তাঁর শিক্ষা, ব্যাপ্তি আমাদের সংস্কৃতির বুনিয়াদকে মজবুত করে রেখেছিল
সংস্কৃতি জগতের প্রতিটি খিলানে তাঁর সংস্কৃতি মনস্কতার নানা নিদর্শন স্বর্ণাক্ষরে খচিত। সাহিত্য চর্চা, সে কবিতাই হোক, নাটকই হোক, প্রবন্ধই হোক, আবৃত্তি, নাটক পরিচালনা, মঞ্চাভিনয়, চিত্রাঙ্কন এবং চলচ্চিত্রে অভিনয়, প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে স্বমহিমায় সৌমিত্রদা চিরকাল বিরাজমান। একথা ঠিক যে সাধারণ মানুষ সৌমিত্রদাকে শুধুমাত্র অভিনেতা হিসাবেই মনে রাখবেন। তাও যদি হয়, সেখানেও কিন্তু প্রত্যেকটি ভূমিকা পালনে, তাঁর মননশীলতার প্রতিফলন স্পষ্ট। যে মননশীলতার মূল উৎস তাঁর জীবনবোধ। এবং ওই বোধ সঞ্চারিত হয়েছে তাঁর সংস্কৃতি চর্চার নিরলস প্রয়াস থেকে। ‘অপরাজিত’ ছবিতে যদিও বা বয়সের জন্য তিনি নির্বাচিত হননি। কিন্তু ওঁর সুদর্শন চেহারাটা সত্যজিৎ রায় মনে রেখেছিলেন। সেইজন্যেই ‘অপুর সংসার’ থেকেই তাঁর অভিনয় অভিযান শুরু।
আমার সঙ্গে সৌমিত্রদার আলাপ আশি সালের মাঝামাঝি। অ্যাডমেকার্স সাউন্ড রেকর্ডিং স্টুডিও ছিল আমার বিজ্ঞাপন এজেন্সির অফিসের ঠিক নিচে শেক্সপিয়ার সরণিতে। সেখানে অ্যাডমেকার্সের কর্ণধার অরূপ গুহঠাকুরতার কাছে সৌমিত্রদা এসেছিলেন কোনো একটা কাজে৷ আমি তখন ওই স্টুডিওতে এইচএমভি সংগীতাঞ্জলির রেডিও অনুষ্ঠানের রেকর্ডিং করছিলাম। প্রথম আলাপেই অনেক কথা হল। অনায়াস আলাপচারিতার ক্ষমতা, বাংলা ভাষার উপর প্রশংসনীয় দখল এবং চেতনার রঙে এক বর্ণময় মনন এইসবেরই পরিচয় পেলাম ওই ছোট্ট আড্ডায়। আমি উত্তম ভক্ত হয়েও সৌমিত্র অনুরাগী হয়ে উঠলাম। এক আন্তরিক শ্রদ্ধা তৈরি হল সৌমিত্রদার প্রতি।
এরপর ‘আস্থা’ ধারাবাহিকে আমি স্ক্রিপ্ট লিখতাম। সেই সময় থেকে অন্তরঙ্গতা বাড়তে শুরু করল। এরপর বেশ কয়েকটি ছবিতে আমার ওঁর সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করার সৌভাগ্য হয়েছিল। একদিন সাহস করেই জিজ্ঞাসা করলাম, “সৌমিত্রদা, উত্তমকুমার সম্পর্কে আপনার কী ধারণা?” সেদিন উত্তরে যা বলেছিলেন তাতে সৌমিত্রদার প্রতি শ্রদ্ধা আরও দ্বিগুণ বৃদ্ধি হয়।
শ্যুটিং চলাকালীন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, আমি এবং অনসূয়া মজুমদার
“‘যদি জানতেম’ ছবিতে একদিন শ্যুটিং হচ্ছে। উত্তমদা জিজ্ঞাসা করলেন, শ্যুটিং-এর পর আমি কী করছি। আমি বললাম, তেমন কিছু না। উত্তমদা বললেন, তাহলে আজ আড্ডা দেব। সেদিনের শেষ শট। একটা র-ফলা বা ঋ-ফলা দেওয়া সংলাপ উত্তমদা বারবার এনজি করছেন। আমি বললাম, চিত্রনাট্যকার তো আছেন। বলুন না সংলাপটা বদলে দেবেন। উনি রাজি হলেন না। হঠাৎ আমাকে বললেন, পুলু তুই একটু বাইরে যা। আমি তো অবাক! আমাকে বাইরে যেতে বলছেন কেন! অগত্যা আমি বাইরে গেলাম। খানিকক্ষণ পর বাইরে এসে উত্তমদা আমার থেকে একটা সিগারেট চাইলেন। আমি জানতে চাইলাম, উনি আমায় কেন ফ্লোর থেকে বাইরে বার করে দিলেন। উত্তমদা বললেন, তোর উচ্চারণটা তো পরিষ্কার। তাই একটু সেল্ফ-কনশাস হয়ে যাচ্ছিলাম। ওই থেকে বুঝে নাও কী বিনম্রতা ছিল মানুষটার।”
