
স্মরণে ‘স্মরণ ঘোষাল’ – সত্যজিৎ রায় নির্মিত ‘অপরাজিত’-র কিশোর অপু
সত্যজিৎ রায়ের (Satyajit Ray) কিশোর অপুকে ভোলেনি এ বিশ্ব। কিন্তু ‘অপু’ নামক খ্যাতনামা চরিত্রের আড়ালে চলে গেছে একটা নাম, তিনি স্মরণ ঘোষাল (Smaran Ghoshal)। সত্যজিৎ রায়ের ‘অপরাজিত’ (Aparajito) ছবির কিশোর অপু। রোগা ছিপছিপে চেহারা, পাতলা গোঁফের রেখা আর মুখে অমলিন হাসি – ‘পথের পাঁচালি’-র শিশু অপু সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর বাংলা চলচ্চিত্র আবার ফিরে পেয়েছিল তাঁদের সাধের অপুকে, স্মরণ ঘোষালের মাধ্যমে। এমন দৃপ্ত চাহনি তাঁর, সংলাপ বলার যে মাধুর্য, মা সর্বজয়ার সঙ্গে বন্ধুত্বের টানাপড়েন কী অসম্ভবভাবে ধরা পড়েছিল – আফসোস, ‘অপরাজিত’-র পর সত্যজিতের ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ (Rabindranath Tagore) তথ্যচিত্রে কিশোর রবির ভূমিকায় অভিনয় ছাড়া আর কোনো কাজ করলেন না চলচ্চিত্রে। বরং আজীবন অন্য আরেকটি পরিচয়েও বাঁচলেন।
স্মরণ ঘোষালের বয়স তখন ১৪, সত্যজিৎ রায়ের ‘অপরাজিত’ ছবিতে কিশোর অপুর চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ এল। সেই প্রথম ক্যামেরার মুখোমুখি হন স্মরণ। ‘অপুর সংসার’ (The World of Apu)-এর অপু সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (Soumitra Chatterjee) তাঁর প্রসঙ্গে বলেছেন, “অপরাজিত নির্মাণের সময় একবার বা দু-বার স্মরণ ঘোষালের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। সেই ছবিতে তিনি একজন স্থায়ী অভিনেতার ছাপ রেখেছিলেন। ঠিক যেন বিভূতিভূষণের অপু। বহু বছর পর তাঁর মামা, শিল্পী চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্যকে নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে আমার আবার দেখা হয়।”

বাবা মারা যাওয়ার পর অপু
‘অপরাজিত’ ছবির সহকারী চিত্রগ্রাহক সৌমেন্দু রায় (Soumendu Roy) এক সাক্ষাৎকারে স্মরণ ঘোষাল প্রসঙ্গে বলেছিলেন, “পরিশীলিত পরিবার থেকে সিনেমায় কাজ করতে এসেছিলেন স্মরণ। অপুর সরল-বিনয়ী স্বভাব তিনি আত্মস্থ করতে পেরেছিলেন। সেই স্বতস্ফূর্ততার ছাপ অপু চরিত্রকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছিল।”
সত্যজিৎ রায়ের ‘অপরাজিত’ ছবির কিশোর অপু। রোগা ছিপছিপে চেহারা, পাতলা গোঁফের রেখা আর মুখে অমলিন হাসি – ‘পথের পাঁচালি’-র শিশু অপু সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর বাংলা চলচ্চিত্র আবার ফিরে পেয়েছিল তাঁদের সাধের অপুকে, স্মরণ ঘোষালের মাধ্যমে।
কলকাতার (Kolkata) এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম স্মরণ ঘোষালের। তাঁর মামা ছিলেন বিখ্যাত চিত্রকর চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্য এবং খুড়তুতো দাদা ছিলেন চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনকারী শহিদ জীবন ঘোষাল। চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পাট চুকিয়ে স্মরণবাবু জীবিকা হিসাবে বেছে নেন পর্যটনের ব্যবসা। দশ নম্বর মেহের আলি রোডের নিজগৃহ থেকেই তিনি এই ব্যবসা চালাতেন। পেশাসূত্রে ছিলেন পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী কর্মী। শোনা যায়, দক্ষিণ কলকাতা রাইফেল ক্লাবে রাইফেল শুটিং-এর উল্লেখযোগ্য পৃষ্ঠপোষকও ছিলেন। ১০ জুলাই ২০০৮ সালে মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৪ বছর।

