শারদীয়া দুর্গাপুজো আদতেই ছকভাঙা, ‘থিম’ ও ‘সাবেকি’ দ্বন্দ্ব বৃথা

উত্তম-সৌমিত্র, সৌরভ-ধোনি, মেসি-রোনাল্ডো… এরকম আরও অজস্র বিচিত্র— না, জুটি নয়, কে সেরা তার লড়াই। কথায় আছে বাঙালি তর্কপ্রিয় জাতি, সে ভালোই, কিন্তু সেই তর্ক বেশিরভাগ সময়েই রূপ নেয় এঁড়ে তর্কের। উল্লিখিত ব্যক্তিজোড়দের মধ্যে কে সেরা, তার বিচারও একরকমে তা-ই। এই লিস্টিতে নব্য সংযোজন— সাবেকিপুজো-থিমপুজো। ওই ডুয়েলগুলির মতো এই ডুয়েলটিরও কোনো মানে নেই। আদতে ‘সাবেকি’ ও ‘থিম’ দুটি শব্দই বেশ গোলমেলে। মোটের ওপর ‘থিম’ বলতে বোঝায় একটা বিষয়, ‘সাবেকি’ বলতে বোঝায় যা আদি বা সনাতন। দেবীমূর্তির মধ্যেই তো একটা ‘থিম’ বা বিষয় রয়েছে— দুর্গতিনাশ বা অসুরনাশ ব্যাপারটাই সেই ‘থিম’। আবার সেই থিমের মূর্তিরও রয়েছে রকমভেদ। অষ্টভুজা, দশভুজা, চতুর্ভুজা, অষ্টাদশভুজা, সহস্রভুজা আবার দ্বিভুজা— কখনও তিনি মহিষমর্দন করছেন, কখনও মহিষের কাটা মাথা থেকে বেরিয়ে আসা অসুরকে বধ করছেন (এর মধ্যে মুশকিল করেছে মহাভারত; সেখানে মহিষাসুর বধ করছেন দুর্গা নয়, স্কন্দ, অর্থাৎ কার্তিক)। দেবীর বাহন সিংহ কখনও ঘোড়ামুখী, কখনও নয়। দেবীর গায়ের রং নিয়েও মতভেদ আছে, কোন হাতে কোন অস্ত্র থাকবে তারও কোনো একটাই স্থির নির্দেশ নেই। কাজেই এত বিচিত্র মূর্তির মধ্যে কোনটিকে ধরব সাবেকি? কোনটি সনাতনী? এমনকি, সাবেকি বলতে কোন যুগটাকে ধরব, সেও আর-এক গণ্ডগোল। বৈদিক যুগ, না পৌরাণিক যুগ? যদি বৈদিক যুগ ধরি, তাহলে বলতে হয়, পুজো জিনিসটাই বৈদিকদের সংস্কৃতিতে ছিল না; ছিল যজ্ঞ, পরে এসে মিশল পুজো, পুজো অবৈদিকদের। সেই বেদে দুর্গার কোনো কথাই নেই, সেখানে পুরুষ দেবতার প্রাধান্য; তবে পাব ঊষার কথা। পৌরাণিক যুগে এসে এই ঊষার ধারণা মিশে যায় মহাদেবীর তত্ত্বে; আরও কত বিচিত্র ব্যাপার যে এসে মেশে, সেসব বলতে শুরু করলে লেখা অনাবশ্যক স্ফীত হতে থাকবে। অতএব, সহি ‘হিন্দু’ কারা? বৈদিক না অবৈদিকরা? বেদ, রামায়ণ বা মহাভারত কোথাও একবারের জন্যও ‘হিন্দু’ শব্দটির টিকি খুঁজে পাওয়া যাবে না। এসব অ—নেক পরের। তাও ‘হিন্দুত্ব’-এর কোনো সবিশেষ আদি সনাতন রূপ নেই। এটাই ভারতবর্ষের সৌন্দর্য, ভারত তাই অনন্য।

দেবীমূর্তির মধ্যেই তো একটা ‘থিম’ বা বিষয় রয়েছে— দুর্গতিনাশ বা অসুরনাশ ব্যাপারটাই সেই ‘থিম’। আবার সেই থিমের মূর্তিরও রয়েছে রকমভেদ। অষ্টভুজা, দশভুজা, চতুর্ভুজা, অষ্টাদশভুজা, সহস্রভুজা আবার দ্বিভুজা—

