
‘ফার্স্ট পার্সন’ যেন কোনো সম্পাদকীয় নয়, গোপন চিঠি
বর্ষা এলেই তোমায় মনে পড়ে। অথচ তোমার সঙ্গে আমার কোনো স্মৃতি নেই। জানালার শার্সি আঁকড়ে থাকা সামান্য বৃষ্টির ফোঁটা দেখে তবু মনে হয় যেন তুমি আছো— তোমায় দেখতে পাচ্ছি না— যেন তুমি কোথায় কোন পাহাড়ে ছুটি কাটাতে গেছ এই বাদলায়— বর্ষা শেষ হলেই ঠিক ফিরে আসবে। এমন অতি সামান্য অজুহাতে তোমায় বারেবারে মনে করি। স্মৃতিরোমন্থন তো একপ্রকার অভ্যাসই, তাই না? অনভ্যাসে বিস্মৃতির মরিচা পড়ে সমস্ত স্মৃতিরা সেপিয়া হয়ে— হাত ছোটা ঘুড়ির মতো, সুগন্ধের মতো, ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে যায়।
কলকাতা শহরের কোনও এক কালো রাস্তায় চলন্ত হলুদ ট্যাক্সির রেডিও গেয়ে ওঠে, “মেঘ পিওনের ব্যাগের ভিতর…” তোমার কথা মনে হলেই কোথা থেকে যেন বেলফুলের গন্ধ ভেসে আসে। এতগুলো বছর হল— তুমি সুগন্ধের মতো বাতাসে মিলিয়ে গেছ।
আরও পড়ুন: শনিবারের কড়চা : ঋতুপর্ণ ঘোষ সংখ্যা
“কিসি মওসম কা ঝোঁকা থা জো, ইস দিওয়ার পর লটকি হুয়ি তসবির তিরছি কর গয়ি হ্যায়ঁ…”

বিষাদ যারা চিনিয়েছিল, তুমি তাঁদের একজন। টিভিতে “শুভ মহরৎ” দেখানো শেষ হয়েছে সবে, কালো পর্দায় সারি সারি কলাকুশলীদের নাম উঠে যাচ্ছে নীচ থেকে উপরে, আর ভেসে আসছে “অল্ড ল্যাং সাইন”-এর সুর। ঠিক তখনই তুমি অদেখা এক প্রজাপতি জাল দিয়ে আমার আত্মাটা ছিনতাই করে নিয়েছিলে। ২০০৩-৪ সাল, কতই বা বয়স তখন আমাদের। বয়ঃসন্ধি। রাতের বেলা ঘুমের আগে কান্না পাওয়ার শুরু। টিভিপর্দা ঝেঁপে বৃষ্টি এল ঠিক পরের বছর “রেইনকোট” সিনেমায়। গান গাইলেন শুভা মুদগাল, “আপনে নয়নসে নীর বহাভে/ আপনি যমুনা খুদ আপ হি বনাভে/ লাখ বার উসমে হি নহাভে/ পুরা না হোয়ি আস্নান…”
তুমি যেন এমন এক বই, যা খানিকটা পড়ে উঠে চলে এসেছি কোনো কাজের তাড়ায়— আর ফেরা হয়নি। অথবা তুমি যেন রাতদিন গুনগুন করে ফেরা এক গান— যার কথা আর মনে তো নেই! অথবা তুমি যেন এক ছোটোগল্প…
যার শেষ বলে কিছুই হয় না।
“কেউ বেসেছিল ভালো/ কেউ খুঁজেছিল আলো/ কেউ আলো খুঁজে পায়নি বলেই/ হয়তো নিরুদ্দেশ”
তখন তোমার একমাথা বর্ষার মেঘের মতো কালো চুল, চোখে পাতলা ফ্রেমের চশমা— রোদ না পড়লে তেমন ঝলসে ওঠো না। ১৯৯২। “হীরের আংটি” বানালে। আজও বুঝিনা, কেন ছোটোদের সিনেমা দিয়ে শুরু করার এমন দুঃসাহস দেখিয়েছিলে! যখন তোমার মাথার উপর এমন আঁধার করা সত্যজিতের ছায়া? ছবিটা প্রকাশ পেল না, সেবছরই চলে গেলেন সত্যজিৎ। দ্বিতীয় ছবি “উনিশে এপ্রিল” এনে দিল জাতীয় সম্মান, দুবছর পর। “হীরের আংটি”র কৌমার্য সত্যজিতের উচ্চমধ্যবিত্ত মতাদর্শ ও আভিজাত্যকে মনে করায়। কিন্তু এই তুমি তো আসল তুমি নও। “উনিশে এপ্রিল”-এর তুমি অনেক স্পষ্ট, যেন হাতের মুঠোয় বন্দি করে রাখা জোনাকি— জ্বলছ আর নিভছ। “অদিতি”- “সরোজিনী”র গলিঘুঁজিতে তুমি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছ, এটা বুঝতে ভুল হয় না কারো। তুমি অনেকখানি “মেয়ে-মানুষ” চিনিয়েছ, যেভাবে রাতেরবেলা ছাদে দাঁড়িয়ে বাবারা তারা চেনায়, ঠিক সেভাবে— অন্তরঙ্গে। কে ভেবেছিল বাড়িওয়ালি বনলতাকে পর্দায় আনা যায়? অথবা উচিত? তুমি বেআব্রু করে দিলে। হাট করে খুলে রাখা দরজা দিয়ে মেয়েদের অন্দরমহল উছলিয়ে এল একের পর এক। “অন্তরমহল”, “চোখের বালি”, “উৎসব”, “সব চরিত্র কাল্পনিক”, “দোসর”, “তিতলি”, “আবহমান”, “চিত্রাঙ্গদা” এবং আরো আরো কত! এত নারী! এত মেয়েমুখের সারি! পাশাপাশি প্রসেনজিৎ, চিরঞ্জিৎ প্রমুখ প্রবীন অভিনেতাদের খোলস ছাড়িয়ে বের করে আনছ। যিশু সেনগুপ্ত, রাইমা সেন প্রমুখ নতুন অভিনেতাদের কাগজের আল্পনার মতো সযত্নে চৌকস করে তুলছ। আসছে একের পর এক পুরস্কার।

