
এখানে কাশফুলের দোলা নেই, ভোরের শিশিরভেজা ঘাস নেই, পাড়ার মোড়ে বাঁশ দিয়ে তৈরি মণ্ডপ নেই। তবু শরতের আকাশে-বাতাসে কেমন একটা অদৃশ্য শিহরণ থাকে। মনে হয়, প্রকৃতি বুঝি খুব আস্তে করে খবরটা দিয়ে গেল আর তো মাত্র কয়দিন। ‘মা আসছেন’। দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে থেকেও এই অনুভূতি কিন্তু একেবারেই বদলায়নি। চারপাশটাই শুধু বদলেছে, বদল হয়েছে জায়গার।
বাঙালির কাছে মায়ের আগমন, এক অবর্নণীয় অনুভূতি। কৈলাস থেকে উমা আসছেন বাপের বাড়িতে, আবেগ তো থাকবারই কথা। সেই চিরচেনা কাহিনি শুধু পুরাণে নেই, তা যেন বাঙালির স্মৃতির মধ্যেই বেঁচে থাকে আজীবন। ছোটোবেলায় যেভাবে মায়ের আসার অপেক্ষা করতাম, সেই অপেক্ষা আজও রয়েছে অটুট। এবার সেই অপেক্ষা নিয়েই লন্ডনের পথে পথে ঘুরতে ঘুরতে মনে হল, দুর্গাপুজো কোথায় হয়? কলকাতায়? লন্ডনে? কেমব্রিজে? নাকি মানুষের মনে?
আমার কাছে উত্তরটা খুব সহজ; যেখানে মানুষ মাকে নিয়ে তাঁর সন্তানরা একসঙ্গে মিলিত হয়, সেখানেই হয় আসল দুর্গাপুজো। প্রতিবছর প্রবাসে পুজো দেখতে গিয়ে প্রথম যে জিনিসটা আমার সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে, তা হল মানুষের একসঙ্গে থাকার আনন্দ। সারাবছর যে মানুষটি অফিসের কাজে ব্যস্ত, যে মা সন্তান-সংসার আর পেশাগত দায়িত্ব সামলাতে ছুটে বেড়ান, যে ছেলেটি সারাবছর ইংরেজিতে পড়াশোনা করে বড়ো হচ্ছে, পুজো এলেই সবাই যেন অন্য এক পরিচয়ের চেনা গণ্ডিতে ফিরে আসে বারবার।
কেউ উত্তর কলকাতার, কেউ দক্ষিণ কলকাতার, কেউ হাওড়া, হুগলি বা মফস্বলের। কেউ বহু বছর আগে দেশ ছেড়েছেন, কেউ সদ্য এসেছেন। কিন্তু মায়ের সামনে দাঁড়ালে পরিচয় একটাই, আমরা বাঙালি। অনুভূতিটা বুঝতে হলে হয়তো লন্ডনের একটি পুজোমণ্ডপে কিছুক্ষণ দাঁড়াতে হবে।
ব্রিটেনে দুর্গাপুজোর বিস্তার আজ যথেষ্ট বড়ো। ইউকে বেঙ্গলি কালচারাল ডিরেকটরি (UK Bengali cultural directory)-র তালিকায় প্রায় ১০০টিরও বেশি পুজোর উল্লেখ রয়েছে; লন্ডন ও আশপাশেই ১০০টির বেশি পুজোর কথা সেখানে বলা হয়েছে।

এখানে প্যান্ডেল হয় কমিউনিটি হলের ভিতরে। কোথাও স্পোর্টস সেন্টার, কোথাও লাইব্রেরি, কোথাও স্কুলের হল। বাঁশের কাঠামো, কাগজ আর কাপড় দিয়ে কলকাতার মতো বিশাল মণ্ডপ তৈরি করা সবসময় সম্ভব হয় না। তাই নিজেদের হাতেই তৈরি হয় উৎসবের পরিসর। কেউ ফুল সাজাচ্ছেন, কেউ আলপনা দিচ্ছেন, কেউ ভোগ রান্না করছেন, কেউ বা প্রতিমা আনার ব্যবস্থা করছেন। পুজোর প্রতিটি মুহূর্তই মানুষের নিজের হাতে তৈরি, সেই কারণেই হয়তো প্রবাসের পুজোয় আবেগটা এত ঘন।
