রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, যা ভারত আজ ভুলে গিয়েছে

প্রসঙ্গ : রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক জাগরণ

ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অহিংস প্রতিবাদ আইন অমান্য আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল মহাত্মা গান্ধির নেতৃত্বে ডান্ডি অভিযানের মাধ্যমে। চলেছিল ১৯৩০ থেকে ’৩৪ পর্যন্ত।

ইতিহাসের পাতায় খোদিত আছে সেই ঘটনা। কিন্তু নাগরিক আনুগত্য কার্যকরি আন্দোলনে পরিণত হওয়ার কয়েক দশক আগে, ১৮৮৪ সালে এক যুবক কলকাতার এক ব্যক্তিগত সভায় একটি লেখা পড়েছিলেন। বছর তেইশের সেই যুবক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কিছুদিন আগেই, ৬ অগাস্ট আমরা যাঁর মৃত্যুবার্ষিকী পালন করেছি।  

সরকার আমাদের একের পর এক বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কারণে মনে হতে পারে আমরা লাভবান হচ্ছি। কিন্তু আমাদের অগোচরে যে অজানা ক্ষত তৈরি হয়েছে তার খোঁজ নেবে কে?

বক্তৃতার একটি অনুচ্ছেদে, তিনি লিখেছিলেন: “সরকার আমাদের একের পর এক বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কারণে মনে হতে পারে আমরা লাভবান হচ্ছি। কিন্তু আমাদের অগোচরে যে অজানা ক্ষত তৈরি হয়েছে তার খোঁজ নেবে কে? আমরা কি প্রায়শই এই বলে চিৎকার করি না, যে ‘ভিক্ষাবৃত্তির জয় হোক’? যে কোনও ভাবে আন্দোলন চালিয়ে যান সেই সঙ্গে কাছের লোকেদের কাছে সরাসরি বার্তা পৌঁছে দিন; …নিজে শিক্ষিত হোন, কাছের মানুষদের শিক্ষিত করুন।”

বিশ শতকের প্রথম দিকে কারোর এমন অনুভূতি আশ্চর্যজনক মনে হতে পারে। এর পরবর্তী বছরগুলিতে অসহযোগিতা এবং নাগরিক অবাধ্যতার মনোভাবকে আরও মজবুত করেছিল। ‘স্বদেশী সমাজ’ নামে যে প্রবন্ধটি কবি লিখেছিলেন, তার ওপর ভিত্তি করে ১৯০৪ সালে ব্রিটিশ শাসক ও তাদের সমস্ত প্রতিষ্ঠান থেকে বিচ্ছিন্নতার ডাক দিয়ে একটি সামাজিক-রাজনৈতিক পুনর্গঠনের খসড়া তৈরি করেছিলেন। 

স্বদেশির ধারণাকে সহিংস জাতীয়তাবাদের বৃহত্তর আদর্শে জুড়ে যেতে দেখে ধীরে ধীরে আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ থেকে সরে আসতে শুরু করেন

বাংলায় লেখা, সেই খসড়া খুব বড়ো না হলেও তার আবেদন ছিল সর্বাঙ্গীণ। শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছিল ‘to do’ বা ‘করতে হবে’ তালিকা। সেখানে কঠোর ভাবে বলা ছিল, বিদেশে তৈরি সমস্ত পোশাক এবং ব্যক্তিগত ব্যবহারের জিনিসপত্র বর্জন করতে হবে, পেশাগত প্রয়োজন না পড়লে ইংরেজিতে চিঠি লেখা যাবে না, ইংরেজ অতিথিদের আমন্ত্রণ করা যাবে না—করতে হলে তাদেরকে শুধুমাত্র বাঙালি খাবার, বাঙালি কায়দায় খাওয়াতে হবে!

খসড়াটিতে আরও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, ভারতীয়দের দ্বারা পরিচালিত সম্পূর্ণ দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলন করতে হবে, শুধুমাত্র ভারতীয় ব্যবসার পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে এবং ‘নেটিভ সোসাইটি’-র মধ্যে উদ্ভূত কোনও সামাজিক সমস্যা মোকাবিলা করার জন্য সরকারের দারস্থ হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

ভারতীয় জাতীয়তাবাদ (Indian Nationalism)-এ ঐতিহাসিক বিপন চন্দ্র পাল লিখেছেন: নীতি এবং ব্যক্তিত্বের দিক থেকে রবীন্দ্রনাথই প্রথম, যিনি ব্রিটিশদের দাপ্তরিক ক্রিয়াকলাপের সঙ্গে সমস্ত স্বেচ্ছাসেবী সমিতি বর্জন করে, সরকারি সাহায্য ও নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং শিক্ষাগত জীবন সংগঠিত করার দায়িত্ব প্রচার করতে শুরু করেছিলেন।

The Golden Book of Tagore –এ বি সি চট্টোপাধ্যায় বর্ণনা করেছেন টাউন হলে কী অপরিসীম উদ্দীপনায় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানে গলা মেলাতে একত্রিত হয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ। কবিগুরুর কাছে এটিই ছিল  জাতীয়তাবাদের ভিত্তি। এই ‘জাতীয়তাবাদ’ শব্দটির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা তৈরি হয়েছিল। স্বদেশির ধারণাকে সহিংস জাতীয়তাবাদের বৃহত্তর আদর্শে জুড়ে যেতে দেখে ধীরে ধীরে আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ থেকে সরে আসতে শুরু করেন।

সেকারণেই অসহযোগ এবং আইন অমান্য আন্দোলন সংগঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিটিই তাঁদের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে আর যুক্ত থাকেননি, অন্তত জনসমক্ষে তো নয়ই। তিনি আমাদের দেশের জাতীয় সংগীতের স্রষ্টা। তবে, এ নিয়ে নিজেদের মাথায় মুকুট না পরিয়ে, ‘জন গণ মন’ বাস্তবে পরিণত হওয়ার অনেক আগে স্বাধীন ভারত নিয়ে কবির কথাগুলি যদি স্মরণ করা হয়, প্রত্যেকেই সমৃদ্ধ হবে।

সূত্র: 
Rabindranath and the Political Awakening in India by Suresh Chandra Deb, published in the Calcutta Municipal Corporation Gazette’s Tagore Memorial Special Supplement, September 13, 1941

Developed by DXDasia