
ফ্রাঙ্কফুর্টে জমজমাট বাঙালিদের দুর্গাপুজো
সে দেশে এখন জায়গায় জায়গায় প্যান্ডেল তৈরির ব্যস্ততা নেই, পাড়াগুলোরও আলোর মালা পরে সেজে ওঠার তাগিদ নেই। জামা কাপড়ের দোকানে হাঁকাহাঁকি, ট্রায়াল দেওয়া নেই, রাস্তার ধারে কাশফুলের মাথা দোলানো দেখা যায় না, ভোরবেলা শিউলির সুগন্ধও মেলে না। তবু সে দেশে শরৎ আসে, সেখানে শরৎ আসে স্বয়ং উমার হাত ধরে। (জার্মানিতে দুর্গাপুজো)
আসলে, জগজ্জননী দুর্গার বাঙালি ছেলেমেয়েরা তো ছড়িয়ে আছে জগৎ জুড়েই। তাই বাংলায় যখন পুজোর প্রস্তুতি পুরোদমে, তখন এই রাজ্য থেকে প্রায় ৭,৩৮০ কিলোমিটার দূরের শহর জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে বসবাসকারী বঙ্গসন্তানদেরও “মা বলিতে প্রাণ করে আনচান/ চোখে আসে জল ভরে”। আর তাই সন্তানের ডাকে সাড়া দিয়ে বাংলা থেকে শরতের সুবাস বয়ে নিয়ে সেখানে পৌঁছে যান দুর্গা। আর তখন, মাকে স্বাগত জানায় রসবাখের চক্রবর্তী পরিবার। ধূপ-ধুনোর গন্ধে, ঢাকের তালে, ভোগ রান্নার তুমুল ব্যস্ততায় উমা এই পাঁচদিন হয়ে ওঠেন এক প্রবাসী সন্তানের অতিথি। আর বিদেশের মাটিতে মা আসার খবর পেয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে আসেন তাঁর অন্যান্য প্রবাসী বঙ্গসন্তানরাও। (জার্মানিতে দুর্গাপুজো)
কর্মসূত্রে দেশের সীমানা ছেড়ে বিদেশের মাটিতেই স্থায়ী ঠিকানা গড়েছেন চক্রবর্তী পরিবার। তবু রক্তে মিশে থাকা বাঙালিয়ানা যেন ফল্গু নদীর স্রোতের মতো বয়ে চলে তাদের শিরা ধমনীতে। তাই, বাঙালির সবচেয়ে বড়ো উৎসবে তাদের বাড়ি হয়ে আনন্দ নিকেতন।

কর্মসূত্রে দেশের সীমানা ছেড়ে বিদেশের মাটিতেই স্থায়ী ঠিকানা গড়েছেন চক্রবর্তী পরিবার। তবু রক্তে মিশে থাকা বাঙালিয়ানা যেন ফল্গু নদীর স্রোতের মতো বয়ে চলে তাদের শিরা ধমনীতে। তাই, বাঙালির সবচেয়ে বড়ো উৎসবে তাদের বাড়ি হয়ে আনন্দ নিকেতন। সুদূর জার্মানি থেকে চক্রবর্তী বাড়ির গৃহকর্ত্রী শতাব্দী চক্রবর্তী বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “আমরা দুর্গাপুজো শুরু করি ২০১৮ সাল থেকে, তখন অবশ্য এই বাড়ি নয়, পুজো হতো ভাড়া বাড়িতে। পুজো শুরুর দু-বছরের মধ্যেই আসে করোনা। তবে সেই সময়েও পুজো হয়েছে। লাইভ স্ট্রিমিং-এর মাধ্যমে দূরের সকলে ভার্চুয়ালি পুজোর সাক্ষী হতে পেরেছেন। অষ্টমীর অঞ্জলি দিয়েছেন, সন্ধি পুজোও দেখেছেন।” (জার্মানিতে দুর্গাপুজো)
তারপর কেটে গেছে কোভিডকাল, ততদিনে চক্রবর্তী বাড়ির নতুন ভিটে হয়েছে জার্মানির মাটিতে। জানা গেল শতাব্দীর মা স্বপ্ন দেখেন তাঁর মেয়ের বাড়িতে দুর্গা দালানে, দুর্গাপুজো হচ্ছে। মায়ের দেখা সেই স্বপ্নকেই সত্যি করে তোলেন শতাব্দী এবং তার পরিবার। ২০২২ সাল থেকে নিজেদের বাড়ির দুর্গা দালানে পুজো শুরু করেন তারা। বোধন থেকে বিসর্জন সবকিছুই হয় সাবেক বাংলার রীতি মেনে। একান্নবর্তী পরিবারের পুজোর মতোই অন্যান্য প্রবাসী পরিবারের অনেকেই একাত্ম হয়ে যান এই পরিবারের সঙ্গে। (জার্মানিতে দুর্গাপুজো)