এ দেশের সংস্কৃতি সংমিশ্রণের সংস্কৃতি। ‘দুর্গা’ কোনো একক দেবীও নন, এর মধ্যে মিশে আছে সেই কবেকার আকাশ ও ভূমিপ্রকৃতির ধারণা, বেদে যাকে বলছে দৌ আর দাব্যা। পুজোয় মিশে আছে বিভিন্ন লৌকিক আচার, শস্যপূজা। নবপত্রিকা ব্যাপারটিই শস্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাছাড়া শারদীয়া দুর্গাপুজো আদতেই ছকভাঙা, কারণ শরৎকাল দেবতাদের ঘুমের কাল, সূর্যের দক্ষিণায়ন। সেখান থেকে এল বোধনের ধারণা। লক্ষণীয় যে, বাসন্তী পুজোয় বোধন নেই, কারণ তখন স্বাভাবিকভাবেই দেবতাদের জাগরণ। শারদীয়া পূজায় কৃত্তিবাসের ‘শ্রীরাম পাঁচালি’র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে, একটা গোটা অধ্যায়ই ‘অকালবোধন’ নিয়ে। সংস্কৃত রামায়ণে তা নেই। কৃত্তিবাস বাংলার কবি, শ্রীরাম পাঁচালির রাম বাঙালির রাম। এর মধ্যে কোনটা সনাতনী? গঙ্গার জলধারা থেকে যমুনার জল আলাদা করা যায়?

দুর্গামূর্তির মধ্যেও এসে মিশেছে নানান ধারা। মহিষমর্দিনী আর দুর্গা হুবহু এক নন (একজন মহিষ বধ করেন, অন্যজন দুর্গমাসুর), পার্বতী আর দুর্গাও এক নন, উমা আর দুর্গা এক নন, দুর্গা আর চণ্ডীও এক নন। অথচ আজ কীভাবে সব মিলেমিশে গেছে, একেবারেই আলাদা করা যায় না। এর মধ্যে কোনটা আদি? কোনটা অনাদি? সব ঘেঁটে ঘ। মার্কণ্ডেয় চণ্ডীর মধ্যে পাই কয়েকটি আশ্চর্য স্তোত্র, যার প্রথম কথাটিই হল— যাঃ দেবী সর্বভূতেষু… অর্থাৎ যে দেবী সর্বভূতে বিভিন্ন রূপে আছেন ইত্যাদি ইত্যাদি। এই ব্রহ্মাণ্ডের সবকিছুর মধ্যে, আকাশের নক্ষত্র থেকে ঘাসের কণা, সবেতেই তাঁর উপস্থিতি। দেবী ব্রহ্মস্বরূপা। তাঁকে কল্পনায় রূপ দিয়েছে মানুষ, গড়ে উঠেছে মূর্তি। এই বিশ্বের প্রকাশশক্তি তিনি। তাঁর কোনো একটাই বিশেষ মূর্তি হয়? মার্কণ্ডেয় চণ্ডী দেবীর কয়েকটি রূপের কথা বলেছেন বটে, মূর্তি পরিচয় দিয়েছেন স্মার্ত রঘুনন্দন, বৃহৎ তন্ত্রসারে কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ, কিন্তু রূপ কি শুধু ওই একটা যুগেই থেমে থাকবে? দেবীকে যদি মনে করি শাশ্বত, তাহলে কোনো বিশেষ যুগ বা বিশেষ শাস্ত্র দিয়ে তাঁকে বাঁধা সম্ভব? কাজেই শাস্ত্রে বর্ণিত কোনো-এক রূপের সঙ্গে যদি আধুনিক শিল্পী তাঁর নিজের মনের মাধুরী মেশান, তাতে দেবীর কোনো ক্ষতি হয়? অরূপা অনন্ত শক্তিকে যেকোনো রূপে কল্পনা করা যায় না কি? তিনি তো নানারূপ ধারণ করে বিভিন্ন কল্পে বিভিন্ন অসুরদের বধ করেছেন; আজকের যুগেও দেখি অসুরদের রূপ নিয়ত পাল্টে পাল্টে যাচ্ছে, দেবীও কি কেবল তাঁর একটাই রূপে পড়ে থাকবেন? মর্ত্যের অসুরদের শায়েস্তা করতে দেবী কি মানবী হয়ে উঠবেন না? চণ্ডী বলছেন, তিনি সর্বভূতে শান্তিরূপে এবং দয়ারূপেও বিরাজ করেন, সেই রূপ ধারণ করলে তখন তাঁর হাতে অস্ত্রের প্রয়োজন কী; তিনি তখন অভয়দাত্রী অভয়া। আবার মাতৃরূপে বিশ্বের সমস্ত শিশুকে কোলে তুলে নেন, বাস্তুহারাদের সঙ্গে এসে দাঁড়ান এক পথে, তাঁদের ত্রাণ করেন। কখনও মানুষ ভ্রান্তিবশত তাঁকেই বাস্তুচ্যুত করে, এই ভ্রান্তির কারণও তো তিনিই— ভ্রান্তিরূপেণ সংস্থিতা! এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে যাচ্ছে, ২০১৭-এর নলিন সরকার স্ট্রিটের অনাথ আশ্রমের ভাবনাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মণ্ডপ, ২০২০-২১-এর বড়িশা ক্লাবের পুজোয় তুলে ধরা দেশভাগের করুণ চিত্র, এবং গতবছর ২০২৫-এর বেহালা ফ্রেন্ডসের পুজোয় যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার ছবি। প্রতিটি মণ্ডপেই মাতৃমূর্তির ভাবনা ছিল অতুলনীয়। ধর্ম যখন মানুষের চিন্তার মুক্তি ঘটাতে শিল্পের হাত ধরে তখন তার নবজন্ম হয়।

