বস্টন দুর্গাবাড়ি : চন্দন চিত্রকরের পটচিত্রে সেজে উঠছে বিদেশের মণ্ডপ

গত ১৪ বছর ধরে বস্টনে এই পুজো হয়ে আসছে

শারদোৎসব দেশের মাটিতেই হোক বা বিদেশে, উন্মাদনায় এক্কেবারে এক! ঠিক যেমন বস্টনের এই পুজো। তাদের এ বারের থিম: বাংলার পটচিত্র। যে ভাবনার সবটুকু জুড়ে আছে বাংলার রূপ-রস-গন্ধ।

এই বছর বস্টন দুর্গাবাড়িতে সব রকম প্লাস্টিকের চামচ বর্জন করে তাঁরা ব্যবহার করছেন পরিবেশবান্ধব বাঁশের চামচ। যে প্রকৃতিতে ভালোবেসে বৃক্ষরোপনের গান করেন পুতুল চিত্রকর, উদ্যোক্তারা সেই পরিবেশকেই একটু দূষণমুক্ত করতে চেয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অন্তর্গত বস্টন দুর্গাবাড়ি-র এবারের থিম বাংলার পটচিত্র। প্রবাসী বাঙালির কানে সবসময় বাজে ঘরে ফেরার সুর। প্রতি বছর বস্টন দুর্গাবাড়ির মণ্ডপসজ্জায় তাই মিশে থাকে হাতে বানানো নকশাদার হাতপাখা বা রংচঙে কুলো অথবা তুলসীমঞ্চ, যার প্রত্যেকটিই বাংলার চিরাচরিত অঙ্গ। পুজো কমিটির পক্ষ থেকে ডাঃ মধুবাণী ঘোষ বঙ্গদর্শন.কম-কে জানিয়েছেন, “গত ১৪ বছর ধরে বস্টন দুর্গাবাড়িতে দুর্গাপুজো হয়ে আসছে। আমাদের ArtisanConnect উদ্যোগে এইবার বেছে নিয়েছি বাংলার পটচিত্র এবং পটচিত্র শিল্পী শ্রী চন্দন চিত্রকরকে। তাঁর আঁকা পটচিত্রগুলি এই বছর আমাদের মণ্ডপ সাজের আধার। পটচিত্রগুলির সঙ্গে মনোরম গান গেয়েছেন চন্দনবাবুর স্ত্রী, পুতুল চিত্রকর। অতিথিরা যদি এই পটচিত্র কিনতে চান আমরা সে ব্যবস্থাও রেখেছি। আশা করছি এই প্রচেষ্টা বাংলার লোকশিল্পকে মার্কিন মুলুকে আরও খানিকটা পরিচয় করিয়ে দিতে পারবে, আরও খানিকটা প্রসারিত করতে পারবে। প্রতি বছর আমাদের এই উদ্যোগ বাংলার লোকশিল্পীদের পাশে থাকতে পারবে।”

 

বস্টন দুর্গাবাড়ির পুজো হয় তাঁবু খাটিয়ে ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত পুজোর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে। অতিথিরা সকলে বিনামূল্যে ভোগ প্রসাদ পান। এই পুজোর কোনো নির্ধারিত প্রবেশমূল্য নেই। যে যেমন সাহায্য করেন উদ্যোক্তারা মাথা পেতে গ্রহণ করেন। জানা গিয়েছে, প্রতি বছর এই পুজোয় প্রায় পাঁচ হাজার দর্শনার্থী আসেন। ডাঃ ঘোষ জানাচ্ছেন, “আমরা বাড়িতে বানানো নানারকম খাবারের একটা স্টল দিই। স্টলের নাম ‘চায়ে গরম’। ঠিক যেমন স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে হাঁক দিয়ে যেত ফেরিওয়ালা। আমাদের স্টলে পাওয়া যায় কলকাতায় ফেলে আসা প্রিয় স্ট্রিট ফুড। পাওয়া যায় এগরোল, ফুচকা, ঝালমুড়ি, লুচি আলুর দম, মিষ্টি।” এ-নিয়ে দুর্দান্ত এক ছড়াও মুখে মুখে ফেরে। “চাউ খেও চিনে পাড়ায়/ ফ্রাইস খেও মলে/ হাতে গড়া মিষ্টি খেও/ চায়ে গরম স্টলে…।”

বাংলার গর্ব তার ঐতিহ্যশালী লোকায়ত শিল্প, কুটিরশিল্প। সে সবের মধ্যে অন্যতম বিখ্যাত ও প্রাচীন বাংলার পটচিত্র। বাংলার বিস্তৃত অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছেন অগুনতি পটশিল্পী, প্রত্যেকের রয়েছে নিজস্ব ঘরানা, যা বাংলার সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছে সারা পৃথিবীর কাছে। চন্দন চিত্রকর সেই ঘরানারই অন্যতম সফল একজন শিল্পী।

এই বছর বস্টন দুর্গাবাড়িতে সব রকম প্লাস্টিকের চামচ বর্জন করে তাঁরা ব্যবহার করছেন পরিবেশবান্ধব বাঁশের চামচ। যে প্রকৃতিতে ভালোবেসে বৃক্ষরোপনের গান করেন পুতুল চিত্রকর, উদ্যোক্তারা সেই পরিবেশকেই একটু দূষণমুক্ত করতে চেয়েছেন। ডাঃ ঘোষ জানিয়েছেন, “আমাদের স্বেচ্ছাসেবকরা অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন যাতে এই পুজো সর্বাঙ্গসুন্দর হয়, আনন্দময় হয় আর সুরেলা হয়। তাঁরা সকলে মিলে পুজোর গান লিখেছেন, সুর দিয়েছেন  এবং গেয়েছেন। কোথাও যেন গানের সুরে কলকাতা আর বস্টন মিলেমিশে এক হয়ে গেছে।”

“আর কতদিন থাকবো বসে আসবে তুমি কবে/ আপিস-বাড়ি, বাড়ি-আপিস কবে যে শেষ হবে/ উসখুসে মন ভাবছে এবার দুগ্গা এলো বুঝি/ আমার শহর জুড়ে এখন কেবল তোমায় খুঁজি।” এই খোঁজা ফুরোয় না। এক বছরের অপেক্ষা-শেষে আবার একটা পুজো মানে প্রবাসী বাঙালিদের কাছে মুক্তির আনন্দ আর শেকড়ে ফিরতে চাওয়ার চিরন্তন বাসনা। কলকাতা থেকে হাজার হাজার মাইল দূরেও শিউলি আর কাশের স্মৃতিতে উঁকি মারে দুরন্ত শৈশব।
 

Developed by DXDasia