
বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো। সারাবছর শুধু এই পাঁচটা দিনের কথা ভেবেই মুখিয়ে থাকি আমরা। বসের বকুনি, পেন্ডিং ইএমআই, সামনেই মাধ্যমিক – সবটাই এ কদিনের জন্য মেনে নেওয়া যায়। উনিশ শতকে তাঁর নকশায় হুতোম লিখছেন, “ক্রমে দুর্গোৎসবের দিন সংক্ষেপ হোয়ে পড়লো। কৃষ্ণনগরের কারিকরেরা কুমারটুলী ও সিদ্ধেশ্বরীতলা জুড়ে বসে গ্যাল… অ্যাত দিন জুতোর দোকান ধুলো ও মাকড়সার জালে পরিপূর্ণ ছিল, কিন্তু পূজোর মোর্সমে বিয়ের কনের মত ফেঁপে উঠ্চে; দোকানের কপাটে কাই দিয়ে নানা রকম রঙ্গিণ কাগজ মারা হয়েচে, ভেতরে চেয়ার পাড়া, তার নীচে অ্যাক্ টুকরো ছেঁড়া কার্পেট। সহরের সকল দোকানেরই শীতকালের কাগের মত চেহারা ফিরেচে। যত দিন ঘুনিয়ে আসচে, ততই বাজারের কেনা ব্যাচা বাড়চে, ততই কলকেতা গরম হয়ে উঠ্চে।” এই সমাজচিত্র আজও স্থির। স্থান, কাল, পাত্র বদললালেও শহুরে উদ্দীপনা যেন একই রয়ে গেছে। বরং বৃদ্ধি পেয়েছে কোথাও কোথাও। (থিমপুজো বনাম সাবেকিয়ানা)
মনে রাখা প্রয়োজন, সাবেকিয়ানা ও প্রথাগত বনেদিয়ানা এক নয়। বনেদিয়ানা শুধুমাত্র সম্ভ্রান্ত বংশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অন্যদিকে সাবেকিয়ানা হল সুবৃহৎ এক ধারণা, যাকে এলিটিজম কিংবা সংকীর্ণ শহুরে গণ্ডিতে বেঁধে রাখা যায় না।
বর্তমানে পুজো মানেই থিম। নবপ্রজন্মের একাংশ এটাকেই আনন্দ মনে করে। বাহারি প্যান্ডেল, শৈল্পিক কারুকাজ, ফিউশন, আর্ট ও সারারাতব্যাপী হপিং। তবে উত্তর আধুনিকতার যুগেও নিজের উপস্থিতি নিয়ে যথেষ্ট সচেতন সাবেকিয়ানা। আজও দুর্গা প্রতিমার ভরাট গোলপনা মুখ, কাঁচাসোনা রং মন ভোলায়। সটান বাঁশপাতা চোখ ভাসিয়ে দেয় ভাবের দুকূল। নস্টালজিয়া প্রিয় জাতি আমরা। স্মৃতিচারণেই যেন সুখ। নতুনের মাঝে চিরনতুনের এই সংলাপকে তাই ফিরে দেখব আজ। তবে তার আগে কিছুটা ইতিহাস দেখা যাক। কালীপ্রসন্নর ভাষায়, “দুর্গোৎসব বাঙ্গলা দেশের পরব, উত্তর পশ্চিম প্রদেশে এর নাম গন্ধও নাই”। এই পুজোর সূচনা ঠিক কবে থেকে তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। কিংবদন্তি অনুযায়ী বর্তমান বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ, আকবর বাদশাহের সময় বাংলায় প্রথম দুর্গাপুজোর প্রচলন করেন। সেই থেকে শুরু। এরপর কেটে যায় শতাধিক বছর। নদিয়ার সিংহাসনে তখন কৃষ্ণচন্দ্র। কথিত, তাঁর হাত ধরেই নাকি বাংলার ঘরে ঘরে জনপ্রিয়তা পায় দুর্গোৎসব। গবেষক অরুণ নাগের মন্তব্য এক্ষেত্রে বিশেষ লক্ষণীয়। তাঁর মতে, প্রাক-ঔপনিবেশিক যুগে দেশীয় রাজা ও জমিদাররা পুজো পার্বণে আড়ম্বর করতে ভয় পেতেন। পাছে নবাব টের পেলে যদি অধিক কর চাপায়, তাই অনেকেই সে পথ এড়িয়ে যেত। তবে সাহেবদের ক্ষেত্রে সে শঙ্কা ছিল না। ফলত কোম্পানি আমলে ঢালাও ব্যয় হয়। (থিমপুজো বনাম সাবেকিয়ানা)