ব্রিটেনে দুর্গাপুজোর বিস্তার আজ যথেষ্ট বড়ো। ইউকে বেঙ্গলি কালচারাল ডিরেকটরি (UK Bengali cultural directory)-র তালিকায় প্রায় ১০০টিরও বেশি পুজোর উল্লেখ রয়েছে; লন্ডন ও আশপাশেই ১০০টির বেশি পুজোর কথা সেখানে বলা হয়েছে। সংখ্যা নিয়ে সরকারি কোনও একক হিসাব না থাকলেও, লন্ডনের পথে পথে হাঁটলেই বোঝা যায় এই উৎসব কতটা বিস্তৃত হয়েছে। এই বিস্তারের ইতিহাসও কম আকর্ষণীয় নয়। লন্ডনে দুর্গাপুজোর প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়েছিল ১৯৫৪ সালে। লন্ডন দুর্গাপুজো দশেরা অ্যাসোসিয়েশন (London Durga Puja Dusserah Association)-এর তথ্য অনুযায়ী, কয়েকজন তরুণ বাঙালি ছাত্রের উদ্যোগে সেই বছর Russell Square-এর Maryward Centre-এ পুজো হয়। অমৃতবাজার পত্রিকার সম্পাদক তুষারকান্তি ঘোষ সেই পুজোর জন্য প্রতিমা দান করেছিলেন।
নতুন প্রজন্মের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও সুন্দর লাগে। ইংরেজিতে অভ্যস্ত শিশুরা পুজোর দিন বাঙালি পোশাক পরে বাবা-মায়ের হাত ধরে মণ্ডপে আসে। অঞ্জলি দেয়, ভোগ খায়, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। কেউ হয়তো বাংলা পুরোপুরি বলতে পারে না, কিন্তু মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে তার আনন্দের ভাষা নিমেষে পড়া যায়। তখন মনে হয়, সংস্কৃতি শুধু ভাষায় বেঁচে থাকে না, বেঁচে থাকে স্মৃতিতে, আচারে, উৎসবে আর পরবর্তী প্রজন্মকে তা ভালোবেসে শেখানোর মধ্যে।

লন্ডন দুর্গাপুজো দশেরা অ্যাসোসিয়েশন (London Durga Puja Dusserah Association)-এর তথ্য অনুযায়ী, কয়েকজন তরুণ বাঙালি ছাত্রের উদ্যোগে সেই বছর Russell Square-এর Maryward Centre-এ পুজো হয়। অমৃতবাজার পত্রিকার সম্পাদক তুষারকান্তি ঘোষ সেই পুজোর জন্য প্রতিমা দান করেছিলেন।
লন্ডনের পুজোগুলোর মধ্যেও তাই আলাদা আলাদা গল্প আছে। গুনার্সবেরি পার্কে বেঙ্গল হেরিটেজ ফাউন্ডেশন (Bengal Heritage Foundation)-এর লন্ডন শারদ উৎসব (London Sharad Utsav) এবার ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর। তিন দিনের এই আয়োজনে পুজোর পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খাবার, আড্ডা এবং নানা কমিউনিটি আয়োজন থাকছে। এবার আকাশবাণী কলকাতার শতবর্ষের স্মৃতিও অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মহালয়ার ‘মহিষাসুরমর্দিনী’-র মাধ্যমে। পাশাপাশি ক্যামডেনের পুজোরও রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য। সুইস কটেজ লাইব্রেরি (Swiss Cottage Library)-কে ঘিরে আয়োজিত এই উৎসবে এবার ‘দেবী চৌধুরাণী’-কে কেন্দ্র করে বিশেষ সাংস্কৃতিক পরিবেশনার প্রস্তুতি রয়েছে।