বিনম্রতাকে স্বীকৃতি দেবার জন্যও তো বিনম্রতা প্রয়োজন। আমি তমাল রায় চৌধুরীর নির্দেশনায় ‘অস্তমুখী চাঁদ’ নাটকের মহড়া দিচ্ছিলাম। হঠাৎ বাড়ি থেকে আমার স্ত্রী ফোন করেন। বলেন তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে আসতে। কেন সেই কারণটা বললেন না। হঠাৎ এরকম জরুরি তলব? খুবই চিন্তাগ্রস্ত হয়ে আমি রিহার্সাল থেকে ছুটি নিয়ে দিশেহারার মতো গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফিরলাম। চারতলা সিঁড়ি বেয়ে (কারণ আমার বাড়িতে লিফট নেই) প্রায় দৌড়ে এসে কলিংবেল বাজালাম হাঁপাতে হাঁপাতে। রুমা (আমার স্ত্রী) দরজা খুলতেই দেখি বাইরের ঘরে সৌমিত্রদা বসে, সঙ্গে দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়। বললেন, “চলে এলাম৷ এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম দ্বিজেনের সঙ্গে। তো দ্বিজেন বলল এটা বিপ্লবের বাড়ি। ওকে বললাম বিপ্লব অনেকবার যেতে বলেছে। চলো দেখি আছে কীনা!” তার জন্য আমার স্ত্রী খুব ডেসপারেটলি ফোন করে কেন আসতে বললেন?
সৌমিত্রদা হেসে বললেন, “ওর কী দোষ বলো! দরজা খুলে দেখছে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় দাঁড়িয়ে। চমকে তো যাবেই”। তখন বাজে রাত ১০টা। সেদিন রাত পৌনে একটা অবধি আড্ডা হয়েছিল। এই প্রায় তিন ঘণ্টা প্রত্যেকটা মুহূর্তে সমৃদ্ধ হয়েছিলাম। শিশির ভাদুড়ির সান্নিধ্যে নিজের অভিনয়শৈলীকে উন্নত করা, অভিনয়ের ধারা নিয়ে এই আড্ডাতেই সৌমিত্রদার ধারণা স্পষ্ট পেলাম। এটা স্পষ্ট হল যে শিশির ভাদুড়ির অভিনয় ধারাই ওঁর অভিনয় ধারা। সেই ধারাই তিনি চিরকাল বহন করেছেন। থিয়েটারের প্রতি তাঁর অমোঘ আকর্ষণ। যেকারণে বাণিজ্যিক থিয়েটার এবং অ্যাকাডেমিক থিয়েটার, এই দুই জায়গাতেই সৌমিত্রদা অনায়াসে স্বচ্ছন্দে নিজের জায়গাটা স্বমহিমায় করে নিয়েছেন।
‘নামজীবন’, ‘রাজকুমার’, ‘ফেরা’ — বাগবাজার থিয়েটারে সার্থক মঞ্চ প্রযোজনা ওঁর লেখায়, নির্দেশনায় এবং অভিনয়ে। তেমনি ‘প্রাণ তপস্যা’, ‘হোমাপাখি’-ও পরবর্তী যুগে সমান্তরাল থিয়েটারে সম্মানের সঙ্গে জায়গা করে নিয়েছেন। সেদিনকার আড্ডায় যেটা স্পষ্টভাবে বেরিয়ে এল, তা হল সৌমিত্রদার অফুরন্ত প্রাণশক্তি। যে শক্তির জোরেই বয়সকে উপেক্ষা করে উনি একটার পর একটা কাজ করে গেছেন। চলচ্চিত্র তো বটেই, এমনকি মঞ্চেও। যার উজ্জ্বল নিদর্শন ওঁর অভিনীত ‘রাজা লিয়ার’। যাঁরা দেখেছেন তাঁরা জানেন, এই পরিণত বয়সে এটা ওঁর অন্যতম সেরা কাজ। এরপর ফ্রিডরিখ ডুরেনমার্ট-এর লেখা ‘দ্য ভিজিট’-এর রূপান্তর ‘ফেরা’ আবার মঞ্চস্থ করলেন। বোধহয় নাট্যকার ডুরেনমার্ট, ইনগ্রিড বার্গম্যান এবং অ্যান্টনি কুইনের প্রতি সেটা ছিল সৌমিত্রদার সেরা অর্ঘ্য।