শহরে যাওয়ার পর অপু
‘অপরাজিত’ ছবি জুড়ে রয়েছে বাংলার গ্রাম, শহর কলকাতার অলি-গলি আর কাশীর ভুবন। এই সমস্তকিছুর মধ্যে মিশে যায় চঞ্চল অপুর মন-মানসিকতা। ছবিতে প্রথম দৃশ্যটি আজও চিরন্তন হয়ে আছে। নিশ্চিন্দিপুর ছেড়ে সর্বজয়া, হরিহর, অপু চলেছে কাশীর উদ্দেশ্যে। ট্রেনের জানলা দিয়ে ছুটে চলেছে নদী, তেপান্তর, ব্রিজ। অকস্মাৎ কাশীর গঙ্গার ধারে মানুষের জীবনযাত্রা।
কখনও সদ্য হাতে পাওয়া গ্লোব সর্বজয়াকে দেখায় অপু, চেনাতে থাকে দেশ-কলকাতার বিন্দু রেখা। সর্বজয়া (করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়) বুঝতে পারে না কিছুই। সেখানেই প্রথম সর্বজয়ার পৃথিবী থেকে অপুর পৃথিবী বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে। অপু শহরে চলে যাবার পর সর্বজয়ার মুখে সমস্ত হাসি বিলীন হয়ে যায়। মা-ছেলের সম্পর্কে শুরু হয় টানাপড়েন। অপুর ভুবন বড়ো হতে থাকে। শহর থেকে অপু ফিরলে কলকাতার গল্প শুনতে চান সর্বজয়া, কিন্তু অপুর আগ্রহ ক্রমশ কমতে থাকে। মায়ের মৃত্যুর পর হয়তো দ্বিতীয়বারের জন্য অপু একা হয়ে যায় (প্রথম একা হয়েছিল দুর্গার মৃত্যুর পর)। তার চারপাশের পরিস্থিতিও পাল্টে যেতে থাকে। এখানেই কিশোর অপুর ভূমিকা শেষ।

শহর থেকে ফিরে মা সর্বজয়ার সঙ্গে অপু
সত্যজিৎ রায় চিত্রনাট্য অনুযায়ী একজন সঠিক অপুকে খুঁজে পেয়েছিলেন। প্রতিটি অভিব্যক্তিতে সেই অপু পূর্ণ। শুধু আক্ষেপ, স্মরণ ঘোষালকে নিয়ে আর তেমন আলোচনা হয় না। ‘অপরাজিত’ নামক ট্রেন্ডিং-এর ভিড়ে খানিক আড়ালে চলে গেলেন পিনাকী সেনগুপ্ত, স্মরণ ঘোষালরা। শোনা যায়, ‘পথের পাঁচালি’ (Pather Panchali)-র মতো তুমুল সাফল্য ‘অপরাজিত’ পায়নি। কিন্তু নিউইয়র্কে এই ছবি টানা আট সপ্তাহ চলেছিল। পাশাপাশি কান চলচ্চিত্র উৎসবে মনোনীত হয়েছিল এই ছবি, ভেনিসে দুটি পুরস্কারও পেয়েছিল। আন্তর্জাতিক মানের ছবিতে স্মরণ ঘোষালের মতো আন্তর্জাতিক মাপের শিল্পীরা বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে থেকে যাবেন আজীবন। যতদিন অপুদের রেলগাড়ি কু-ঝিকঝিক করে কাশবনের ভিতর দিয়ে ছুটে যাবে, আমাদেরও কি ইচ্ছা হবে না এই ‘লার্জার দ্যান লাইফ’-এর সঙ্গী হতে! স্মরণ ঘোষাল নিঃসন্দেহে একজন জাতশিল্পী।

সত্যজিৎ রায়ের রবীন্দ্রনাথ তথ্যচিত্রে কিশোর রবির ভূমিকায়
তথ্যসূত্রঃ
সত্যজিতের অপরাজিত : মা ছেলের সম্পর্কের অনন্য আখ্যান – Roar Media
এবং
দ্য টেলিগ্রাফ
