মানিকবাবুর মেঘ : প্রকৃতি ও মানুষের মহাকাব্যিক সংলাপ

১২ জুলাই মুক্তি পাচ্ছে অভিনন্দন বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম ছবি ‘মানিকবাবুর মেঘ’

“২০১৬ সালের কথা। এক গ্রীষ্মের দুপুর। অফিস থেকে ফিরছি। আশেপাশে দোকানপাট সব বন্ধ। কোনো মানুষ নেই। শুধু আমার মাথার উপর একদলা মেঘ। এই মুহূর্তটা ছিল মহাজাগতিক। জনশূন্য সেই পরিবেশে শুধু আমি আর মেঘ।” – প্রথম পরিচালিত ছবি মানিকবাবুর মেঘ (The Cloud and the Man) প্রসঙ্গে কথাগুলো বলছিলেন তরুণ চিত্রনির্মাতা অভিনন্দন বন্দ্যোপাধ্যায়। ঘটনাচক্রে কোনো জড়বস্তুর সঙ্গে মানুষের প্রেমের সম্পর্ক বিরল নয়। এর উদাহরণ রয়েছে সাহিত্যে-শিল্পে। কিন্তু প্রকৃতিকে জড় বলা যায় না। যেমন গাছ, যেমন আকাশের মেঘ। তারা পাল্টাতে থাকে নিয়ত। মানুষের ভাষা আর প্রকৃতির ভাষা তখন বিন্দুতে এসে মেশে। আর কখনও সেই প্রেমের উচ্চারণ অমোঘ হয়ে যায় বৈকি!

আমরা জানি কালিদাসের ‘মেঘদূত’-এর কথা। এক খণ্ড মেঘকে সে দূত সাব্যস্ত করেছে। সেই মেঘরূপ দূতকেই তার প্রিয়ার কাছে পাঠাচ্ছে। কী অসম্ভব মর্মস্পর্শী আতপ্ত হৃদয়ের পোড়ানি, কী অব্যর্থ সেই দিকনির্দেশ, কী বিধুর সেই বার্তা। অভিনন্দনের মানিকবাবুর মেঘ ছবিতে মানিকবাবুও তার পড়শি। তাঁরও একটা নিজস্ব পৃথিবী আছে, আছে ভুবনজোড়া চোখ বা চোখের মন, আছে মানুষের শরীরের মতো মেঘের আকার পাল্টে যাওয়ার দিকনির্দেশ। অভিনন্দন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মানিকবাবুর মেঘ দর্শককে সেইসব চিরন্তন দৃশ্যের সাক্ষী করেছে। অভিনন্দন বলেন, “আমি চেয়েছিলাম, মানিকবাবু যেমন সরল মানুষ, সেইরকম একটা সরল প্রবাহ থাকুক গোটা ছবি জুড়ে। মানিকবাবুর মেঘ এই সমাজের সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের ছবি। যাঁরা একাকিত্ব বেছে নিয়েছেন, যাঁরা একাকিত্ব উদযাপন করেন, এই ছবি তাঁদেরও।”

পরিচালক অভিনন্দন বন্দ্যোপাধ্যায়

অভিনন্দন বলেন, “আমি চেয়েছিলাম, মানিকবাবু যেমন সরল মানুষ, সেইরকম একটা সরল প্রবাহ থাকুক গোটা ছবি জুড়ে। মানিকবাবুর মেঘ এই সমাজের সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের ছবি। যাঁরা একাকিত্ব বেছে নিয়েছেন, যাঁরা একাকিত্ব উদযাপন করেন, এই ছবি তাঁদেরও।”