শুরুতে একে অপরকে টেক্কা দেওয়াই ছিল বাবুদের প্রধান লক্ষ্য। কার পুজোয় কী কী আয়োজন তা নিয়ে রীতিমতো খবর বেরোত পত্রিকায়। এবছর অমুক বাবুর বাড়িতে তমুক বাঈজি নাচবে। খাদ্য তালিকায় রয়েছে ইত্যাদি, প্রভৃতি পদ। এসব তখন নিত্যনৈমিত্তিক। সে যুগে বাবুবাড়িতে আপ্যায়নের কোনও ত্রুটি হত না। ফলত ভাদ্র থেকেই দিন গোনা শুরু। কার কোথায় নিমন্ত্রণ হবে সেই নিয়ে যথারীতি চিন্তায় থাকত সাহেব মহল। দেখনদারির পাশাপাশি নিয়ম নিষ্ঠাতেও যথেষ্ট গুরুত্ব দিতেন বাবুরা। অনেকটা ওই ‘জাতে মাতাল, তালে ঠিক’। ষষ্ঠীর বোধন থেকে নৈবেদ্য, নবপত্রিকা স্নান, ভোগ রান্না কিংবা নীলকণ্ঠ ছেড়ে বিদায়প্রহর সবেতেই ছিল বিশেষ যত্ন। তবে সাতের দশক থেকে অনেকে ধুঁকতে শুরু করে। বাবুগিরির মশাল তখন স্তিমিত। ভঙ্গুর সেই সময়ে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে, ঐতিহ্যকেই আশ্রয় করেন তারা। যুগের সঙ্গে সেই ট্র্যাডিশন আজও বহমান। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, সাবেকিয়ানা ও প্রথাগত বনেদিয়ানা এক নয়। বনেদিয়ানা শুধুমাত্র সম্ভ্রান্ত বংশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অন্যদিকে সাবেকিয়ানা হল সুবৃহৎ এক ধারণা, যাকে এলিটিজম কিংবা সংকীর্ণ শহুরে গণ্ডিতে বেঁধে রাখা যায় না। (থিমপুজো বনাম সাবেকিয়ানা)
আমাদের ছোটোবেলায় থিমপুজোর চল সেভাবে শুরু হয়নি। তখন বাবা মা-র হাত ধরে ঠাকুর দেখতে যেতাম। অধিকাংশই বারোয়ারি, কোনও না কোনও ক্লাব আয়োজন করেছে। মূলত পাড়ার মোড় বা খোলা মাঠে মণ্ডপ বাঁধা হত। তেমন বাহার নেই। ছোটো প্যান্ডেল। তবে জমক ষোলো আনা। একচালার দেবী সাজগোজ করে চেয়ে আছেন ভক্তের দিকে। সঙ্গে সন্তানসন্ততি ও মহাদেব। হালকা ধুনোর ঘ্রাণে ছেয়ে থাকত প্রাঙ্গন। মাথা উঁচিয়ে আমরা ছোটোরা ঝাড়বাতি দেখতাম। সেই বিশাল কদমথোকায় কতই না মায়া! কতই না সুখ! আমাদের আগের প্রজন্মে এই ছাপ আরও স্পষ্ট ছিল। বাবা, কাকাদের মুখে সেসব বহু গল্প শুনেছি। (থিমপুজো বনাম সাবেকিয়ানা)
সাবেকিয়ানার মূল ভিত হল প্রথা। তবে অনাদিকাল ধরে চলে আসা এই নিয়ম, রীতি, ঐতিহ্য শুধুমাত্র শহরে সীমাবদ্ধ নয়। বর্তমানে নাগরিক জীবনে অভ্যস্ত অনেকেই সাবার্ব-কে বিশেষ গুরুত্ব দেয় না। মফস্সল তাদের চোখে ব্রাত্য; আর গ্রাম হলে তো কথাই নেই! সেটা আবার পুজো হল? এখানেই পিছিয়ে গিয়েছি আমরা। কলকাতামুখী বাঙালিয়ানার এই তীব্র ঝঙ্কার অনেকটা ঠুলি ঝুলিয়েছে চোখে। পূর্ব অনুমিত ধারণার ফলে আমরা কিছুতেই ভালোটা মানতে চাই না। অবশ্য মানা না মানায় কী বা এসে যায়! তথাকথিত ‘প্রান্তিক’রা তাদের মতো দিব্যি আছে। পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত গ্রাম অথবা বাঁকুড়ার কোনও অখ্যাত পুজোয় হয়তো ব্যানার পড়ে না, কভারেজ হয় না, তবে দেবীমাহাত্ম্য সেখানেও এক। শরৎের খোলা আকাশ, কাশবন, সহজ পাঠের মতো ঘরবাড়ি- এই প্রতিটা রন্ধ্রেই বাঙালিয়ানা ভরপুর।
