অধিকার। চরিত্রদের উপস্থিতি, সেট, লাইট, ক্যামেরা মুভমেন্ট ধীর গতিতে এগিয়েছে। এখানেই এই ছবির মূল আকর্ষণ। প্রোডাকশন ডিজাইনে শ্রীরূপ সরকার এই চমৎকার কাজটি করেছেন। যোগ্য সঙ্গত দিয়েছে কেনিথ সাইরাসের ক্যামেরা। অনবদ্য অভিনয় করেছেন কল্যাণ চ্যাটার্জি এবং মায়া ঘোষ। এই ছবির মাধ্যমে পরিচালক মৈনাক গুহ হয়ে উঠেছেন সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম শক্তিশালী পরিচালক।

মৈনাকের সঙ্গে নারায়ণ লাভাতে এবং ইরাবতী লাভাতে

জীবনের কাছে দুর্দশাগ্রস্থ হয়ে যে দম্পতি অধীর আগ্রহে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছেন, তাঁদের জন্য এলোমেলো ছড়ানো থাক বেদানার খোসা আর বীজ। ভাঙা বাড়ি, অল্প পেনশন, ওষুধের অত্যধিক খরচে জমা থাক মুক্তির মন্ত্র। প্রতিধ্বনিত হোক চারপাশের শূন্যতা।

 

এক অপ্রাসঙ্গিক সংলাপ (An Irrelevant Dialogue) | চিত্রনাট্য ও পরিচালনা- মৈনাক গুহ | সম্পাদনা- ঈশান শীল | চিত্রগ্রাহক- কেনিথ সাইরাস | আবহ সংগীত- মিয়াং ইয়ু | সাউন্ড রেকর্ডিং এবং ডিজাইন- অর্কদীপ কর্মকার। অভিনয়- কল্যাণ চ্যাটার্জি, মায়া ঘোষ | প্রযোজনা- SRFTI

 

Developed by DXDasia