পটেশ্বরী পূজিতা হন ৩০০ বছরের প্রাচীন বর্ধমান রাজবাড়ির পুজোয়
বর্ধমান শহর। যে শহরের বুকে আজও আঁকা আছে ইতিহাসের ধ্বনি। একসময় বলা হত কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীদের আবাস এবং কর্মভূমি এই বর্ধমান। বহু খ্যাতিমান ব্যক্তিত্বের জন্ম এই জেলাশহরে। সেই শহরের ইতিহাস কি সহজে বিস্মৃতির অতলে ডুবে যেতে পারে! তবে এই লেখার কেন্দ্রে থাকবে বর্ধমান রাজবাড়ির ইতিহাস। পাশাপাশি থাকবে রাজবাড়ির দুর্গাপুজোর রকম-সকম।
বর্ধমান রাজবাড়ি ছিল শহরের কাঞ্চননগর এলাকায়। সেখানেই থাকতেন রাজ পরিবারের সদস্যরা। দামোদর নদের বিপুল বন্যার কারণে শাসনকাজে ব্যাঘাত ঘটছিল বেশ। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল চারপাশ। মহারাজ তেজচাঁদ ঠিক করলেন শহরের উঁচু জায়গায় রাজবাড়ি তৈরি করবেন। মহারাজের দত্তকপুত্র রাজা মহাতাবচাঁদ সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করলেন এবং ১৮৫১ সালে রাজবাড়ির কাজ সম্পূর্ণ হল।
বর্ধমান রাজবাড়ির পটেশ্বরী
তখন থেকে এটিই রাজ পরিবারের প্রধান হাভেলি। এই রাজবাড়িতেই রাজত্ব করেছেন মহাতাবচাঁদ, আফতাবচাঁদ, বিজয়চাঁদ এবং উদয়চাঁদ। ১৯৫২ সালের ইতিহাস যদি নেড়েঘেঁটে দেখি, তাহলে দেখা যাবে জওহরলাল নেহেরু জমিদারি উচ্ছেদ আইন আনেন। যার ফলে একাধিক রাজতন্ত্র চলে যায় সরকারের হাতে। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৫৩ সালে বর্ধমান ছেড়ে চিরকালের জন্য বেনারস চলে যান মহারাজ উদয়চাঁদ। পরবর্তীকালে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের জন্য তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় রাজবাড়ির এই বিল্ডিংটি চেয়ে চেন। ১৯৫৮ সালে বর্ধমান রাজপরিবার রাজ্য সরকারের হাতে রাজবাড়ি তুলে দেয়। যে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য ছিলেন শ্রদ্ধেয় সুকুমার সেন। ২০০৯ সালে রাজ্য হেরিটেজ কমিশন বর্ধমান রাজবাড়িকে হেরিটেজ বিল্ডিং হিসাবে ঘোষনা করে।
৩০০ বছরের পুরোনো এই রাজবাড়ির দুর্গাপুজো। এখানকার দুর্গাকে বলা হয় পটেশ্বরী। এর পিছনেও রয়েছে সুন্দর এক ইতিহাস। পটে আঁকা দুর্গা। তাই পটেশ্বরী৷ বর্ধমানের মহারাজ মহাতাবচাঁদ এই পুজোর সূচনা করেছিলেন প্রায় ৩০০ বছর আগে। প্রথম দিন থেকেই পটে আরাধনা। দেবী চণ্ডী রয়েছেন ঘরে। তিনিই কুলদেবী। তাই অন্য কোনো নতুন প্রতিমায় পুজো হবে না। বিধান দিলেন রাজপুরোহিত। কিন্তু দুর্গাপুজো? রাজপুরোহিত জানালেন, প্রতিমার বদলে পটে আঁকা দুর্গাপুজোর আয়োজন করা যেতে পারে। সেই বিধান অনুযায়ী বর্ধমানের দাঁইহাট থেকে পটশিল্পী এলেন। শুরু হল দুর্গাপুজো। বর্ধমান জেলার সবচেয়ে প্রাচীন দুর্গাপুজো। সেখানে পটের চালচিত্রে রয়েছে নানান পৌরাণিক কাহিনি।
রাজবাড়ির একাংশ বর্তমানে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি শাখা
রাজ আমলে দুর্গাপুজোয় ৫২ রকমের ভোগ দেওয়া হত। এখন আর সেই ভোগ হয় না। এবার তা কমিয়ে মাত্র তিনে নিয়ে আসা হয়েছে। করোনা আবহে এবার আসতে পারছেন না বর্তমান রাজা-রানি। হালুয়া, পুরি এবং ছোলার ডাল— এই তিন রকমের ভোগ দেওয়া হবে এই বছর। এই বছর বাইরের লোকজনদের তেমন প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। পরিবারের সদস্যরাই নিজেদের মতো করে পুজো সাড়বেন।
ভাবলে অবাক লাগে এই পশ্চিমবঙ্গের আনাচে কানাচে এরকম অজস্র ইতিহাস লুকিয়ে আছে। কত কত রাজবাড়ির ইতিহাস চলে গেছে বিস্মৃতির অতলে। মাটি খুঁড়ে কে বের করবে সেই সাক্ষর? বর্ধমান শহরকে সারা দেশের মানচিত্রে তুলে ধরেছে এই রাজবাড়ি। ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার জন্য সাধারণ মানুষেরও কিছু দায় থাকে বৈকি!
ছবিসূত্রঃ ব্রিটিশ লাইব্রেরি
