সাম্প্রতিক বাংলা থিয়েটারের সঙ্গে বিশ্ব সংস্কৃতির যোগ কোথায়, কতটুকু

অল্টারনেটিভ লিভিং থিয়েটারের গুরুত্ব অনুভব করছে বাংলা থিয়েটার

মারীচ সংবাদ নাটকের দৃশ্য

পবাংলা থিয়েটারের ইতিহাস-এর একটু গৌরচন্দ্রিকা দিয়ে শুরু করা যাক। ১৭৯৫,  লেবেদফ সাহেব কলকাতায় বাংলা নাটক মঞ্চস্থ করলেন। মাত্র দুই রাত্রি ‘কাল্পনিক সংবদল’-এর অভিনয় হল। প্রথম রাতে একটা অঙ্ক, দ্বিতীয় রাতে তিনটে অঙ্ক। সবটা কিন্তু বাংলায় নয়। বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি তিন ভাষাতেই তিন অঙ্কের অভিনয় হল। তারপরের ঘটনা তো সবাই জানেন। লেবেদফ সাহেবের অনুবাদ করা দুটো বাংলা সংলাপ, যা ‘কাল্পনিক সংবদল’ নাটকে ব্যবহার হয়েছিল, তা এখানে দেবার লোভ সামলাতে পারলাম না।

— “ভালো ঈশ্বর অনুগ্রহ করুন, আমি করিয়া এনেছি একটি বিষয় আমার মনস্তের। সসিমুখী সন্দেহ নাস্তী আমার কথায় প্রত্যয় করিয়াছেন।”

— “এখনকার দিনে স্ত্রীলোক সকল এমন মত্তা হইয়াছে যে কিঞ্চীত মর্দ্দা আকারের মায়্যা হয়, তাহারাই উপযুক্ত পূরূস হৈতে।”

সে যুগের পণ্ডিতরা লেবেদফের বাংলা অনুবাদের তারিফ করেছিলেন। এই ঘটনার পর নাটকের বাজার একদম ঠান্ডা। কারও কোনো সাড়া শব্দ নেই। নাটক হল কী হল না বয়েই গেল! লোকজনের ঘুম ভাঙল প্রায় ছত্রিশ বছর পর, বাবু প্রসন্নকুমার ঠাকুর ১৮৩১ সালে শুরু করলেন ‘হিন্দু থিয়েটার’। সেই থিয়েটার থেকে সাম্প্রতিক সময়ের সংসৃতির ‘হয়বদন’ কিংবা থিয়েটার প্ল্যাটফর্ম-এর ‘আলা দা’ — এই দীর্ঘ দুশো ত্রিশ বছরের বাংলা থিয়েটারের পথ চলা। সেখানে ১৯৬২ থেকে আন্তর্জাতিক নাট্য প্রতিষ্ঠান (ITI) বিশ্ব নাট্য দিবস পালন করে আসছে। মানে চৌষট্টি বছর ধরে এই দিনটিকে সারা পৃথিবীর নাট্য সংস্কৃতির জন্য উৎসর্গ করা হয়েছে।

মারীচ সংবাদ নাটকে মেরীবাবার চরিত্রে বিপ্লবকেতন চক্রবর্তী

দুশো বছরের বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসের মধ্যে এই বিশেষ দিনটি ঢুকে পড়েছে। এতে থিয়েটারের জন্য কী মঙ্গল, কী অমঙ্গল হয়েছে সেই সব তাত্ত্বিক বিতর্কে না গিয়ে বলতে পারি, অন্তত জনপরিসরে বাংলা থিয়েটারের গুরুত্ব প্রসারিত হতে পারে এই দিনটিকে কেন্দ্র করে। অবশ্যই সেই দায়িত্ব বর্তায় নাট্যকর্মীদের কর্মকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে। বাংলার থিয়েটার একটি বিশ্ববোধকে সবসময় তার কাজের মধ্যে ব্যবহার করেছে। তার অবশ্যম্ভাবী কারণ ঔপনিবেশিকতা। অনেকগুলো সমস্যার মধ্যে অবশ্যই ইতিবাচক দিকটি হল — আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান।

সব কিছুর পরও মনে হয়, বিশ্ব নাট্য দিবসে বাংলা থিয়েটার বড্ড উপেক্ষিত। পৃথিবীর থিয়েটারের ইতিহাসে এত বৈচিত্র‍্যময় থিয়েটার কটাই বা আছে! কিন্তু এখনও পর্যন্ত ডাক এল না বিশ্ব নাট্যবার্তার জন্য কোনও বাঙালি নাট্যব্যক্তিত্ব-এর কাছে!

