
প্রায় ৩০ বিঘা জমির উপর শুরু হয়েছে ভেষজ ও সুগন্ধিযুক্ত গাছ-গাছালি চাষ
পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়। তার সঙ্গে লাগোয়া ঘন বনাঞ্চল। এখানকার ছোটো গ্রামগুলি জুড়ে আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। বছরের বাকি সময়টাতে চাষাবাদ ঠিকমতো হলেও, শীতকালে কপালে ভাঁজ পড়ে তাদের। কারন এ সময়ে বনাঞ্চলের অধিকাংশ জমিতে কোনোরকম ফলনই হয় না। বাধ্য হয়ে জঙ্গলের গভীরে ঢুকতে হয় গ্রামবাসীদের। যেকারণে প্রায়শই বুনো জন্তুর হাতে বেঘোরে প্রান হারান তাঁরা।
এই অবস্থা বদলাতেই সম্প্রতি এক অভিনব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে পশ্চিমবঙ্গ বনদপ্তরের পুরুলিয়া বিভাগ। চাষাবাদ সংক্রান্ত একটি ‘পাইলট’ প্রকল্পের সিদ্ধান্ত নেয় তাঁরা, যার দরুণ জঙ্গল মহল, অযোধ্যা পাহাড়ের প্রায় ৩০ বিঘা জমির উপর শুরু হয়েছে ভেষজ ও সুগন্ধিযুক্ত গাছ-গাছালি চাষ। প্রশ্ন উঠেছে, এর জন্য কি অন্যান্য ফসল চাষাবাদের জমির অভাব দেখা দিতে পারে? না, অন্যান্য বছর শীতে যে সমস্ত জমিতে কোনোরকম ফলন হত না, সেই জমিকেই বেছে নেওয়া হয়েছে প্রোজেক্টটির জন্য। ইতিমধ্যেই, পুরুলিয়া বনাঞ্চলের অন্তর্গত তেলিয়াভাষা, হেসাডি, কুসুমটিকরি ও চিরুবোরার মতো বেশ কয়েকটি গ্রামে চাষাবাদের কাজ শুরু করা হয়েছে।
প্রকল্পটির তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন আটটি যৌথ বন-পরিচালন সমিতির JFMCs (Joint Forest Management Committee) ৫০-এর বেশি সদস্য। এটির অর্থনৈতিক সহায়কের পদ গ্রহণ করেছে ‘স্টেট প্ল্যান অ্যান্ড গ্রিন ইন্ডিয়া মিশন’। অন্যদিকে, প্রকল্পটির প্রযুক্তিগত সহকারী হিসাবে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে ‘ওয়াইল্ডলাইফ, নেচার অ্যান্ড ইকোলজি’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা।
এই পাইলট প্রোজেক্টের প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে ক্যামোমাইল এবং চিয়া বীজ চাষের মধ্যে দিয়ে। সাধারণত মধ্য আমেরিকাতেই চাষ হয় ‘সুপারফুড’ চিয়া বীজ। তবে বর্তমানে চিয়া বীজের যথেষ্ট চাহিদা তৈরি হয়েছে ভারতের বাজারেও। স্বাস্থ্যের পক্ষে এটি অত্যন্ত উপকারী। গবেষণা থেকে জানা যায়, চিয়া বীজে নাকি এক গ্লাস দুধের চাইতেও বেশি পরিমাণে রয়েছে ক্যালশিয়াম। রয়েছে বাদামের থেকে বেশি ওমেগা-থ্রি এবং বিপুল পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। চিয়া বীজ একদিকে যেমন ওজন কমাতে সহায়তা করে, অন্যদিকে হৃদরোগের আশঙ্কা অনেকাংশে হ্রাস করে। এছাড়াও নিয়মিত চিয়া বীজ সেবন হাড় মজবুত করতে সাহায্য করে।

ক্যামোমাইল
অন্যদিকে সুগন্ধী ক্যামোমাইল চা ডায়বেটিস সারাতে পারে, নিয়ন্ত্রণ করতে পারে রক্ত শর্করা। এই চা সেবন করলে অনিদ্রা দূর হয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এ কথা মাথায় রেখেই ক্যানসারের চিকিৎসাতেও ক্যামোমাইল চা পান করার পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা। এছাড়াও মহিলাদের নানান শারীরিক সমস্যা দূরীকরণে ক্যামোমাইলের জুড়ি মেলা ভার। দিন দিন ওষুধ শিল্পেও ক্যামোমাইলের ব্যবহার বেড়ে চলেছে। চিয়া বীজ ও ক্যামোমাইলের চাষ যে পাহাড়ের আদিবাসী গ্রামগুলির আর্থ-সামাজিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটাতে পারে, এমনটাই বিশ্বাস রাখছে পশ্চিমবঙ্গ বনবিভাগ।
এখন থেকেই বিষয়টিকে বাজারজাত করবার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বনদপ্তরের তরফ থেকে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চ নাগাদ গোলাজাত করা হবে এই ফসলগুলি। আর তারপরই তা বিক্রির যোগ্য হয়ে উঠবে। অনুমান করা যাচ্ছে, প্রকল্পটির দরুন বিঘা প্রতি ২০ থেকে ২৫,০০০ টাকা লাভ হবে। আপাতত ৩০ বিঘা জমি নিয়ে শুরু হলেও, আগামী দিনে এই জমির পরিধি আরও অনেকখানি বাড়ানোর প্রচেষ্টা করবে বনবিভাগ।

চিয়া গাছ
শুধুমাত্র পতিত জমি উদ্ধারই নয়, নানান ভাবে লাভজনক হয়ে উঠবে এই পাইলট প্রকল্প। যৌথ পরিচালন সমিতিগুলির জীবন ও জীবিকার সার্বিক উন্নয়নের পথ খুলে দেবে এই প্রকল্প। আবার, এই নতুন প্রজাতির চাষের ফলে বনাঞ্চলে থাকা বনজ সম্পদের উপর চাপ খানিকটা কমবে। এছাড়াও, সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি লক্ষ্য রেখেছে বনবিভাগ, তা হল, পাইলট প্রকল্পটি জীবিকা নির্বাহের যে বিকল্প রাস্তা খুলে দেয়, তা স্থানীয় মানুষদের গভীর জঙ্গলে যাওয়ার প্রবণতা হ্রাস করবে। ফলে শুধু খাবার জোগাবে তাই নয়, জীবন রক্ষা করবে এই পাইলট প্রোজেক্ট।