ধর্মকে এতটা প্রকাণ্ড হওয়া চাই, যে সে আস্তিক নাস্তিক সকল শিল্পীকে তাদের কল্পনার অকল্পনীয় স্বাধীনতা দিতে পারে; শাস্ত্রের গণ্ডী ছাড়িয়ে তার আরাধ্যমূর্তির মধ্যে নিশ্বাস ফেলতে পারে আধুনিক কাল! আর তা যদি না হয়, ধর্ম যদি তার গতিপথ পাল্টাতে পাল্টাতে, প্রসারিত আধুনিক না হয়ে ওঠে তবে অচিরেই তাকে ঘিরে ধরে অজস্র শ্যাওলা, জীর্ণ লোকাচার; মানুষকে মুক্ত করার বদলে সে তখন মানুষকে কষে বেঁধে কেবলই মারতে থাকে। সে হয়ে ওঠে অসহিষ্ণু রক্তচোখ মাস্টার।

এবার একটু দেখি মার্কণ্ডেয় চণ্ডীতে দুর্গার পরিচয় কী। দেবী সেখানে শিবের বনিতা পার্বতী নন, তিনি বিষ্ণুমায়া। শিব অন্যান্য দেবতাদের মতোই তাঁর নিজের শূল দান করছেন মাত্র। চণ্ডী কখন লেখা হচ্ছে, শিব কখন জুড়ে যাচ্ছে দেবীর সঙ্গে, ইতিহাসবোধসম্পন্ন পুরাণবিদের গবেষণা থেকে তা পাওয়া যাবে। শুধু এটুকু মাথায় রাখলেই হবে যে পুরাণও যুগে যুগে রূপ পালটেছে। কোনোটাই আদি রূপে প্রায় নেই। শিবপুরাণ কালিকাপুরাণ অনেক পরের রচনা, যেখানে কালী বা শিব প্রধান হয়ে উঠবেন। মার্কণ্ডেয় চণ্ডীতে কালী চণ্ডীর রুষ্ট কপাল থেকে বেরিয়ে আসা আলাদা এক দেবী, প্রধান দেবী একেবারেই নন। আর-একটা বিষয় খেয়াল করার মতো, মার্কণ্ডেয় চণ্ডীতে কোথাও দেবীর নাম ‘উমা’ বা ‘দুর্গা’ নয়, চণ্ডী বা চণ্ডিকা। শুধু দু-একটা শ্লোকে দুর্গতি বা সংকটনাশিনী অর্থে ‘দুর্গা’ ব্যবহার করা হয়েছে। যেগুলোর মধ্যে আমাদের চেনা শ্লোকটি হল— “দুর্গায়ৈ দুর্গপারায়ৈ সারায়ৈ সর্বকারিণ্যৈ / খ্যাত্যৈ তথৈব কৃষ্ণায়ৈ ধূম্রায়ৈ সততং নমঃ”। দুর্গার উল্লেখ কিছু জায়গায় থাকলেও উমার উল্লেখ একেবারেই নেই, যেমন তিনি শিবের পত্নী নন, তেমনই হিমালয়ের কন্যাও নন, হিমালয় কেবল দেবীকে সিংহবাহন দান করছেন। ‘পার্বতী’ কথাটা সেখানে ব্যবহৃত হয়েছে পর্বতবাসিনী অর্থে। এখানে আরও দু-রকম দেবীর কথা আমাদের মনে পড়ে। বিন্ধ্যবাসিনী ও বনদুর্গা। বনদুর্গা শবরদের আরাধ্যা। মদমাংস সহযোগে বনদুর্গার আরাধনায় মেতে ওঠে শবররা। এই বনদুর্গাই আবার কিছুটা বদলে মুসলমানদের আদরের বনবিবি। আগেই বলেছি, এই সব রূপ এখন এক মহাদেবীতে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।

