
১৬৯২ সালে ফরাসি কুঠি গড়ে ওঠে চন্দননগরে
বাংলার ঔপনিবেশিক অতীতের বেশিরভাগ জুড়ে আছেন ব্রিটিশরা। বাকি ইউরোপীয় শক্তিগুলো আমাদের স্মৃতিতে খানিক কোণঠাসা। তবে ইতিহাস সাক্ষী রয়েছে – দিনেমার, পর্তুগিজ, ফরাসি, ওলন্দাজ বণিকরাও এসেছেন বাংলায়। উপনিবেশ গড়েছেন। সমৃদ্ধ করেছেন আমাদের সংস্কৃতি।

ফরাসিদের কথাই ধরা যাক। ১৭ শতকে ইউরোপীয়দের মধ্যে তাঁরা একেবারে শেষে বাংলায় আসেন। বৃহৎ নৌশক্তির তালিকায় ইতিমধ্যেই জায়গা করে নিয়েছিলেন। ১৬৬৭ সালে ফ্রাঁসোয়া ক্যাঁরোর নেতৃত্বে ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শুরু করে অভিযান। ১৬৬৮-এ তাঁদের জাহাজ ভিড়ল সুরাটে। আমাদের দেশে চালু হল প্রথম ফরাসি কারখানা। কয়েক বছর পরেই তাঁরা চলে এলেন চন্দননগর। ‘Chandernagore’ বলে ডাকতেন এই শহরকে। বাংলার মুঘল প্রশাসক শায়েস্তা খাঁর আদেশে ১৬৯২ সালে এখানে ফরাসি কুঠি গড়ে ওঠে। ১৬৯০ সালে কলকাতা শহরের ‘জন্ম’ হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন। সেই হিসেবে তিলোত্তমার থেকে চন্দননগর মাত্র ২ বছরের ছোটো।

চন্দননগরে ফরাসিরা ১৯৬০-৭০ দশক পর্যন্ত জাঁকিয়ে বসেছিলেন। একুশ শতকে আর সেদেশের ভাষা কিংবা জীবনচর্যা খুব একটা প্রভাব ফেলে না ছোট্ট এই শহরে। তবে ঔপনিবেশিক যুগের বেশ কিছু ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে। বেশিরভাগই ভগ্নপ্রায়। যেমন রেজিস্ট্রি বিল্ডিং। এখন সেটি হয়ে উঠছে বুটিক হোটেল।

চন্দননগরে হেরিটেজ ট্যুরিজমের প্রসার ঘটতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পর্যটন দপ্তর এবং কলকাতার ফরাসি কনস্যুলেটের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে মেমোরেন্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং (এমওইউ)। জোর দেওয়া হবে ফরাসি ঐতিহ্যে। তারই প্রথম ধাপ বুটিক হোটেল।

চন্দননগরের প্রায় ১০০টি হেরিটেজ সৌধের মধ্যে অন্যতম হল রেজিস্ট্রি বিল্ডিং। এক সময় আদালত বসত এই বাড়িতে। ইন্দো-ফরাসি স্থাপত্যের দারুণ নিদর্শন। যদিও এখন প্রায় ভেঙে পড়েছে। সম্পূর্ণ মেরামতি দরকার। যেমন শ্রীরামপুরে ড্যানিশ টাভার্নে করা হয়েছে। বুটিক হোটেলের মধ্যে বাংলা এবং ফ্রান্স সরকারের যৌথ উদ্যোগে গড়ে উঠবে ফরাসি লাইব্রেরি এবং সংস্কৃতি কেন্দ্র। গঙ্গার বুকে ভেসে বেড়াবে হেরিটেজ ক্রুজ।

গোটা সংস্কার প্রক্রিয়া আগামী ১৮ মাসের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নিয়েছে রাজ্য সরকার। খরচ হবে প্রায় ৩ কোটি টাকা। প্রকল্প রূপায়নের দায়িত্ব নিয়েছে চন্দননগর পুরসভা। স্থানীয় বাসিন্দারাও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবেন। কলকাতার ফরাসি কনসাল জেনারেল ভার্জিনি কর্তেভাল সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “পরিকল্পনার বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চলেছেন এলাকা সাধারণ মানুষেরা।”

“এখনও যেসব ঔপনিবেশিক স্থাপত্য টিকে আছে, তাদের সংস্কার করে বাংলার সমৃদ্ধ ঔপনিবেশিক ঐতিহ্যকে তুলে ধরাই আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য”, জানালেন রাজ্যের পর্যটন সচিব নন্দিনী চক্রবর্তী।

জগদ্ধাত্রী পুজো, আলোকশিল্প, গঙ্গার ধারে মনোরম পরিবেশ – নানা কারণে চন্দননগর ঘুরতে যান পর্যটকরা। ঔপনিবেশিক হেরিটেজকে নতুনভাবে সাজিয়ে তুললে বাড়তি আকর্ষণ যোগ হবে – সন্দেহ নেই।
