পার্থ গুপ্তের উদ্যোগে ২৬ জন আদিবাসী এখানে নিয়মিত থিয়েটার করেন
বর্তমান থিয়েটার প্রসঙ্গে একটা কথা প্রায়ই শোনা যায়। থিয়েটারের মঞ্চ এত গড়পড়তা কেন? যদিও থিয়েটার (Theatre) তার আদল ভেঙে, প্রথা ভেঙে এগিয়েছে নানান আঙ্গিকে, নানান ভঙ্গিমায়। প্রসেনিয়ামের বাইরে বেরিয়ে থিয়েটার হয়ে উঠেছে সর্বস্তরের, এমনকি তিন দেওয়াল ভেঙে খোলা আকাশের যাপনসঙ্গী। বাংলা থিয়েটার আর আটকে নেই ২০০/৩০০/৫০০ টাকার টিকিটের মধ্যে। এসেছে অনুদান পদ্ধতি। এ কোনো নতুন কথা নয়। বাদল সরকারের (Badal Sircar) ‘শতাব্দী’ একসময় এই পথেই হেঁটেছিল, যার পোশাকি নাম ছিল ‘থার্ড থিয়েটার’ (Third Theatre)। ২০০৭ সাল থেকে সেই ভিন্নপথেই পা বাড়িয়েছেন বীরভূমের কবি, চিত্রশিল্পী, থিয়েটার অনুশীলনকারী গবেষক পার্থ গুপ্ত (Partha Gupta)। তাঁর গ্রামের নাম দারোন্দা। সেখানেই প্রায় ১.৪ একর জমি জুড়ে গড়ে তুলেছেন থিয়েটার চর্চার ‘অল্টারনেট স্পেস’। বীরভূম ব্লসম থিয়েটারের (Birbhum Blossom Theatre) অন্তর্গত ‘থিয়েটার কটেজ’।

মূলত পারফর্মিং আর্টের একটা বিশাল ক্যাম্পাস। ২০০৬ সালে ‘রাজার ছেলে’ নাটকের মধ্যে দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পথ চলা শুরু করে থিয়েটার কটেজ (Theatre Cottage)। ধর্মরাজ পুজো, মনসামঙ্গল ইত্যাদি টেক্সটের উপর ভিত্তি করে একটি সমসাময়িক থিয়েটার পালা। যদিও তখনও তৈরি হয়নি থিয়েটার কটেজ। পার্থ গুপ্তের বাড়ির পাশে একটি পুকুরের ধারে অভিনীত হয়েছিল ‘রাজার ছেলে’। উদ্বোধন করতে এসেছিলেন ভারতীয় থিয়েটারের বিশিষ্ট নাট্য ব্যক্তিত্ব রতন থিয়াম (Ratan Thiyam)। এরপরেই নিজেদের জমিতে কাজ শুরু করলেন। এ সময় প্রবল সাহায্য করেছিলেন পার্থর পরিবার। থিয়েটার কটেজ জুড়ে রয়েছে রিহার্সাল স্পেস, শিল্পীদের বিশ্রাম নেওয়ার জায়গা, এমনকি বাইরে থেকে আগত শিল্পীরা চাইলে থাকতেও পারেন। থিয়েটার কটেজের সঙ্গে এখন গাঁটছড়া বেঁধে কাজ করছে মিনিস্ট্রি অফ কালচার, ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা, সংগীত নাটক আকাদেমির মতো সরকারি সংস্থা। বাংলা নাটকের পাশাপাশি এখানে সাঁওতালি থিয়েটার নিয়েও নানান পরীক্ষামূলক কাজ হয়। ২০১১ সাল থেকে থিয়েটার কটেজের কর্ণধার পার্থ গুপ্ত সাঁওতালি নৃত্য এবং রীতি নিয়ে গবেষণা করছেন।
পার্থ গুপ্ত আদতে একজন চিত্রশিল্পী হতে চেয়েছিলেন। পরে তাঁর থিয়েটারের প্রতি আগ্রহ জন্মায়। থিয়েটার নিয়ে বিশ্বভারতী থেকে স্নাতক এবং রবীন্দ্রভারতী থেকে স্নাতকোত্তরের পর মিনিস্ট্রি অফ কালচার থেকে থিয়েটার নিয়ে ফেলোশিপ পান। বর্তমানে তিনি বিশ্বভারতীতে গবেষণার কাজে যুক্ত।
থিয়েটার কটেজের সঙ্গে এখন গাঁটছড়া বেঁধে কাজ করছে মিনিস্ট্রি অফ কালচার, ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা, সংগীত নাটক আকাদেমির মতো সরকারি সংস্থা। বাংলা নাটকের পাশাপাশি এখানে সাঁওতালি থিয়েটার নিয়েও নানান পরীক্ষামূলক কাজ হয়।
পার্থ গুপ্ত জানাচ্ছেন, “মঞ্চ নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে আমার ভালো লাগে। থিয়েটার কটেজ ছাড়াও ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশে আমি মঞ্চ বানিয়েছি। মঞ্চ তৈরি থেকে পারফরম্যান্স, এই গোটা বিষয়টিকে প্রথমত একটি আর্ট প্র্যাক্টিস হিসেবেই বিশ্বাস করি। আমি গুরু মানি শ্রী রতন থিয়ামকে। তাঁর কাজ দেখেই আমার থিয়েটারে আসা এবং অল্টারনেট স্পেস তৈরি করা। কখনও মঞ্চ নির্মিত হয়েছে শুধুমাত্র একটি নাটকের কথা ভেবেই।”


