পুনর্জন্মে বিশ্বাস করতেন না ঋতুপর্ণ, জীবনটা বেছে নিয়েছিলেন ইচ্ছামতো

ঋতুপর্ণ তাঁর সিনেমাগুলোকে ‘উইমেনিস্ট’ বলতেন, ‘ফেমিনিস্ট’ না

খুব চেনা একটা গল্প বলি। কাকভেজা বৃষ্টির দুপুর। চেনা গলার একটা ফোন, “ঋতুপর্ণ ঘোষ মারা গেলেন”। দিনটা ছিল ২০১৩ সালের ৩০ মে। একা একটা ছেলে লিটল ম্যাগাজিনের যাবতীয় ‘ঋতুপর্ণ’ বিষয়ক লেখাপত্তর নিয়ে প্রেসে যাচ্ছে। এমন সময়েই ফোনটা আসতে হল? ট্রেনের জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে দূরের মাদল, হালকা ঝড় আসছে মনে হচ্ছে। বৃষ্টির ছাট একটু একটু করে গায়ে লাগছে। একটা ছেলে ঋতুপর্ণকে কোলে করে কলকাতা যাচ্ছে। ৩০ মে প্রিয় কোনো এক বন্ধুর জন্মদিনও বটে। সকালেই তাকে মেসেজে ভালোবাসা জানিয়েছে। আবার মেসেজ করে জানালো, ঋতুপর্ণ নেই। একটা তারিখ এমনভাবেই অমোঘ হয়ে ওঠে। ঋতুপর্ণ এতিম করে দিয়ে পালাচ্ছেন দুই বন্ধুর থেকে। এই ত্রিকোণস্তরীয় সম্পর্কে জমাট বাঁধছে সিনেমা শেষের উল্লাস। ঋতুপর্ণর যাত্রা শুভ হোক, আর যে ছেলেটা একা একটা ট্রেনে বসে তার যাত্রাও শুভ হোক।

ঋতু শব্দটা এলেই কেমন যেন পরিবর্তন শব্দটাও মাথায় ঘুরপাক খায়। ছোটোবেলায় মা বলত, এক ঋতু আসে, আরেক ঋতু যায়। ঋতুদের স্বভাবটাই আসলে এরকম। শুনে ভারি অবাক লেগেছিল। যেন কোনো স্থিরতা নেই। মানুষের মতোই। ঋতুপর্ণ ঘোষের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে হাজার হাজার সমালোচনা, তর্ক-বিতর্ক, ভালোবাসা-ঘৃণা-প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির চেনা অচেনা গল্প। বাংলা চলচ্চিত্রে যাঁর পদচারণা বীরের মতো। একটা দমকা হাওয়ার মতোই হঠাৎ একদিন এসে পড়েছিলেন। আর তখন থেকেই প্রত্যেকে ভাবতে শুরু করেছিলেন, ঋতুপর্ণকে মানিয়ে নেওয়া বেশ শক্ত। কারণ তিনি স্রোতের বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে হালকা হাসেন শুধু, শান্ত চোখে পাখি ওড়া দেখেন আর ভালোবাসেন ব্রত-উপচারের কথা শুনতে। চেনার মোড়কে অচেনা একটা ছেলে।একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে কৌস্তভ বক্সী এবং গৌতম ভট্টাচার্যকে দেওয়া দু’টি আলাদা আলাদা সাক্ষাৎকারে নিজেকে অন্যরকমভাবে মেলে ধরেছিলেন ঋতুপর্ণ। সেই সাক্ষাৎকার দু’টির কয়েকটা কথা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে এই সময়ের জন্য। ঋতুপর্ণর অসংখ্য সাক্ষাৎকারগুলির মধ্যে যে দু’টো তাই এখনও সমানভাবে জ্বলজ্বল করে। আর আজ কোনো লেখক, সমালোচক কথা বলবেন না, একমাত্র তিনিই কথা বলবেন।

•    আমি ১৯ তারিখটি বেছে নিয়েছিলাম একেবারেই ভিন্ন একটি কারণে। দেখুন, ক্যালেন্ডার এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকা পালন করেছে। আমার একটা তারিখের দরকার ছিল, এমন একটা সংখ্যার কথা ভাবছিলাম পরদিন যেটার দু’টো অংকই বদলে যাবে, একদম নতুন একটি দিন শুরু হবে। ১৯ তারিখের শেষে আসবে ২০ তারিখ, সংখ্যাটা পুরোপুরি বদলে যাবে। বদলে যাবে চরিত্রগুলোর জীবনও। নতুন দিনের শুরুর সাথেই গল্পের শেষের সংযোগ ঘটাতে চেয়েছিলাম আমি। আর এপ্রিল মাসটা বেছে নেওয়া একেবারেই ভিন্ন কারণে। এপ্রিলের সন্ধ্যার দিকে প্রায় সময় কালবৈশাখী ঝড় ওঠে। ঝড়-বৃষ্টির ঐ দৃশ্যটা আমার খুব দরকার ছিল। এ কারণেই অমন একটি শিরোনাম বেছে নিয়েছিলাম আমি। (উনিশে এপ্রিল প্রসঙ্গে)

