প্রতিমাশিল্পী কাকলি পাল : দুর্গা-প্রতিমা গড়তে গড়তেই সামলাচ্ছেন জীবনের দশদিক

বাঙালির কল্পনায় দেবী দুর্গা, আদ্যাশক্তি মহামায়ার থেকেও বেশি ঘরের মেয়ে উমা। তিনি বছরান্তে চার ছেলে মেয়ে নিয়ে বাপের বাড়ি এসে চারটে দিন কাটিয়ে দশমীর সকালে আবার পাড়ি দেন কৈলাসে—স্বামীর ঘরে। তখন খালি হয়ে যায় গিরিরাণীর ঘর। তবে গিরিরাজ-গিরিরাণী ছাড়াও বাংলা জুড়ে রয়েছে জগজ্জননীর আরও অনেক বাবা-মা। যারা পরম যত্নে একটু একটু করে মাটির তাল থেকে গড়ে তোলেন মেয়ের নিখুঁত অবয়ব। চক্ষুদান করে, হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে, গয়না পরিয়ে তৈরি করেন মেয়েকে। সেই বাপ-মায়ের ঘর খালি হয় মহালয়া থেকেই। (কুমোরটুলির প্রতিমাশিল্পী কাকলি পাল)

এমনই এক রক্তমাংসের মেনকা কলকাতার কুমোরটুলির প্রতিমাশিল্পী কাকলি পাল। কুমোরটুলির অপরিসর গলির একঘরে বাংলারীতিতে একচালায় খড়, বাঁশ, মাটি দিয়ে তিল তিল করে তিনি গড়ে তোলেন দুর্গা আর তার চার ছেলে-মেয়েকে। মাটির পূর্ণাঙ্গ শরীর রং দিয়ে রাঙিয়ে এঁকে দেন চোখ, যত্ন করে পরান পোষাক, অলংকার। ঠিক যেমন করে সাজিয়ে তোলেন নিজের দুই মানবী কন্যাকে। মহালয়ার পর থেকে তার ঘর খালি করে মণ্ডপে মণ্ডপে পৌঁছে যায় তার মাটির মেয়েরা। শুধু দুর্গাই না, তার ঘরে সারাবছরই তৈরি হয় গণেশ, লক্ষ্মী, কালী, জগদ্ধাত্রী, সরস্বতী প্রভৃতি দেব-দেবীদের মাটির অবয়ব। (কুমোরটুলির প্রতিমাশিল্পী কাকলি পাল)

সংসার বাঁচাতে এবং মেয়েদের বড়ো করার তাগিদেই তিনি শুরু করেন প্রতিমা নির্মাণ। সেই থেকে আজ প্রায় ২২ বছর অতিক্রান্ত। বয়ে চলা সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়েছেন কাকলি।

নদিয়ার ধুবুলিয়ার পটুয়া বাড়ির মেয়ে কাকলি কলকাতার কুমোরটুলির বউ। সংসারের যাবতীয় কাজ সামলে প্রতিমা তৈরির স্টুডিওতে তার সময় কাটে রাত প্রায় দেড়টা দুটো অবধি। তাঁর হাত ধরেই সারা বছর বাড়ির অন্ন-বস্ত্রের সংস্থান হয়। তবে কিছু পেশা তো শুধুই পেশা নয়, তাই জীবিকার বাইরে তাঁর আসল পরিচয় শিল্পী। কুমোর পাড়ার সাধারণ গৃহবধূ থেকে কলকাতার অন্যতম মহিলা প্রতিমা শিল্পী হয়ে ওঠা কিভাবে? ব্যস্ত হাতে প্রতিমা বানাতে বানাতে বঙ্গদর্শন.কম-কে কাকলি জানালেন, “আমার এই কাজে আসা পরিস্থিতির চাপেই। ২০০৩ সালে স্বামীর হঠাৎ মৃত্যুর পর সংসার চালাতেই এই কাজ শুরু করি। সেই থেকে বাইশ বছর কেটে গেল এই কাজেই।” কথা বলতে বলতেই জানালেন, বিয়ের আগে ধুবুলিয়ায় বাবাকে প্রতিমা তৈরি করতে দেখলেও নিজে কখনো সেই কাজে হাত লাগাননি। বিয়ের পরেও ঘরকন্নার কাজেই ব্যস্ত ছিলেন, তাই স্বামীর সঙ্গেও কাজ করতে হয়নি। তাহলে হঠাৎ এত বড়ো পারিবারিক বিপর্যয়ের পর কিভাবে সামলালেন সবটা? জানালেন, “২০০৩ সালে লক্ষ্মীপুজোর পর পরই হঠাৎই ব্রেন স্ট্রোকে স্বামী মারা যান। সেই বছরের অনেকগুলো কালী ঠাকুরের অর্ডার নেওয়া ছিল। যেমন করেই হোক কাজ শুরু করতেই হতো। তখন আমার বাবার সাহায্যে কিছু শিল্পীদের নিয়ে কাজ শুরু করি। সেই বছরের মতো উতরে যায়।” (কুমোরটুলির প্রতিমাশিল্পী কাকলি পাল)

তবে শুধু সাময়িক প্রয়োজন মেটাতেই নয়, সংসারের হাল ধরতেও প্রতিমা নির্মাণই ছিল কাকলির একমাত্র ভরসা। কথাপ্রসঙ্গে তিনি জানান, তাঁর স্বামীই ছিলেন বাড়ির একমাত্র রোজগেরে সদস্য। তাঁর মৃত্যুর সময় দুই মেয়ের বয়স ছিল সাত বছর এবং এক বছর। ফলে, তাদের লালন পালনের যাবতীয় ভার এসে পড়ে কাকলির ওপর। সংসার বাঁচাতে এবং মেয়েদের বড়ো করার তাগিদেই তিনি শুরু করেন প্রতিমা নির্মাণ। সেই থেকে আজ প্রায় ২২ বছর অতিক্রান্ত। বয়ে চলা সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়েছেন কাকলি। তার বড়ো মেয়ে এখন বিবাহিতা, আর ছোটো মেয়ে স্কুলের পাঠ শেষ করে ফ্যাশন ডিজাইনিং নিয়ে পড়াশোনা করছে। প্রতিমার মতোই তিল তিল করে সাজিয়েছেন সংসার।

