মহিষাসুর তাঁদের পূর্বপুরুষ, একসময় তাই দুর্গাপুজোয় অংশ নিতেন না অসুর সম্প্রদায়

দুর্গাপুজো তাঁদের কাছে শোকদিবস, এখনও বিশ্বাস করেন কেউ কেউ

পুজো এলেই উত্তরবঙ্গের চা বাগানে অনেকের মধ্যে আলোচনায় উঠে আসে অসুর সম্প্রদায়ের নাম। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটছে না। একটা সময় এই অসুর সম্প্রদায় দুর্গাপুজোতে অংশ নিতেন না। অসুর সম্প্রদায়ের প্রবীন মানুষেরা বিশ্বাস করেন, তাঁরা মহিষাসুরের বংশধর। মহিষাসুর তাঁদের পূর্বপুরুষ। মা দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করেছেন। তাই তাঁরা দুর্গাপুজোয় অংশ নেন না। বরং ওই সময় তাঁরা শোকদিবস পালন করে এসেছেন। পুজোর দিনগুলোয় তাঁরা বাড়ির চারপাশটা কালো কাপড়ে ঢেকে রাখতেন। কিন্তু এখন সেই ধ্যানধারনার খানিক পরিবর্তন ঘটছে। 

আধুনিক হচ্ছেন অসুর সম্প্রদায়। যদিও কোথাও কোথাও পুরোনো রীতিনীতি এখনও রয়েছে। মালদার পাকুয়াহাটে ঘটা করে অসুর পুজোর পর মেলাও বসে। 

মহিষাসুর নাকি তাঁদের পূর্বপুরুষ

মালদা জেলার পাকুয়াহাট ছাড়াও ডুয়ার্স বা আলিপুরদুয়ার জেলার কেরন চা বাগান, কুরথি চা বাগান, সাঁতালি চা বাগান, দলসিংপাড়া, আলিপুরদুয়ার ২নম্বর ব্লকের মাঝেরডাবরি, কোচবিহারের বড়ো শৌলমারী অঞ্চল, মাথাভাঙার হাজরাহাটে অসুর সম্প্রদায়ের বসবাস। এছাড়াও শিলিগুড়ি মহকুমার নকশালবাড়ির চা বাগান, ডুয়ার্সের কাদম্বিনী চা বাগান, হান্টাপাড়া, মধু বাগান, তুলসী পাড়াতেও কিছু সংখ্যক অসুর সম্প্রদায়ের বসবাস।

১৯৯১ সালের এক সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী উত্তরবঙ্গের আদিম জনজাতি অসুর সম্প্রদায়ের মধ্যে ৫২ শতাংশ চা শ্রমিক, ১৫ শতাংশ কৃষক এবং ১৩ শতাংশ খেত মজুর। অনেকে বনবস্তিতে কৃষি কাজ করেন। এদের মধ্যে ৪৮ শতাংশ হিন্দু, এক শতাংশ মুসলিম, চার শতাংশ বৌদ্ধ, পনেরো শতাংশ খ্রিস্টান। গবেষকরা আবার অনেকে বলছেন, অসুর সম্প্রদায়ের প্রধান উপাস্য সিং বোঙা এবং মারাং বোঙা। সিং বোঙাকে সন্তুষ্ট রাখতে অনেকে সাদা মোরগ উৎসর্গ করেন আর মারাং বোঙাকে সন্তুষ্ট রাখতে অনেকে লাল মোরগ উৎসর্গ করেন। তাদের অনেকের গ্রাম দেবতা মহাদানিয়া ও পাট দেবতা। সাদরি, সাঁওতালি ভাষা ভালো বোঝেন। হিন্দিও বোঝেন। তবে যারা শহরের কাছাকাছি থাকেন তাঁরা বাংলা বোঝেন, বাংলাতে কথাও বলতে পারেন। সর্বশেষ সমীক্ষা অনুযায়ী গোটা উত্তরবঙ্গে তাদের সংখ্যা এখন ৬০০।

অসুর সম্প্রদায়ের প্রবীণরা বলেন, একটা সময় পুজোর ঢাকের আওয়াজ না শোনার জন্য তাদের অনেকে ভুটানের জঙ্গলে গিয়ে সময় পার করতেন। বীরপাড়ার বিশিষ্ট সমাজসেবী সাজু তালুকদার বলেন, নাগরাকাটা থানার কেরন চা বাগানের ভুটান সীমানার কাছে অসর সম্প্রদায়ের একশো পরিবার বসবাস করেন। গতবছর কলকাতার একটি সংস্থা পুজোর আগে নতুন জামাকাপড় বিলি করার জন্য  নিয়ে এলে তিনি অসুর সম্প্রদায়ের গ্রামে গিয়েছিলেন। সেখানে বস্ত্র বিতরনের পাশাপাশি খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থাও হয়। তবে শিক্ষার দিকে খুবই অনগ্রসর এই অসুর সম্প্রদায়। এখন অবশ্য তাঁরা অনেকেই আধুনিক হয়ে পুরোনো ধ্যানধারণা থেকে বেরিয়ে আসছেন। 

ফালাকাটা কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক সনাতন বিশ্বাস ক'বছর আগে উত্তরবঙ্গের অসুর সম্প্রদায়ের উপর এমফিল করেছেন। তিনি জানালেন, ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিনি এমফিলের জন্য অসুর সম্প্রদায়ের উপর কাজ করেছেন। গত বছর অক্টোবর মাসে তিনি মালদার পাকুয়াহাটে অসুর পুজোর অনুষ্ঠানে যোগ দেন। রীতিমতো অসুরের মূর্তি এনে সেখানে পুজো হয়। আর সেজন্য মেলাও বসে। যদিও সেই মেলায় অসুর সম্প্রদায় ছাড়াও অন্যান্য আদিবাসী ও জনজাতির মানুষ অংশ নেন।