আঠারো শতকের কবি রামপ্রসাদের বিখ্যাত আগমনী গান আমরা সবাই জানি, বিশ শতকের রামকুমার চট্টোপাধ্যায় তাকে আরও বিখ্যাত করে দিয়েছেন। ‘এবার আমার উমা এলে আর উমারে পাঠাব না।’ পু্রো গানটা হল—

এবার আমার উমা এলে/ আর উমায় পাঠাব না৷/ বলে বলুক লোকে মন্দ/ কারো কথা শুনব না৷/ যদি এসে মৃত্যুঞ্জয়/ উমা নেবার কথা কয়/ মায়ে ঝিয়ে করব ঝগড়া/ জামাই বলে মানব না৷

মহিষমর্দিনীর রূপ ছেড়ে চণ্ডী হয়ে উঠলেন উমা— বাঙালির ঘরের মেয়ে। মেয়েকে নিতে এলে শিবের সঙ্গে ঝগড়া করবে মা। কী আস্পর্ধা! হ্যাঁ, এই আস্পর্ধা বাঙালি কবি দেখিয়েছেন। মহাকবি কালিদাসের উমা-মহেশ্বরের দাম্পত্যভাবনাকে ধারণ করে কবি আমাদের শোনালেন বাঙালির নিজস্ব আগমনী-বিজয়ার গান। এই গান শুনে কি কোনো ‘সনাতনী’ দুর্গার রূপ মাথায় আসে? ছোটোবেলায় ঠাকুমা বলত, লক্ষ্মী সরস্বতী কার্তিক গণেশ এরা সবাই মায়ের সঙ্গে মামাবাড়ি ঘুরতে আসে। এইখানে এসে আর এই দেবদেবীরা কেবল ‘হিন্দু’ হয়ে থাকেন না, হয়ে ওঠেন সর্বজনীন। কিন্তু আমরা জানি, লক্ষ্মী সরস্বতী দেবীরই অংশ। এমনকি কার্তিকও ঠিক দেবীর সন্তান নন, চণ্ডীতে একস্থানে দেবীর ময়ূরবাহনা কৌমারী রূপের কথা আছে, অর্থাৎ মহাদেবী দেবসেনাপতি কার্তিকেরও শক্তি। কিন্তু বাঙালি-কবি সব হিসাব উল্টে দিচ্ছেন। শশিভূষণ দাশগুপ্ত লিখছেন— “বাঙালি কবিগণ বৈষ্ণবই হোন, আর শাক্তই হোন, মূলে সকলেই মধুর-রসের উপাসক।……মাতৃদেবীর ইতিহাসে পার্বতী উমার একটি বিশিষ্ট ধারা, অসুরবিনাশী দেবীর আর-একটি পৃথক ধারা। পৌরাণিক যুগেই এই দুই ধারা একত্রে মিশ্রিত হইয়া একাকার হইয়া গিয়াছে। বাঙালি কবিগণ ঐতিহ্যসূত্রে মায়ের এই মিশ্ররূপকেই প্রাপ্ত হইয়াছেন। কিন্তু একটু লক্ষ করলেই দেখিতে পাইব, জল ও দুগ্ধের মিশ্রণের ভিতরে হংস যেমন দুগ্ধকেই পান করিবার চেষ্টা করে, বাঙালির কবির মনোহংসও তেমনই ভাবে মায়ের মধুররূপিণী ও ভয়ংকরী মূর্তির মিশ্রণ হইতে সহজাত প্রবণতাবশে মধুররূপিণীকেই বাছিয়া আস্বাদন করিবার চেষ্টা করিয়াছে, মাকে লইয়া বাংলাদেশের জনমনেরই যেন এই মধুর-রসের দিকে ঝোঁক। তাই দেখি, বাংলাদেশের প্রসিদ্ধতম মাতৃপূজার উৎসব শারদীয়া দুর্গোৎসবকে পণ্ডিত-মহলে বা উচ্চকোটি-মহলে যতই মার্কণ্ডেয় ‘চণ্ডী’র সহিত যুক্ত করিয়া অসুরনাশিনী দেবীর পূজা-মহোৎসব করিয়া তুলিবার চেষ্টা হোক না কেন, বাংলার জনমানস মার্কণ্ডেয় চণ্ডীর তেমন কোনো ধার ধারে না। জনগণ প্রতিমায় দেবীকে অসুরনাশিনী মূর্তিতে দেখেন— কিন্তু ওই পর্যন্তই; তাহার পরে তাহারা স্থির-নিশ্চিতরূপে জানেন, আসলে আর কিছুই নয়— উমা মায়ের স্বামিগৃহ কৈলাস ছাড়িয়া বৎসরান্তে একবার কন্যারূপে পুত্র-কন্যাদি লইয়া বাপের বাড়ি আগমন। তিন দিনের বাপের বাড়ির উৎসব-আনন্দ— তাহার পরেই আবার চোখের জলে বিজয়া— স্বামীর গৃহে প্রত্যাবর্তন। গণমানসের এই সত্যকে অবলম্বন করিয়াই তো আমাদের এত ‘আগমনী-বিজয়া’-সংগীতের উদ্ভব।”