অভিনন্দনের বড়ো হওয়া বারাসাতের মফস্‌সলে। ছোটোবেলা থেকেই তাঁকে টেনেছে বাংলা সাহিত্য, লিটল ম্যাগাজিন। তারপর মুম্বই চলে যাবার পর ব্যস্ত হয়ে যাওয়া। যেমন হয় আরকি! ইচ্ছা সত্ত্বেও লিটল ম্যাগাজিন বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু অভিনন্দনের স্বপ্ন দেখা জারি থাকল। পত্রিকা সম্পাদনা ও লেখালেখির মধ্যে দিয়ে সাহিত্য জগতে প্রবেশ করার অনেক বছর পরে চলচ্চিত্রে প্রবেশ। বৌদ্ধায়ন মুখোপাধ্যায়ের ছবি ‘তিনকাহন’-এর চিত্রনাট্য লেখা দিয়ে শুরু। এরপর তাঁর গল্প নিয়ে হয়েছে একাধিক পুর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি। পরবর্তীকালে মানিকবাবুর মেঘ-এর চিত্রনাট্য লিখেছেন প্রায় দুই বছর ধরে। যে সিনেমায় নির্দিষ্ট কোনো গল্প নেই। তথাকথিত গল্প বলাতে তিনি বিশ্বাসই করেন না। তাঁর মতে, সিনেমা নিজস্ব একটা ভাষা হয়ে উঠুক। অভিনন্দন বলেন, “প্রথম ছবিটা তথাকথিত নিতান্ত গল্পকেন্দ্রিক ছবি বানাতে চাইনি। গল্পকেন্দ্রিক ছবিতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু আমি চেয়েছিলাম আমার প্রথম ছবি হবে সিনেমার নিজস্ব ভাষাতেই। ছবিটা নিয়ে ভাবনা চিন্তা শুরু করার আগে সাত-আটমাস ধরে একটা গবেষণা করেছিলাম। এই ভাবনায় এর আগে কোনো ছবি বা সাহিত্য আছে কী না, সেটা জানতে আগ্রহী ছিলাম। যদিও কালীদাসের ‘মেঘদূত’ ছাড়া তেমন কোনো রেফারেন্স পাইনি মেঘ ও মানুষ নিয়ে। তারপরেই ঠিক করলাম ‘মানিকবাবুর মেঘ’ বানাব। আর শুরু থেকেই আমার পাশে ছিলেন বৌদ্ধায়ন মুখোপাধ্যায় এবং মোনালিসা মুখোপাধ্যায়। ওঁরাই এই ছবির প্রযোজক।”

ছবিতে মুখ্য ভূমিকায় রয়েছে দুটি চরিত্র – মানিকবাবু এবং মেঘ। মানিকবাবুর চরিত্রে অভিনয় করেছেন চন্দন সেন। অভিনন্দন চেয়েছিলেন পর্দার অভিনেতাকে আগে ‘মানুষ’ হতে হবে। স্টারডম এক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। অনেক সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করবেন তিনি। সেই মতো চন্দন সেনকে কাস্ট করা হয়। পরিচালকের বক্তব্য, চন্দন সেনকে এর আগে কখনও প্রধান চরিত্রে দেখা যায়নি। এই ছবিতে অন্যান্য নানান চরিত্রে অভিনয় করেছেন থিয়েটারেরই শিল্পীরা – দেবেশ রায়চৌধুরী, ব্রাত্য বসু, নিমাই ঘোষ। একটি চরিত্রে দেখা যাবে প্রয়াত অভিনেতা অরুণ গুহঠাকুরতাকেও।

ছবিতে তেমনভাবে কোনো সংলাপ রাখতে চাননি পরিচালক। একটা মানুষের যদি প্রিয় বন্ধু হয়ে যায় আকাশের ভেসে থাকা মেঘ, তাহলে মেঘের সঙ্গে মানুষের কী কথা থাকতে পারে! তারা একে অপরের দিকে চেয়ে থাকতে পারে। আর তাদের কথা থাকবে ভিতরে ভিতরে। মেঘ-মানুষের মিলনটাই তখন সংলাপের মতো। পর্দা জুড়ে কত কত কথা। দর্শকদের মধ্যে কেউ কেউ সেই কথা শুনতে পাবেন, কেউ পাবেন না। অভিনন্দন বন্দ্যোপাধ্যায় এই ছবিটিকে নির্দিষ্ট কোনো তকমা দিতে চান না। বাস্তব, পরাবাস্তব, জাদুবাস্তব – সবকিছুই হতে পারে আবার নাও হতে পারে। এ প্রসঙ্গে পরিচালক জানান, “আমি চাইনি, এই ছবির ভাষা বাংলা, হিন্দি বা অন্য কিছু হোক। বরং চেয়েছি, ছবিটা নিজেই একটা ভাষা হয়ে উঠুক।’’

একটা মানুষের যদি প্রিয় বন্ধু হয়ে যায় আকাশের ভেসে থাকা মেঘ, তাহলে মেঘের সঙ্গে মানুষের কী কথা থাকতে পারে! তারা একে অপরের দিকে চেয়ে থাকতে পারে। আর তাদের কথা থাকবে ভিতরে ভিতরে। মেঘ-মানুষের মিলনটাই তখন সংলাপের মতো।