•    কিরণ খেরকে বলেছিলাম বনলতার বয়স বাড়ছে আর তার সাথে শরীরের প্রতিটি জোড়ায় ব্যথাও বাড়ছে। কাজেই বসা অবস্থা থেকে হঠাৎ করে উঠে দাঁড়ানোটা তার জন্য কষ্টকর, সেই অভিব্যক্তিটা এভাবে বোঝাতে হবে। (বাড়িওয়ালি প্রসঙ্গে)

•    পিতৃতান্ত্রিক সমাজে বসে একেবারেই উল্টো ধারায় গিয়ে নারীবাদ নিয়ে কাজ করাটা খুব কষ্টকর। আমি তাই সিনেমাগুলোকে ‘উইমেনিস্ট’ বলে ডাকি, ‘ফেমিনিস্ট’ না।

•    আমার সাজ পোশাকটাই যদি আমার এক্সিসটেন্স হয়, আমার আমিটা হয়, তা হলে একটু মুশকিল। আমার বরাবরই মনে হয়েছে, আমার সাজপোশাক যাই করি না, একটাই তো জীবন। আমি পুনর্জন্মে বিশ্বাস করি না। আমার যেভাবে জীবনটাকে সেলিব্রেট করতে ইচ্ছে হয় করি। আবার যখন ইচ্ছে হয় করি না।

•    যাদের মধ্যে একটু কমনীয়, নারীসুলভ ব্যাপার আছে তারা সবাই ‘গে’। এটা কিন্তু একটা অ্যাসাম্পশন। কেউ বলে দেয়নি যে, ও ‘গে’। একটা ব্যবহার হঠাৎ করে সেক্সুয়ালিটির মার্কার হয়ে গেল। আমি অনেকবার বলেছি, ‘লেডিজ’ বলছ কেন? প্লুরাল কোরো না। ‘লেডি’ বলো। এইভাবে আমি কমব্যাট করতাম ওটার সঙ্গে। তারপরে শহর একটা ফেজ পেল। সেই ফেজটার নাম ঋতুপর্ণ। আমার কিন্তু সেটার জন্য আলাদা করে অপমানিত লাগে না। আমি কিছু কথা বলেছি, যেগুলো আমাদের দেশের যৌনতা বিচারের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে কতগুলো স্টেটমেন্ট।

•    দর্শকরা আমার ব্যাপারে খুব প্রোটেকটিভ। তারা আমাকে খুব ভালোবাসে। কিন্তু দে কান্ট ডিল উইথ মি অলসো।

•    আমি কিন্তু কেবল টালিগঞ্জের প্রত্যাশা পূরণের জন্য ছবি করি না। আমার যে ছবিটা করতে ভালো লাগে না বা যে ছবিটা করতে গিয়ে আমার নতুন কিছু শেখা হবে না, জানা হবে না, আমার মধ্যে যে ফিলটা আছে সেটা দিয়েই একটা ছবি করে ফেলব, সে ছবি আমি আর করব না।•    বিশ্ব সিনেমার ইতিহাসে যদি ৫০০ জন পরিচালকের নাম লেখা হয়, তাতে আমি আসব না। তা হলে কেন আমি আমার যা ইচ্ছে তাই করব না। তা হলে আমি কেন ঝুঁকি নেব না।

•    আমরা ইচ্ছেকে এক জায়গায় পৌঁছিয়ে বলি, এখানে থেমে যাও। কিন্তু আমরা যদি ইচ্ছের সঙ্গে হাঁটতে পারতাম। সেই জার্নিটা আরও মনোরম হত।

এটাই ঋতুপর্ণ। ভাঙাগড়ার ঋতুপর্ণ। আকাশ মেঘলা, যদিও শহরে আজ বৃষ্টি হবে কিনা জানা নেই। তাঁর লাইন ধার করেই স্বীকার করতে হয়, “সেই বুকের থেকে টুপ্‌ টুপ্‌ টুপ্‌ নীল কুয়াশা ঝরে/ আর মনখারাপের খবর আসে আকাশে মেঘ করে/ সারা আকাশ জুড়ে।”

শহরে ঋতুপর্ণরা ভিড় করে। আর এইভাবে ভিড়ে মিশে গিয়ে কোনো একদিন কারোর ঠোঁট থেকে উজ্জ্বল লাল লিপস্টিক উঁকি মারবে ঠিক। ইচ্ছেমতো বাঁচার হাসি লেগে থাকবে মুখে। সেদিন কেউ কাউকে সন্দেহ করবে না। 

Developed by DXDasia