এবং তুমিও বদলে যাচ্ছো। অনেক অনেক বদলাচ্ছ। এখন তুমি পোশাক পরো লম্বা ঝুলের, মাথায় কখনওবা থাকে উষ্ণীষ— অনেকটা রবিঠাকুরের মতো। সে পোশাকেরও নারী বা পুরুষ হয়ে ওঠার কোনো তাড়া নেই। সে একদম তোমার মতো। স্বতন্ত্র। এখন তুমি অন্ধকারেও ঝলসাও। এখন মানুষেরা তোমায় নিয়ে প্রশ্ন করে। নিজেকে ক্রমাগত প্রশ্ন করে যাওয়া মানুষগুলোর চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে তোমায় টিভিপর্দায় দেখে। খবরের কাগজে প্রকাশিত তোমার ছবি, বক্তব্য কাঁচি দিয়ে কেটে কেটে জমিয়ে রাখে “মেয়েলি” ছেলেটা বা “মদ্দাটে” মেয়েটি। ঠোঁটের কোণে তাদের হাসির রেখা দেখা যায়— যেন যুদ্ধটা জিতে ফেলা গেছে।
“ক্যায়সি আজিব দাওয়াত হ্যায়ঁ ইয়েহ/ ম্যায়ঁ বিন বুলায়ি মেহমান/ ঘরওয়ালা কাহাঁ লাপতা/ সব ছোড়কে সুনসান/ ক্যায়সি আজিব দাওয়াত হ্যায়ঁ ইয়েহ…”

রাস্তায় “চিত্রাঙ্গদা”-র আস্ত পোস্টার দেখতে পেতাম না। সব পোস্টারই কারা যেন মাঝখান থেকে ফালাফালা করে দিয়ে গেছে। কষ্ট হত তখনও? রবিবার সকালে বিছানা ছেড়ে উঠেই “ফার্স্ট পার্সন” পড়ি, মনে হয় সম্পাদকীয় নয় চিঠি লিখেছ আমায়— গোপন চিঠি। তোমার মা চলে গেছেন জানতে পারলাম। ইচ্ছে হল তোমার কাঁধে হাত রাখি।
২০১২-১৩-তে যেন মনে প্রাণে রবীন্দ্রনাথকে আঁকড়ে ধরতে চাইছিলে। আশ্রয় প্রয়োজন হয়েছিল? হেঁশেলের ছুরিটা যত ধারালো, ততই একা। তাই কি “জীবন স্মৃতি”-র পরতে পরতে ভেসে গেলে? রুপোলি পর্দার ভেদাভেদ ভুলে পৌঁছাতে চাইলে তাঁর কাছে?

সেদিনও মনে রাখার মতো মেঘ করেছে কলকাতার। সাতটা বছর আগে সেও এক বৃষ্টিদিন। টিউশনি পড়িয়ে বাড়ি ফিরছি। টিভি পর্দায় অসংখ্য পরিচিত সব থমথমে মুখ। গলা বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করতে গেছি, “কে, মা?” গলা বুজে এলো।
দূরে কোথাও বৃষ্টি নামল, অঝোরে, নিঃশব্দে। ফুঁৎকারে নিভে গেলে ঋতুদা, যেন কে তলব করেছে তোমায় কোনো জরুরি কাজে, যাওয়ার আগে একবার বলেও গেলে না, “আসি”? মাথার উপরের ছাতাটা হঠাৎ দমকা হাওয়ায় উড়ে গেল—