এরপর আমার আরও একবার সুযোগ হয়েছিল বেশ কিছুদিন ধরে ওঁর সান্নিধ্যে থাকা। নবনালন্দা গল্পগুচ্ছ অডিও অ্যালবাম প্রযোজনা করে। রবীন্দ্রনাথের আটটি গল্প আমি নাট্যরূপ দিই এবং পরিচালনা করি৷ গল্প বলেন সৌমিত্রদা। রেকর্ডিং স্টুডিওতে সৌমিত্রদাকে আনার পথে আড্ডা, রেকর্ডিং-এর অবসরে আড্ডা। কত ছোটো ছোটো স্মৃতি রোমন্থন করলেন সৌমিত্রদা।
চা খেতে খেতে সৌমিত্রদা বললেন যে, ওঁর বিয়ের পর তিনজন বম্বে দেখানোর জন্য ঝাঁপিয়ে পড়লেন। কিশোর কুমার, অভি ভট্টাচার্য এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সৌমিত্রদা এবং ওঁর স্ত্রী দীপাকে একটা মিউজিয়াম দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে বেরিয়ে রাস্তায় ওঁরা ফুচকা খাচ্ছিলেন। তখন সকাল সাড়ে এগারোটা হবে। সৌমিত্রদার স্ত্রী দীপা হেমন্তদার কাছে জানতে চাইলেন, হেমন্তদার প্রথম গান কি ‘নিখিল যে লিপিখানি’? হেমন্তদা বললেন, না। ‘জানিতে যদি গো তুমি পাষাণে কী ব্যথা আছে’। তারপর পুরো গানটা বম্বে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় গাইলেন। সৌমিত্রদা বললেন, “ভাবা যায়! হেমন্ত মুখোপাধ্যায় দিনের বেলা বম্বের ব্যস্ত রাস্তায় উদাত্ত কণ্ঠে গান গাইছেন!”
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে
স্মৃতির অলিতে-গলিতে এরকম অনেক অভিজ্ঞতা জমা হয়ে আছে৷ যার বেশ কিছুটা অনায়াসে বেরিয়ে এল মনের মণিকোঠা থেকে৷ আমার পরম সৌভাগ্য যে, সৌমিত্রদার মতো এমন প্রবাদপ্রতিম সৃজনশীল মানুষ আমার আবৃত্তি ও গল্পপাঠের অ্যালবাম ‘বন্ধ কোরো না পাখা’র সূচনা করেছিলেন। এবং সেখানেও উনি বলেছিলেন কেন এই কাজটা করলেন। ওঁর মনে হয়েছে আমি বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে এরকম একটি প্রয়াস নিয়েছি। অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সৌমিত্রদা বলেছিলেন, আমার এরকম প্রয়াসে উনি সবসময় আছেন। এবং যারাই এই বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো পরিকল্পনা করবেন, তার রূপায়ণে সৌমিত্রদার সাহচর্য সবসময় পাওয়া যাবে।
তাঁর মতো এরকম সমৃদ্ধ মনন সুস্থ সংস্কৃতির মজবুত খিলান। এমন সৃজনশীল বিদ্বজ্জন, যাঁর শিক্ষা, ব্যাপ্তি আমাদের সংস্কৃতির বুনিয়াদকে মজবুত করে রেখেছিল। ভয় হয়, তাঁর এই প্রয়াণে আমাদের সংস্কৃতির স্তম্ভ স্তম্ভিত হয়ে অবক্ষয় আক্রান্ত হয়ে ধ্বংস না হয়ে যায়। কারণ সৌমিত্রদা-ই বোধহয় আমাদের সংস্কৃতির শেষ স্তম্ভ।