আর লন্ডন পেরিয়ে কেমব্রিজে গেলে দেখা যায় আরেক ছবি। ইন্ডিয়ান কালচারাল সোসাইটি (Indian Cultural Society)-এর দুর্গাপুজো এবার ২৫ বছরে পা দিচ্ছে। নেদারহল স্কুল (Netherhall School)-এ সেই আয়োজনও শুধু পুজো নয় এ যেন কেমব্রিজের বাঙালি সমাজের বার্ষিক পুনর্মিলন। আদিশক্তির পুজো এবছর ১০ বছরে পড়লো। এছাড়াও চিকিৎসক সম্প্রদায়ের বাঙালি কালচারাল সোশ্যাল ক্লাব-এর পুজো, বেঙ্গল মিল্টন কেনস-এর পুজো প্রতিটি আয়োজনের নিজস্ব গল্প রয়েছে। কোনওটি দশ বছরে, কোনওটি পঁচিশে, কোনওটি তারও বেশি পুরনো। কোথাও বড়ো আয়োজন, কোথাও ছোট্ট কমিউনিটি। কিন্তু আবেগের জায়গাটা আশ্চর্যভাবে একই।
এক পুজো থেকে আরেক পুজোয় যেতে যেতে আমার সবথেকে ভালো লাগে এই মানুষগুলোকে দেখতে। একজন মেয়েকে শাড়ি পরিয়ে দিচ্ছেন। কেউ ছেলেকে ধুতি পরাতে ব্যস্ত। কেউ পুরনো বন্ধুকে দেখে জড়িয়ে ধরছেন। কোথাও খাবারের স্টল, কোথাও জামাকাপড়ের দোকান, কোথাও গান, কোথাও নাটক। সারা বছর যে মানুষগুলো নিজেদের জীবনে ব্যস্ত, পুজোর কয়েকটা দিন তারা যেন আবার একটি বড়ো পরিবারের সদস্য হয়ে ওঠেন। যে পরিবারটির কোনও নির্দিষ্ট ঠিকানা নেই। আজ এখানে, কাল অন্য মণ্ডপে। কারও সঙ্গে দেখা হচ্ছে লন্ডনে, কারও সঙ্গে কেমব্রিজে। হয়তো বছরভর যোগাযোগ থাকে না। কিন্তু পুজোর দিন দেখা হলে কথার শেষ থাকে না।
এটাই তো পুজো। তবে, এত আনন্দের মধ্যেও কোথাও একটা মন খারাপের কলকাতা থেকে যায়। মায়ের মুখের দিকে তাকালে মনে পড়ে নিজের শহর। ঢাকের শব্দে মনে পড়ে পাড়ার মণ্ডপ। ধুনোর গন্ধে মনে পড়ে ঠাকুরদালান। আর সন্ধ্যার আলোয় হঠাৎ মনে হয় এই মুহূর্তটা যদি কলকাতায় থাকতাম!
প্রবাসের পুজো তাই আমার কাছে কলকাতাকে ভুলে থাকার গল্প নয়। বরং কলকাতাকে আরও গভীরভাবে মনে করার গল্প। দশমীর দিন যখন মাকে বরণ করা হয়, সিঁদুর খেলা হয়, তখন আবার মনটা ভারী হয়ে আসে। মনে হয় এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল?

বিদেশে অনেক জায়গায় প্রচলিত বিসর্জনের ব্যবস্থা সম্ভব হয় না কিন্তু, প্রতিমাকে যত্ন করে সংরক্ষণ করা হয় আবার পরের বছরের জন্য। মা যেন কোথাও যান না, শুধু একটু আড়ালে থাকেন।
তারপর আবার অপেক্ষা। আবার শরৎ। আবার আকাশে সাদা মেঘ। আবার মহালয়ার ভোর। আবার ঢাক বাজবে। আর কেউ হয়তো খুব আস্তে আস্তে বলবে, “মা আসছেন।”
দেশ বদলেছে। ঠিকানা বদলেছে। প্রজন্ম বদলেছে। কিন্তু মায়ের জন্য অপেক্ষাটা বদলায়নি। এভাবেই এসময় লন্ডনের ব্যস্ত শহরটা আমার চোখে খানিক বদলে যায়। মনে হয়, দূরত্ব বলে সত্যিই কিছু নেই। কারণ মায়ের আগমন শুধু পুজোর কয়েকটা দিনপঞ্জি নয়।
এ আমাদের শৈশব। এ আমাদের স্মৃতি। এ আমাদের পরিবার। আমাদের বাংলা।
লন্ডনের পথে পথে ঘুরতে ঘুরতে তাই মনে হয় আমি শুধু দুর্গাপুজো দেখছি না। আমি আসলে খুঁজে বেড়াচ্ছি নিজের শিকড় আর অনুভূতিগুলোকে।

