
বাংলার একটি প্রত্যন্ত গ্রাম, শরৎকাল, দুর্গাপুজো। খড়ের ছাউনি দেওয়া মাটির মন্দির। মন্দিরের উঠোনে পুজোর দিন-পনেরো আগে মাটিতে গর্ত করে ষষ্ঠীপুজো হতো, গারা ষষ্ঠী। সেদিন সন্ধেবেলা আমরা পাটকাঠির মশাল জ্বালাতাম, অন্ধকার বাঁশবনের ধারে আগুনের আলোয় নাচত আসন্ন দুর্গাপুজোর আনন্দ। গুরুজনেরা শৈশবে আমাদের হাতে আনন্দের মশাল দিতে পেরেছিলেন। কুসংস্কার কথাটা খুব একটা প্রচলিত ছিল না, ঠাকুমার কাছে শুনেছিলাম ভালো ভূতের গল্প, গরিব মানুষকে যে সোনার থালায় ভাত বেড়ে দিত। আমাদের তখন যৌথ পরিবার। গ্রামের তিনদিক পুকুর দিয়ে ঘেরা- লক্ষীসায়র, পাল পুকুর, বনের পুকুর, নতুন পুকুর, ধরম পুকুর, বাঁধা ঘাট, শিব গড়ে, চাঁদের গড়ে, মাঠ পুকুর, বাঘের পুকুর। পশ্চিমে শাল-মহুয়া-পিয়ালের বন, চৌপাহাড়ি। হালসিডাঙা, শ্রীচন্দ্রপুর, সাহেবডাঙা আমাদের প্রতিবেশী গ্রাম। উমাপদ, ঊষারানি, অভয়পদ, মুক্ত পাল, পাতু মাল, শ্রীধর, চক্রধর, রামশঙ্কর, রামকিঙ্কর, গঙ্গাধর, বনমালী, শ্রীদাম রায়, অনিমা, লীলাবতী, সত্যরানী, শান্তিরানী, গুরুদাসি, শিবদাসী এরা সকলে সকলের আত্মীয়।
বর্ষায় ক্ষতিগ্রস্থ বাড়িগুলির সারাইয়ের কাজ শুরু হত শরতে, উপলক্ষ্য দুর্গাপুজো। মাটির বাড়ির প্রাচীন প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষিত মানুষেরা সকলে ব্যস্ত হয়ে যেত। সাঁওতাল মেয়েরা তাদের তৈরি স্থানীয় কুচি ঘাসের ঝাঁটা আর জঙ্গলের গভীর স্তর থেকে রাঙামাটির তাল সংগ্রহ করে অসাঁওতাল পাড়ায় পৌঁছে দিত।

বর্ষায় ক্ষতিগ্রস্থ বাড়িগুলির সারাইয়ের কাজ শুরু হত শরতে, উপলক্ষ্য দুর্গাপুজো। মাটির বাড়ির প্রাচীন প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষিত মানুষেরা সকলে ব্যস্ত হয়ে যেত। সাঁওতাল মেয়েরা তাদের তৈরি স্থানীয় কুচি ঘাসের ঝাঁটা আর জঙ্গলের গভীর স্তর থেকে রাঙামাটির তাল সংগ্রহ করে অসাঁওতাল পাড়ায় পৌঁছে দিত। ভিজে দেওয়ালের খড়িমাটি, শিউলি ফুল, গরম গুড়, খইয়ের নাড়ু সব মিলিয়ে তৈরি হতো দুর্গাপুজোর নিজস্ব গন্ধ। বিনোদন বলতে লেটো অথবা গ্রামের কেষ্ট-যাত্রা দলের অভিনয়। দুর্গাপুজো উপলক্ষ্যে বছরে এই একবার নতুন পোশাক কিনে দিতেন আমাদের অভিভাবকেরা। স্বল্প আয়োজনের মধ্যে অপূর্ব শূন্যতা থাকে, সেই শূন্যতা আনন্দে পূর্ণ ছিল আমাদের শৈশবের দুর্গাপুজোয়।