তবে কেমন ছিল শুরুর দিনগুলো? কোন পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই আচমকা যখন এই দায়িত্ব নিতে হয়েছিল তখন কারা সাহায্য করেছিলেন তাকে? এই প্রশ্নে কাকলি জানালেন, আশেপাশের অনেকেই তখন এগিয়ে এসেছেন। একটু একটু করে কাজ শিখিয়েছেন। কোনও অসুবিধা হলে সাহায্যের হাতও বাড়িয়ে দিয়েছেন। এভাবেই শ্বশুর মশাই, স্বামীর পারিবারিক প্রতিমা তৈরির ব্যবসাকে সসম্মানে আজও ধরে রেখেছেন তিনি।

চারিদিকে যখন থিম নির্ভর পুজোর রমরমা, তখন মাতৃমূর্তিতেও এসেছে নানান ধরনের নতুনত্বের ছোঁয়া। তবে ঠাকুর দেখতে দেখতে উত্তর কলকাতার বাগবাজারের মণ্ডপে ঢুকলে, সাবেকি রীতি প্রেমী মানুষের মনে যে শান্তির অনুভূতি হয়, পুজোর আগে কুমোরটুলির কাকলি পালের স্টুডিওতেও যেন সেই একই আবহ। তাঁর নির্মিত সব ঠাকুরই এক চালার এবং বাংলা রীতির। অর্থাৎ, দুর্গা লক্ষ্মী সরস্বতী কার্তিক গণেশ সকলেই একই চালার মধ্যেই থাকেন এবং দেবী দুর্গার পান পাতার মতন মুখ, প্রায় কান পর্যন্ত টানা টানা চোখ, গায়ের রং অতসী বর্ণা।

শুধু বারোয়ারি বা সর্বজনীন নয়, চোর বাগানের মিত্তির বাড়ি, হাটখোলার দত্ত বাড়ির মতো কলকাতার বিভিন্ন নামজাদা বনেদি বাড়িতেও পূজিত হন কাকলি পালের প্রতিমা। এমনকি পারিবারিক রীতি মেনে অনেকে নিজেদের মণ্ডপেই ঠাকুর তৈরি করেন। তাই কুমোরটুলির স্টুডিওর পাশাপাশি সেইসব বাড়িতে গিয়েও কাকলির বিভিন্ন শিল্পীরা গিয়ে গড়ে তোলেন উমাকে। আর কুমোরটুলিতে তাকে সাহায্য করার জন্য সারা বছরই আরো দু’জন শিল্পী তাঁর সঙ্গে কাজ করেন। মরশুমে, প্রয়োজন মত আসেন আরও অনেকে।

তবে এখনও যে পেশা মূলত পুরুষ নির্ভর সেখানে স্বাধীনভাবে কতজন নারী এই পেশার সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করেছেন? জানা গেল, এখনও পর্যন্ত কুমোরটুলিতে সফল মহিলা প্রতিমা শিল্পীর সংখ্যা মাত্র তিনজন হলেও ক্রমশ এই কাজকে ভালোবেসে মেয়েরা এগিয়ে আসছে। তাই আশা করা যায় আগামী দিনে কুমোরটুলি সহ সারা বাংলায় আরো অনেক মেয়ের হাতেই মৃন্ময় রূপ পাবেন জগতের মা।

শুধু বারোয়ারি বা সর্বজনীন নয়, চোর বাগানের মিত্তির বাড়ি, হাটখোলার দত্ত বাড়ির মতো কলকাতার বিভিন্ন নামজাদা বনেদি বাড়িতেও পূজিত হন কাকলি পালের প্রতিমা।

মেয়েদের প্রসঙ্গে সমাজে প্রচলিত একটি কথা ‘যে রাঁধে, সে চুলও বাঁধে।’ তবে রান্না আর চুল বাঁধার বাইরেও আজকের মেয়েরা যেন দশ হাতে সামলাচ্ছে জীবনের দশদিক। ঘরে-বাইরে প্রতি নিয়ত লড়তে হচ্ছে তাদের। সেই লড়াকু মেয়েদেরই মূর্ত প্রতীক যেন দেবী দুর্গা। আর কাকলির মতো জীবনের যোদ্ধারা হাতে মাটি মেখে একটু একটু করে ফুটিয়ে তোলেন জীবন যুদ্ধে জিতে যাওয়া সেই দুর্গার অবয়ব। সমস্ত আসুরিক শক্তিকে ত্রিশূলে বিঁধে যেভাবে হাসেন মাটির দুর্গা; সেভাবেই, প্রতিকূল পরিস্থিতির চোখ রাঙানিকে পাল্টা চ্যালেঞ্জ জানিয়ে জয়ের হাসি হেসেছেন কাকলি। হাসতে হাসতে শিখিয়ে দিয়েছেন জীবনের তরী বাইতে গেলে, মাঝে মাঝে তুফান আসে, তখন হাল ছাড়তে নেই, বরং রবি ঠাকুরের ভাষায় তখন, “শক্ত যা তাই সাধতে হবে, মাথা তুলে রইব ভবে–” দেবীপক্ষের সূচনায় এই হোক জীবনের পথে এগোনোর মূল মন্ত্র।

Written by