বাংলায় থিমপুজোর প্রচলন বিগত কয়েক দশক ধরে। সেখানে প্রতিমার সঙ্গে মণ্ডপসজ্জাতেও সমান গুরুত্ব দেন শিল্পীরা। তবে শুরুতে মণ্ডপ হলেও, ক্রমশ যুগের সঙ্গে বহু আঙ্গিক তাতে যুক্ত হয়েছে। ১৯৯০-র দশক থেকে বিশ্বব্যাপী এক বিপুল বদল ঘটে। সোভিয়েত পতনের সঙ্গে দৃঢ় হয় পুঁজিবাদ। পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তের মতো উদারীকরণের সেই অভিমুখ আমাদের এখানেও আসে। প্রতিবছর পুজোয় কয়েক লক্ষ মানুষের সমাবেশ হয়। অর্থনীতির চোখে এরা সকলেই ক্রেতা। ফলত বাজার নিয়ন্ত্রণে ঝাঁপিয়ে পড়ে খ্যাত, অখ্যাত ব্র্যান্ডরা। এখন কী শহর, কী বা মফস্সল! সবেতেই হোর্ডিং-এ হোর্ডিং-এ ছয়লাপ। মাসখানেক আগে থেকে বাঁশ বাঁধা শুরু আর পুজো আসতেই হঠাৎ প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন শঙ্খবাবু- “মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে।”
সমাজ সচেতনতায় থিমের অবদানকে কখনোই খাটো করা যায় না। তবে একঘেয়েমি বালাই ষাট! যতই হোক, প্রাণের উৎসব বলে কথা। সেখানে আজও সাবেকিয়ানাই পথ ও পাথেয়। ইন্সটা অ্যালগোরিদম থেকে ফেসবুক রিল, সবেতেই সমান জনপ্রিয় বাংলার সাবেকি আয়োজন।
পুজো কমিটিগুলোর কাছে স্পন্সরশিপের অসীম গুরুত্ব। ব্যানার থেকে উঠে আসা প্রভূত অর্থ তারা বিনিয়োগ করে সাজসজ্জায়। যত বেশি দর্শক, যত বেশি লাভ। বিষয়টা লুপের মতো। ফলত দর্শক ধরে রাখার ক্ষেত্রে বিশেষ বিস্ময় প্রয়োজন। এই চমকের শূন্যস্থানই পূরণ করে থিম। রকমারি ঝলক দেখিয়ে আকর্ষণ করা হয় দর্শকদের। দুর্গার চিন্ময়ী রূপের সঙ্গে, আমরা অবাক হয়ে চেয়ে দেখি সামুদ্রিক তলদেশ। সেখানে কত রংচঙে মাছ, কোথাও আবার ট্রেন, বিমান, যুদ্ধগ্রস্থ পৃথিবী, বিজ্ঞানের অগ্রতা অথবা নারী নির্যাতনের দগদগে ঘা। সমাজ সচেতনতায় থিমের অবদানকে কখনোই খাটো করা যায় না। তবে একঘেয়েমি বালাই ষাট! যতই হোক, প্রাণের উৎসব বলে কথা। সেখানে আজও সাবেকিয়ানাই পথ ও পাথেয়। ইন্সটা অ্যালগোরিদম থেকে ফেসবুক রিল, সবেতেই সমান জনপ্রিয় বাংলার সাবেকি আয়োজন। এমনকি জেনজি-র কাছেও। সেই কভারেজ নিতে মিডিয়া ছুটে যায় এক শহর থেকে অন্য শহর, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। আজও বহু মানুষ সেসব ঘরে বসে দেখেন। করজোড়ে নিবেদন করেন শ্রদ্ধা। এছাড়া কুমোরটুলির ফটোশ্যুট তো আছেই।
সেকেলে ঐতিহ্য থেকে আজকের অ্যাস্থেটিক্স, দুটোকেই সমান তালে বজায় রেখেছে সাবেকিয়ানা। অটুট রেখেছে জাতির শেকড়। তাই অহেতুক সংঘাত নয়, বরং মেলবন্ধনই হওয়া উচিত মূলমন্ত্র। থিম কাঠামো হলে, সাবেকিয়ানা তার ভিত। থিম দেহ হলে, ঐতিহ্য আমাদের স্পন্দন। তাই তো আজও বাঙালি আবেগ-প্রবণ। “ক্রমে দেখতে দেখতে দিনমণি অস্ত গ্যালেন, পূজোর আমোদ প্রায় সম্বৎসরের মত ফুরালো! ভোরাও ওক্তে ভয়রোঁ রাগিণীতে অনেক বাড়ীতে বিজয়া গাওনা হলো। ভক্তের চক্ষে ভগবতীর প্রতিমা পরদিন প্রাতে মলিন মলিন বোধ হতে লাগলো, শেষে বিসর্জনের সমারোহ সুরু হলো,- আজ নিরঞ্জন।”
__________________
হুতোম প্যাঁচার নক্শা থেকে সংগৃহীত বাক্যগুলির বানান অপরিবর্তিত থাকল