আর্টের মূর্তি পুজো হয় না, প্রতিটি মণ্ডপে আর্টের মূর্তির পাশে একটা প্রচলিত মূর্তি থাকে, সেটাই পুজো হয়। দুর্গাপুজো উৎসব হতে পেরেছে বলেই তা বিশ্বজনীন, ভারতের শ্রেষ্ঠ উৎসবগুলোর মধ্যে একটা অনন্য দৃষ্টান্ত। তাই উদার না হতে পারলে নিজের ‘ভারতীয়’ বা ‘হিন্দু’ পরিচয় অর্থহীন।

এখন মজাটা হচ্ছে, রামপ্রসাদ তো একরকমভাবে বাঙালি মেয়ের আগমনী লিখলেন, কিন্তু সেই একই গান পালটে গেল আধুনিক কবির হাতে পড়ে। এখানেই আর্ট বা শিল্পের মাহাত্ম্য—

এবার আমার উমা এলে/ আর উমারে পাঠাব না।/মা আমার কৈলাসেতে পায় না খেতে/চিনেবাদাম ঘুগনিদানা।/ সেথা নাইকো ইলিশ তপসে মাছ/ নোলায় ঝরে জল,/ ল্যাংড়া বোম্বাই আমের আকাল/ নাইকো গাবের ফল।/ নাই বায়োস্কোপ, নাই থিয়েটার/ নাইকো গোরার বাজনা।/ এই শহরে রেখে তারে ইংরাজি পড়াব,/ বাঘ সিংহী ছাড়িয়ে তাকে/ মোটরে চড়াব।/ সে যে কেমন মায়ের কেমন মেয়ে/ এইবারেতে যাবে জানা।

এই অসামান্য গানটিও গেয়েছেন রামকুমার চট্টোপাধ্যায়। এবার এই গানকে যারা ‘অ-শাস্ত্রীয়’ বলে দেগে দেবে, তারা মিউজিয়মে স্থান পাক। মুশকিলটা হচ্ছে শিল্প সকলের জন্য, তবে শিল্পে সকলের অধিকার জন্মায় না, আর যাদের জন্মায় না তারাই কিছু একটা দেগে দেয়, ফতোয়া জারি করে, অথবা ফতোয়াকে মান্যতা দেয়। এরাই আসলে ভারতীয় সংস্কৃতির পরিপন্থী। মূর্তিপূজা নিয়ে আর-একটা কথা বলে রাখা ভালো, কোথাও কোনো আর্টের মূর্তি পুজো হয় না, প্রতিটি মণ্ডপে আর্টের মূর্তির পাশে একটা প্রচলিত মূর্তি থাকে, সেটাই পুজো হয়। দুর্গাপুজো উৎসব হতে পেরেছে বলেই তা বিশ্বজনীন, ভারতের শ্রেষ্ঠ উৎসবগুলোর মধ্যে একটা অনন্য দৃষ্টান্ত। তাই উদার না হতে পারলে নিজের ‘ভারতীয়’ বা ‘হিন্দু’ পরিচয় অর্থহীন। আর যারা উদার নয়, এ দেশের এ রাজ্যের যতটুকু যা নিজস্ব আছে, তা ধ্বংস করতে চায়, তাদের প্রতিরোধ করবার সময় এসে গেছে।

______________
ঋণ: ভারতের শক্তি-সাধনা ও শাক্ত সাহিত্য, শ্রী শশিভূষণ দাশগুপ্ত | দুর্গোৎসব শারদীয় কেন?- সুকুমার সেন | দুর্গাপূজায় বোধন কেন, সুকুমার সেন

Written by
Developed by DXDasia