বিশ্ব নাট্য দিবসের লক্ষ্য হলো থিয়েটারের মধ্যে দিয়ে শান্তির পরিবেশ ও সংস্কৃতির নির্মাণ। নাট্য দিবসের সূচনাকালে ফ্রান্সের প্যারিস শহরে একটি কনফারেন্স আয়োজন করা হয়, যেখানে ‘বিশ্বের সমস্ত জাতির জন্য হোক থিয়েটার’ এই ভাবনাকে তুলে ধরা হয়। এই দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিশ্ব থিয়েটারের বার্তা। সেই বার্তার বক্তব্য মানব সংস্কৃতির জন্য থিয়েটারের গুরুত্ব ও বিশ্ব থিয়েটারের সঙ্গে যোগাযোগ। সাধারণ মানুষের কাছে নাট্য সংস্কৃতিই শুধু নয়, অন্যান্য পারফর্মেন্সও যেন পৌঁছে যায় এই মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে শেষ একষট্টি বছর এই দিনটা ফিরে আসে বারবার।

পাখিরা নাটকে বাদল সরকার

সব কিছুর পরও মনে হয়, বিশ্ব নাট্য দিবসে বাংলা থিয়েটার বড্ড উপেক্ষিত। পৃথিবীর থিয়েটারের ইতিহাসে এত বৈচিত্র‍্যময় থিয়েটার কটাই বা আছে! কিন্তু এখনও পর্যন্ত ডাক এল না বিশ্ব নাট্যবার্তার জন্য কোনও বাঙালি নাট্যব্যক্তিত্ব-এর কাছে! এ তো বড়োই বেদনার! ২০২৩-এর বিশ্ব নাট্যবার্তা দিয়েছেন মিশরের অভিনেত্রী শামিমা আয়ুব। তিনি বলছেন, “It is our mission, us playwrights, the bearers of the torch of enlightenment, since the first appearance of the first actor on the first stage, to be at the forefront of confronting everything that is ugly, bloody, and inhuman.”

আজকের বাংলা থিয়েটারে যে নতুন নতুন ভাবনার আত্মপ্রকাশ হচ্ছে, মানবতার জন্য যে স্পষ্ট উচ্চারণ উচ্চারিত হচ্ছে, যেভাবে তরুণ নাট্যকর্মী ঝাঁপিয়ে কাজ করছে কোনও ভাবেই কি তার কোনও আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন হতে পারে না! অবশ্যই পারে। কিন্তু ভাষার প্রতিবন্ধকতা ও অনুবাদের অভাবের জন্য আজ বাংলা থিয়েটার কোথাও না কোথাও বিচ্ছিন্নতার ফল ভুগছে। দ্বিতীয়ত, ডকুমেন্টেশনের বড্ড অভাব এবং পুঁজির অসম বিনিয়োগের কারণে বাংলা থিয়েটারের মানচিত্র বিশ্বের কাছে সঠিক ভাবে পৌঁছাতে পারছে না। তাই বলে কি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বাংলা থিয়েটার হচ্ছে না? হচ্ছে। তবে তার সঙ্গে জনসংযোগের অভাব অবশ্যই আছে। 

টিনের তলোয়ার নাটকে উৎপল দত্ত এবং অন্যান্য অভিনেতারা

আজকের থিয়েটার নির্মাণ করার যে নতুন নতুন প্রক্রিয়া দেবেশ চট্টোপাধ্যায়, কৌশিক সেন, অর্পিতা ঘোষ, মনীষ মিত্র, সুমন মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে তরুণ দেবাশিস রায়, অভি চক্রবর্তীরা যেভাবে কাজ করছেন তাতে স্তম্ভিত হতে হয়। বিভিন্ন ইন্টিমেট থিয়েটার তো আছেই, এছাড়াও ক্যাফে থিয়েটার, ইন্সটলেশন থিয়েটার কিংবা মুভেবেল স্পেস (ট্রাম)-এও থিয়েটার হচ্ছে এই বাংলায়। 

আজকের বাংলা থিয়েটারে যে নতুন নতুন ভাবনার আত্মপ্রকাশ হচ্ছে, মানবতার জন্য যে স্পষ্ট উচ্চারণ উচ্চারিত হচ্ছে, যেভাবে তরুণ নাট্যকর্মী ঝাঁপিয়ে কাজ করছে কোনও ভাবেই কি তার কোনও আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন হতে পারে না! অবশ্যই পারে।