ঘাটের একপাশে শালুকের পরিবার, স্বচ্ছ জলে খলসে মাছের রঙিন আনাগোনা। সবুজ কলমি লতার বিছানায় ডাহুক, শরীরে তার নৃত্যের চলন। জলের উপর জলপিপির ম্যাজিক দৌড়। আদাড়ে বাদাড়ে বাসক অপরাজিতার ঝোপ। সকালবেলার রাস্তা, আঙুলের ফাঁকে শিশির ভেজা লাল ধুলো। বনের ধারে শুভ্র তুষারের মতো দীর্ঘ কাশের রেখা। বালিকার আঁচলে বালকের একমুঠো শিউলি। ইস্কুল ছুটি, আকাশে শান্ত মেঘ, নিচে আগাছা মুক্ত আমাদের পাড়া, আমরা উৎসাহে চঞ্চল। ভোরবেলা ফুল তোলার আনন্দে আমাদের পরাগ মাখা আঙুল। পুকুরে সকালের সূর্য আর বাবলা গাছের প্রতিচ্ছবি, মায়ের চুলে সুগন্ধি তেল, দুর্গাপুজো।
বমায়েদের সুতির ছাপা শাড়ি, দুর্গাকে বরণ করবে তারা। ছোট্ট পালকির মতো দেখতে, আমরা বলি দোলা। গ্রামের দীঘি থেকে দুইজন বালকের কাঁধে ভর করে দোলায় আসেন আমাদের দুর্গা।

মূর্তি নয়, একটুকরো কাগজে আঁকা দুর্গার মুখ, ছোট্ট কাঠের সিংহাসনে লালপেড়ে সাদা শাড়ি জড়ানো দুর্গা। আমাদের নবপত্রিকার পুজো। আগের দিন সন্ধ্যায় সন্ন্যাসী জেঠু ঢোল নিয়ে আসত, বাংলা ঢোল। পুজোর চারদিন পর নিরীহ ভালো মানুষটি, রঙিন জামা পরা ঢোলটিকে বাঁ কাঁধে রেখে সবুজ ধান ক্ষেতের মধ্যে, এ আল থেকে সে আলে যেতে যেতে মিলিয়ে যাবে, এই ক্ষীণ দুশ্চিন্তাটুকু সীমাহীন আনন্দের মাঝে মনের মধ্যে যখন তখন উঁকি দিত। পুকুরে সাঁতার, চান করে ঘরে ফেরা, নতুন জামা। মায়েদের সুতির ছাপা শাড়ি, দুর্গাকে বরণ করবে তারা। ছোট্ট পালকির মতো দেখতে, আমরা বলি দোলা। গ্রামের দীঘি থেকে দুইজন বালকের কাঁধে ভর করে দোলায় আসেন আমাদের দুর্গা। মন্দিরের উঠোনে এলে গুরুজনেরা বালকের পা ধুইয়ে দেয়, তাদের লজ্জা লাগে, তবে দ্রুত বড়ো হওয়ার স্বপ্ন কিছুটা সার্থক হয়। ধান গাছ, মানকচু পাতা, গাছ সমেত হলুদ, জোড়া বেল, কলা গাছের বাকল, অশোক ডাল, অপরাজিতার লতা ইত্যাদি পুজোর জোগার এনে দিত পাতু মাল। গ্রামের চৌকিদার জগা বাউড়ি আমপল্লবের মালা আর কলাগাছ দিয়ে সাজিয়ে দিত মন্দির। চণ্ডী কামার যেই উঠোনে আখ বলি দিত, আখের গোড়ার দিকটা পাওয়ার জন্য আমরা ঝাঁপিয়ে পড়তাম, দুর্গাপুজোর ছলে প্রকৃতিপূজা ও কৃষি সভ্যতার উদযাপন হতো মাটির মন্দিরে। মা ঠাকুমারা উৎসাহী হয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন। প্রাণভরে পাত পেড়ে খেত কত লোক। বিজয়ায় প্রণাম আর আলিঙ্গনে, ঝগড়া অভিমান সব মুছে যেত। দুর্গার বিদায়, মনখারাপের উঠোনে আসবে আদিম নাচের দল, পরিবারের শুভ হবে। দাসাই, ময়ূরের পালক হাতে সাঁওতালি নাচ, এ নাচে মেয়েরা অংশগ্রহণ করে না। ওদের গ্রাম আমখই। নব্বই-এর দশক, আমাদের দুর্গার ছিলো এমনি এক প্রকাণ্ড যৌথ পরিবার।
_________
ছবি-ঋণ: মনীষা কর্মকার