বীরভূম ব্লসম থিয়েটার তাঁদের নিজেদের দলের নাম। সেখান থেকে বছরে দুটো থিয়েটার ফেস্টিভ্যাল হয়- ‘শাল পিয়াল’ এবং ‘থিয়েটার অ্যান্ড থিয়েটার’। গত আট-দশ বছর ধরে জাতীয় ট্রাইবাল ফেস্টিভ্যাল করছেন তাঁরা। ‘আদিবিম্ব’ নামের এই ফেস্টিভ্যালের অন্যতম আয়োজক নিউ দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা (NSD)। ৬৫০ জন শিল্পী এখানে পারফর্ম করে, তাঁদের মধ্যে প্রায় ৩০০ জন আসেন বাইরের রাজ্য থেকে।
থিয়েটার কটেজের উদ্যোগে তৈরি হয়েছে তিনটে গেস্ট হাউস। পাশাপাশি কিছু তাঁবু তৈরি করা হয়েছে, যেখানে বাইরের শিল্পীরা রাত্রিযাপন করতে পারবেন।

শিল্পী, শিল্প, প্রকৃতি – এই তিনের মেলবন্ধনই পার্থ গুপ্তের মূল উদ্দেশ্য। “কারণ কোনো শিল্পই প্রকৃতি ব্যতিরেকে তৈরি হতে পারে না। আমরা কোনো ফেস্টিভ্যালে টিকিটের নির্দিষ্ট মূল্য ধার্য করি না। অনুদানের ব্যবস্থা রয়েছে। সরকারি সাহায্যই থিয়েটার কটেজের মূল ভিত্তি।” জানাচ্ছেন পার্থ গুপ্ত। বীরভূম ব্লসম থিয়েটারে ২৬ জন আদিবাসী নিয়মিত থিয়েটার করেন। এছাড়া আরও ১৭ জন ছেলেমেয়ে যুক্ত আছেন গোটা কাজটির সঙ্গে। রবীন্দ্রনাথের তিনটি নাটক নিয়ে সাঁওতালিতে তৈরি হয়েছে ‘ট্রিলজি’। বর্তমানে নিয়মিত অভিনয়ও হচ্ছে সে সব নাটকের।
থিয়েটার কোনোদিক থেকেই শুধুমাত্র সমাজের উপরতলার মানুষদের জন্য নির্মিত নিছক ‘বিনোদন’ নয়। থিয়েটার সর্বস্তরের মানুষের অধিকার। তাই প্রসেনিয়ামের বাইরে বেরিয়ে বীরভূম থিয়েটার কটেজের মতো বেশ কিছু থিয়েটার সংস্থা ভিন্ন পরিবেশে ভিন্ন মেজাজে মানববন্ধন ঘটাচ্ছেন নিয়মিত। থিয়েটারের ভাষা হয়ে উঠছে দৈনন্দিন জীবনচর্যার অঙ্গ। পার্থ গুপ্তের থিয়েটার কটেজ তেমনই একটি জায়গা, যেখানে শিল্প-শিল্পী-প্রকৃতি মিলেমিশে একাকার।

ছবি সৌজন্যেঃ পার্থ গুপ্ত