প্রকৃতিকে অপূর্ব ব্যবহার করে অল্টারনেটিভ লিভিং থিয়েটারের গুরুত্ব আসতে আসতে গভীর ভাবে উপলব্ধি করছে বাংলা থিয়েটার। প্রবীর গুহর মুক্ত নাট্য হোক কিংবা পরিমল মিস্ত্রীর বৃক্ষ-মানবিক থিয়েটার যাপন – একটা নতুন ভাষায় কথা বলছে বাংলা থিয়েটার। সুদীপ গুপ্ত-র হাত ধরে পাপেট থিয়েটার আস্তে আস্তে থিয়েটারের মূল ধারায় অনুপ্রবেশ করছে। প্রদীপ ভট্টাচার্যের মতো নাট্যব্যক্তিত্ব বহু বছর ধরে জেলবন্দিদের নিয়ে নাটক করছেন।

ডন, নির্দেশনা – সুজন মুখোপাধ্যায়

বাংলা থিয়েটারে একটা জোরালো রাজনৈতিক সংলাপের পরিসর তৈরি হচ্ছে তথাকথিত মধ্যবিত্তের বিনোদন থেকে সরে। আজ সারা পৃথিবীব্যাপী যুদ্ধ আর পুঁজির বিরুদ্ধে মানুষের কণ্ঠস্বর যেখানে রুদ্ধ – সেখান থেকেই উঠে আসতে থাকে নাটক ‘মেফিস্টো’, ‘ভিট্টন’, ‘দায় আমাদেরও’, ‘১৯৮৪’, ‘শেকল ছেঁড়া হাতের খোঁজে’, ‘উড়ন্ত তারাদের ছায়া‘, ‘Mr. Right’, ‘হয়বদন’, ‘লোহার দাম’, ‘মানুষ’, ‘স্পর্ধা জঙ্গম’, ‘ঘাসীরাম কোতোয়াল’, ‘ডন’, ‘রাণী ক্রেউসা’, ‘স্পেয়ার পার্ট’, ‘ব্যারিকেড’, ‘প্রথম রাজনৈতিক হত্যা’, ‘নুরজাহান’ ইত্যাদি। একদম সাম্প্রতিক সময়ের হিংস্র রাজনৈতিক পরিবেশের বিকল্প কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে চাইছে বাংলা থিয়েটার। ফিরে আসছে পুরোনো ঝোড়ো দিনের নাটক ‘মারীচ সংবাদ’ কিংবা ‘জগন্নাথ’।

‘বোমা’, কিংবা ‘ক্যালিগুলা’ কোথাও নতুন ধরনের একটি রাজনৈতিক ভাষার জন্ম দিতে সাহায্য করেছিল। শান্তির জন্য, গণতন্ত্রের জন্য সেই সোচ্চার উচ্চারণ বাংলার রঙ্গালয়ে আরও গভীর হচ্ছে। সেই থিয়েটারের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব থাকবে না কেন! সারা পৃথিবীর মানুষ এশীয় বার্তার উচ্চারণ থেকে কেন বঞ্চিত হচ্ছে যে প্রশ্ন বড়োই অনুচ্চারিত। থিয়েটার যদি শান্তির কথা বলে, তাহলে তো গৌতম বুদ্ধ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিংবা মহাত্মা গান্ধীর দেশের কথা তো একটিবার ভাবতে হবে।

কল্যাণী কলামণ্ডলমের নাটক ম্যাকবেথ মিরর

আন্তর্জাতিক নাট্য প্রতিষ্ঠান এই চৌষট্টি বছর ধরে কেন একটা বছর বার্তা দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন না উৎপল দত্ত, শম্ভু মিত্র, শোভা সেন, তৃপ্তি মিত্র, কেয়া চক্রবর্তী, অজিতেশ বন্দোপাধ্যায়, মোহিত চট্টোপাধ্যায়, বাদল সরকার, রমাপ্রসাদ বণিক কিংবা শাঁওলি মিত্র-দের। কেন ডাকলেন না আজও অরুণ মুখোপাধ্যায়, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, শমীক বন্দোপাধ্যায়, পবিত্র সরকার-কে! ব্রাত্য বসু, দেবেশ চট্টোপাধ্যায়, সুমন মুখোপাধ্যায়, অর্পিতা ঘোষ, দেবশংকর হালদার, বিপ্লব বন্দোপাধ্যায়, দেবাশিস রায় বা অভি চক্রবর্তী-রা পৃথিবীর জন্য কোনও মঙ্গলময় বার্তা পৌঁছে দিতে পারবে না এই কথাটা অবিশ্বাস্য। আসলে সময় এসেছে থিয়েটারের জনপ্রিয়তার গণ্ডি ভেঙে জীবনচর্চার সীমানার মধ্যে নিয়ে যাওয়ার। সচেতনতা সেখান থেকে আসবে, না হলে যত গুরুত্বপূর্ণ নাটকই হোক না কেন, পরিস্থিতি যেখানে থাকার সেখানেই থেকে যাবে।

__________ 

লেখাটি ২০২৩ সালের বঙ্গদর্শন.কম থেকে পুনঃপ্রকাশিত হল

Developed by DXDasia