সর্বশেষ সমীক্ষা অনুযায়ী গোটা উত্তরবঙ্গে তাঁদের সংখ্যা এখন ৬০০

সনাতনবাবু আরও বলেন যে, তিনি ছোটো থেকেই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বড়ো হয়ে ওঠেন। তাই তাদের সংস্কৃতি জানার আগ্ৰহ থেকেই অসুর সম্প্রদায়ের ওপর কাজ। বিশেষ করে তাদের ভাষার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে। প্রচলিত বিশ্বাস যে তাঁরা মহিষাসুরের বংশধর। কাজ করতে গিয়ে তাঁর দারুণ একটা অভিজ্ঞতা হয়েছে। তাদের সংস্কৃতি, আচার-আচরণ, খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাত্রার পরিচয় এসব কিছু জানতে পেরে দারুণ একটা অনুভুতি হয়েছে তাঁর। এই সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষার হার খুব কম, শতকরা ২ শতাংশ । পুজোর সময় তাদের অনেকে সাধারণত বাড়িতেই থাকেন। তারা মনে করেন এই সময়ে দুর্গা ঠাকুরের মুখ দেখলে তাদের পূর্ব পুরুষদের অসম্মান করা হবে, অকল্যাণ হবে। অসুর সমাজের ভাষা ও সংস্কৃতি লোকসমাজে তুলে ধরা এবং তাদের একটি আইডেন্টিটি তৈরি করে দেওয়ার জন্য তিনি কাজ করে যাবেন বলে সনাতনবাবু জানিয়েছেন। অসুরসম্প্রদায়ের অনেকেই আগে ব্যাঙ খেত। এখন নতুন খাদ্য হিসেবে সংযোজন হয়েছিল শেয়াল। তবে এখন এর কোনোটিই নেই।

কেরন চা বাগানের শ্রমিক প্রকাশ অসুর জানাচ্ছেন, পুরোনো দিনে কী হয়েছে সেদিকে এখন তাদের ধ্যান নেই। তিনি এবছরও বাগানে পুজোর বোনাস পেয়ে তাঁর ছেলেমেয়েকে নতুন জামাকাপড় কিনে দেবেন। কেরন চা বাগানে দুর্গাপুজো হয়। সেখানে তাঁরা সবাই মিলে পুজোর নাচ-গানে মেতে উঠবেন। যদিও অঞ্জলি দেবেন না। মূলত দীপাবলির উৎসবে মেতে উঠতে তাদের ভালো লাগে।

এই সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষার হার শতকরা ২ শতাংশ

পুজোয় এখন তাদের কোনও শোকদিবস হয় না। তবে অষ্টম শ্রেণি উত্তীর্ণ প্রকাশ অসুর চান, অসুর সম্প্রদায়ের প্রধান অনগ্রসরতা শিক্ষা এবং অর্থ সংকট। এখন সরকারও তাদের উন্নতির জন্য বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করছেন। প্রকাশের বাবা বৃদ্ধ, রতিয়া অসুর চা শ্রমিক। প্রকাশ বলেন, তাঁর পড়াশোনার আরও ইচ্ছে থাকলেও টাকার অভাবে পড়তে পারেননি। তবে তিনি তাঁর চার ছেলেমেয়েকে স্কুলে পাঠাচ্ছেন। বড়ো মেয়ে আকৃতি অসুর নাগরাকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী। মেজো মেয়ে প্রীতি অসুর লুকসান হাইস্কুলে অষ্টম শ্রেণি এবং ছোটো মেয়ে সৃষ্টি অসুর সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। ছোটো ছেলে প্রতীক অসুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে।

ছেলেমেয়েরা শিক্ষার আলোয় এলে অসুর সম্প্রদায়ের সব অনগ্রসরতা দূর হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। কেরন চা বাগানের প্রেম লাইনে তাদের বাড়ি। দুর্গাপুজোয় প্রতিমার সামনে এবারও তাঁরা করোনা সচেতনতা মেনেই নাচ-গান করবেন বলে প্রকাশ অসুর জানান। গতবছর তাদের অসুর সম্প্রদায়ের টিম কলকাতায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। অসুর সমাজসেবা সমিতির মাধ্যমেও তাদের অনগ্রসরতা দূর করার কাজ চলছে। কেরন চা বাগানের বাসিন্দা গোপাল সাঁওতাল জানালেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে টিম গঠন করে অসুর সম্প্রদায়ের অনগ্রসরতা দূর করার কাজ করছেন। তাদের চা বাগানের দুর্গাপুজোতে অসুর  সম্প্রদায়ের লোকজন অংশ নিচ্ছেন বেশ কয়েকবছর ধরে। 

অসুর সমাজসেবা সমিতির মাধ্যমে তাঁদের অনগ্রসরতা দূর করার কাজ চলছে 

তবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় অসুর সম্প্রদায়ের আজকের প্রজন্ম তাদের পুরোনো সব রীতিনীতি ভুলতে বসেছে। তাদের অনেকে এখন আদিবাসী বা উত্তরবঙ্গের অন্য জনজাতির সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে পূর্বপুরুষ মহিষাসুরকে নাকি ভুলেই গিয়েছে বলে গবেষক সনাতন বিশ্বাস জানাচ্ছেন।

Developed by DXDasia