মানিকবাবুর মেঘ – দুটো শব্দের মধ্যে চমৎকার অনুপ্রাসের প্রয়োগ। যদিও পরিচালকের বক্তব্য, মানিকবাবু নামের পিছনে তাঁর আলাদা কোনো শ্রম নেই। হঠাৎই মাথায় চলে এসেছিল। অথচ এই নামের মধ্যে নানন্দিকতা আছে। মানিকবাবু নামকরণের জন্য পরিচালককে অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে। অনেকেই ভেবেছেন এটা কি সত্যজিৎ রায়ের বায়োপিক! পরিচালকের বক্তব্য, তাঁদের মতো যাঁরা মফস্‌সল শহরে বড়ো হয়েছেন, আর যাঁরা বাংলা সাহিত্যের প্রতি আগ্রহী, তাঁদের কাছে যুবকবেলার হিরো সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। যদিও এই ছবির সঙ্গে সত্যজিৎ রায় বা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনো সম্পর্ক নেই।

২০২২ সালে কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের নেটপ্যাক (NETPAC – ASIAN SELECT) বিভাগে দেখানো হয় এই ছবি। সে বছর সেরা এশিয়ান চলচ্চিত্র হিসেবে পুরস্কারও জেতে। তবে একাধিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণ করলেও অনেক স্বাধীন ভারতীয় ছবির ক্ষেত্রে ছবি মুক্তি নিয়ে নানান জটিলতা তৈরি হয়। মানিকবাবুর মেঘ-এর ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল। আটকে ছিল মুক্তি। অবশেষে এ ছবির পাশে দাঁড়িয়েছেন অভিনেতা ও নাট্যকর্মী অনির্বাণ ভট্টাচার্য। তিনি এ ছবির নিবেদক। অভিনন্দন বারবার স্বীকার করেন অনির্বাণের কথা। বলেন, “বই লেখার সময় মুখবন্ধের প্রয়োজন হয়। মানিকবাবুর মেঘ-এ সেই মুখবন্ধের ভূমিকা পালন করছেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য। ওঁর সঙ্গে প্রথম আলাপেই আমাদের অনেক বিষয় নিয়ে কথাবার্তা হতে থাকে। সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র – সবেতেই অনির্বাণের শিক্ষা ও রুচি আমার সঙ্গে মিলে যায়। তাই আমাদের বন্ধুত্বও তাড়াতাড়ি হয়ে গেল। অনির্বাণের মতো মানুষ যে আমার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবির পাশে থাকলেন, তার জন্য ওঁকে ভালোবাসা ছাড়া আর কীইবা জানাতে পারি!” প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আগামী ১২ জুলাই বড়োপর্দায় সারা দেশজুড়ে মুক্তি পাচ্ছে মানিকবাবুর মেঘ। পিভিআর আইনক্সের পরিবেশনায় এই ছবি দেখা যাবে কলকাতা, মুম্বাই, হায়দ্রাবাদ, বেঙ্গালুরু, নয়ডা ও গুরগাঁও-এর প্রেক্ষাগৃহে।

এযাবৎকাল অবধি অভিনন্দনের মানিকবাবুর মেঘ বিশ্বের ৩৮টি চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে, তার মধ্যে প্রিমিয়ার হয়েছে ৫টি মহাদেশে, পেয়েছে ১৪টি পুরস্কার। এছাড়াও এনএফডিসি ফিল্ম বাজারের (NFDC Film Bazar) ২০২০-এর বাছাই করা ছবির তালিকায় স্থান পেয়েছিল এই ছবি। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের তিন বিখ্যাত নাম পাওলো বের্তোলিন, কিকি ফুং এবং স্তেফান বোর্সোসের জুরি বোর্ড এনএফডিসি ফিল্ম বাজার পুরস্কারের মঞ্চে মানিকবাবুর মেঘ-কে দিয়েছিল ‘স্পেশাল মেনশন’-এর তকমা।

মানিকবাবুর মেঘ-এর চিত্রগ্রাহক অনুপ সিং, প্রোডাকশন ডিজাইনার মোনালিসা মুখার্জি, শিল্প নির্দেশক বাবলু সিংহ, শব্দ করেছেন অভিজিৎ রায়, সংগীত পরিচালক শুভজিৎ মুখার্জি, সম্পাদনা করেছেন অভ্র ব্যানার্জি, সংলাপ লিখেছেন বৌদ্ধায়ন মুখোপাধ্যায় ও অভিনন্দন বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবিটি প্রযোজনা করেছে বৌদ্ধায়ন মুখোপাধ্যায় ও মোনালিসা মুখোপাধ্যায়ের লিটল ল্যাম্ব ফিল্মস

Developed by DXDasia