পরিবারের সদস্যরা জানালেন, ভারতীয় সময়ের নির্ঘণ্ট মেনেই বোধন, নবপত্রিকা স্নান, কুমারী পূজা, বলিদান, সন্ধিপূজা, সব হয়। পৌরহিত্য করেন গৃহকর্তা সপ্তর্ষি চক্রবর্তী নিজে। আর দেবীর ভোগের দায়িত্বে থাকেন তাঁর স্ত্রী শতাব্দী চক্রবর্তী সঙ্গে পরিবারের অংশ হয়ে ওঠা বন্ধুরা। লুচি থেকে বাসন্তী পোলাও, পায়েস, চাটনি বাঙালির প্রিয় সব পদই মাকে রেঁধে খাওয়ান তার প্রবাসী কন্যারা। দশমীতে মায়ের সিঁদুরে রাঙা হয়ে ওঠেন তারা। শতাব্দী জানালেন, “সিঁদুরখেলা এই পুজোর অন্যতম আকর্ষণ। এখানে অনেক জায়গাতেই সিঁদুর খেলা বারণ, তাই যারা সিঁদুর খেলতে ভালোবাসেন তারা সকলেই আসেন আমাদের বাড়িতে।” তবে ঘট বিসর্জন হলেও এই প্রতিমা বিসর্জিতা হন না। দেবীর প্রতিমা এখানে প্রতিষ্ঠিত, নিত্যপুজো হয় তার। দৈনন্দিন পুজো এবং সংরক্ষণের কথা চিন্তা করে শতাব্দীর মা বিদিশা বসু কলকাতার শিল্পী অসীম ভৌমিককে দিয়ে সৃষ্টি করান দুর্গাপ্রতিমা। ডাকের সাজে সাজানো প্রতিমা এখানে কাচের আবরণে সুরক্ষিতা। পুজোর সামগ্রী থেকে ঢাক সব কিছুই চক্রবর্তী বাড়িতে পৌঁছেছে কলকাতা থেকেই।
বাঙালির কাছে দুর্গাপুজো মানে তো শুধু পুজো নয়, উৎসব। তাই দুর্গাপুজোর অনেকদিন আগে থেকেই পাড়ায় পাড়ায় শুরু হয় পুজোর অনুষ্ঠানের মহড়া, নাটকের ইতিহাসের সঙ্গেও জুড়ে আছে পুজোর সময়ের বনেদি বাড়ির আঙিনার কথা। আর পুজো মানেই তো দেদার আড্ডা। তবে প্রবাসের এই পুজোতে বাঙালিয়ানার চিরপরিচিত এই গন্ধটা কতটা পাওয়া যায়? এই ব্যাপারে, চক্রবর্তী পরিবার ঘনিষ্ঠ ঐশ্বর্য পাল বাগ বঙ্গদর্শন-কে জানান, “বাঙালিয়ানার অন্যান্য স্বাদের মতোই উৎসবের এই স্বাদও পুরোদমে উপভোগ করি। পুজোর প্রায় তিনমাস আগে থেকে প্রস্তুতি শুরু হয়। পুজোর দিনগুলিতে ধুনুচি নাচ থেকে গানবাজনা সব হয়।” ঐশ্বর্য আরও জানালেন, “এই বছরের পুজোর বিশেষ আকর্ষণ পঞ্চমীর দিন শ্রুতিনাটক ও আগমনী গানের অনুষ্ঠান। এছাড়াও শাস্ত্রীয় নৃত্যের অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়েছে এই বছর। সবমিলিয়ে জমজমাট পুজোর আনন্দ ও এই পরিবারের সদস্যদের আন্তরিকতা ভুলিয়ে দেয় পুজোর মধ্যে কলকাতায় না থাকার কষ্ট।”
শুধু জার্মানির বাঙালিরাই নয়, প্রতিবেশী দেশ অস্ট্রিয়া, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ড, স্পেন থেকেও বহু বাঙালিরা এসে এই পুজোয় অংশগ্রহণ করেন। বাঙালিদের পাশাপাশি জার্মানি, আফ্রিকার অবাঙালি মানুষরাও বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবের আনন্দ উপভোগ করতে চলে আসেন এই বাড়ির দুর্গা দালানে।

শুধু জার্মানির বাঙালিরাই নয়, প্রতিবেশী দেশ অস্ট্রিয়া, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ড, স্পেন থেকেও বহু বাঙালিরা এসে এই পুজোয় অংশগ্রহণ করেন। বাঙালিদের পাশাপাশি জার্মানি, আফ্রিকার অবাঙালি মানুষরাও বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবের আনন্দ উপভোগ করতে চলে আসেন এই বাড়ির দুর্গা দালানে। শতাব্দী জানালেন এক এক বেলায় প্রায় দেড়শো মানুষের সমাগম হয়। এমনকি কোনও কোনও সময় অতিথির সংখ্যা পাঁচশোও ছাড়িয়ে গেছে।
সারা বছরের কর্মব্যস্ততার ক্যালেন্ডারে সেপ্টেম্বর অথবা অক্টোবর মাসে পর পর চার অথবা পাঁচটি লালকালির তারিখ খোঁজে না এমন বাঙালি বিরল। আসলে এই চারটে বা পাঁচটা লাল তারিখ বাঙালিকে নিয়ে যায় তার শিকড়ের কাছাকাছি। কাজের পিছুটান অনেক বাঙালিকেই এই কদিনের জন্যেও মাটি ছুঁতে দেয় না। কিন্তু কাজ হাত পা বেঁধে দিলেও মনকে তো আর বাঁধতে পারে না। তাই মনের ডাকে সাড়া দিয়েই প্রবাসের বাঙালিরা আচার-নিয়মে, নাচে গানে, আড্ডায়, আতিথেয়তায় পালন করে বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব।
