
গোলাকার নরম পাকের সন্দেশের চারধারে চিনি বা গুড়ের মোড়ক, মনোহরা এক অদ্ভুত মিষ্টি
কথায় বলে, “মাছে ভাতে বাঙালি”, কিন্তু শেষ পাতে একটু মিষ্টিমুখ না হলে বাঙালির পেটপুজো ঠিক জমে না । মিষ্টি নাকি শুভ তাই শুরুর আপ্যায়নে মিষ্টিমুখও ভরসা জোগায়। ফলত, চড়া ব্লাড সুগার উপেক্ষা করে লুকিয়ে চুরিয়ে হলেও মিষ্টি বাঙালিকে খেতেই হবে। বাঙালির এই মিষ্টি প্রেমের ইতিহাসটা অনেক লম্বা। ঘরে তৈরি নারকেল নাড়ু কিংবা গুড় চাকতি থেকে শুরু করে আজকের দিনের নানা রকম বাহারি মিষ্টি, সবকিছুতেই রয়েছে এক রসনা তৃপ্তি এবং মননের সন্তুষ্টির ইতিহাস।
অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির সেই বিখ্যাত ভোলা ময়রা থেকে পরিচিত নবীন চন্দ্র দাস – যুগে যুগে এঁদের হাতের জাদুতেই বাঙালির আবেগের অপর নাম হয়ে উঠেছে মিষ্টি। ঘরোয়া কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানের ক্লাইম্যাক্স যে মিষ্টি, তার লম্বা জার্নিতে বাংলার নানা জায়গার ঐতিহ্য নিজেদের মতো করে রসদ জুগিয়ে এসেছে। আর সেই জার্নিতেই স্বমহিমায় রয়েছে মনোহরার (Monohara) নাম। কলকাতার রসগোল্লা, শক্তিগড়ের ল্যাংচা কিংবা বর্ধমানের মিহিদানা-সীতাভোগের মতো সমান জনপ্রিয় জনাইয়ের মনোহরা। জিভের স্বাদে ক্রমেই জাঁকিয়ে বসেছিল মনোহরা। ক্রমে ব্রিটেনেও মনোহরার বাজার তৈরি হয়। পরবর্তীকালে মনোহরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং জার্মানিতেও রপ্তানি হতে থাকে।
মনোহরার ইতিহাস তো আর আজকের নয়, প্রায় ২০০ বছরের। পুরোনো মিষ্টি মানেই তার গল্পগাঁথার শেষ না থাকাই স্বাভাবিক। গল্প কিংবা গুজব সব মিলিয়েই ঐতিহ্য তৈরি হয় মনোহরার।
মনোহরা, অর্থাৎ মন হরণ করে যে। মোহিতলাল মজুমদার (Mohitlal Majumder) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের বলতেন, “তোরা মিষ্টির নাম রাখিস প্রাণহরা, আর আমরা নাম রাখি মনোহরা।” ঢাকার মিষ্টি প্রাণ হরণ করলে, বাংলার মিষ্টি মন হরণ করবে নাই বা কেন! আজ বাংলার সব জেলার মিষ্টির দোকানেই পরিচিত নাম মনোহরা। নরম পাকের গোলাকার সন্দেশ এই সন্দেশের যে বহু মানুষের মুগ্ধতা, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তবে মনোহরার আসল ঐতিহ্য চিনতে হলে আসতে হবে হুগলি জেলার প্রাচীন জনপদ জনাইতে। এ যেন স্বাদে-বাহারে অন্যরকম মনোহরা।
কীভাবে যাবেন?
হাওড়া–বর্ধমান (Howrah-Bardhaman) কর্ড লাইনের ট্রেন ধরলেই সোজা গিয়ে পৌঁছবেন জনাই (Janai) রেল স্টেশনে। সেখানে নেমে কাউকে জিজ্ঞেস করার অপেক্ষা, কোথায় মিলবে এই মনোহরা। তারপর আর কী, রসের সুখে হারিয়ে যেতে নেই মানা!
জনাইয়ের রেখা বিশ্বাসের সঙ্গে আলাপচারিতায় বারবার উঠে আসে তাঁদের শহরের ঐতিহ্যের কথা, মনোহরার ইতিহাসের কথাও। মনোহরার গল্প বলতে উৎসাহের অন্ত ছিল না তাঁর। রেখা বলেন, “মনোহরা নিয়ে নানা জনে নানা কথা বলেন। কেউ বলেন একজন ইংরেজ কলকাতা থেকে জনাই এসেছিলেন, তিনিই নাকি এই মিষ্টির আবিষ্কর্তা। আমরা তো আবার শুনেছি, কলকাতার (Kolkata) ভীমচন্দ্র নাগ নাকি এখানকার ময়রা পাড়াতে থাকতেন, তাই ওঁর বংশধররাই এই মিষ্টি প্রচলন করেন।” মনোহরার ইতিহাস তো আর আজকের নয়, প্রায় ২০০ বছরের। পুরোনো মিষ্টি মানেই তার গল্পগাঁথার শেষ না থাকাই স্বাভাবিক। গল্প কিংবা গুজব সব মিলিয়েই ঐতিহ্য তৈরি হয় মনোহরার।

সে যাই হোক, কে বানিয়েছেন তাতে আর কী বা যায় আসে! স্বাদই তো সব! মনোহরা যে সত্যিই মন হরণে সিদ্ধহস্ত, সে কথা আর আলাদা করে বলে দিতে হয় না। এমন একটা সময় ছিল, যখন ছবি বিশ্বাস (Chobi Biswas), উত্তমকুমার (Uttam Kumar) কিংবা ছায়াদেবীর (Chaya Devi) মতো বাংলা চলচ্চিত্রের তাবড় তাবড় নায়ক-নায়িকারা আউটডোর শুট করে কলকাতা ফেরার পথে প্রায়ই গাড়ি থামাতেন জনাইয়ের দোকানে। মনোহরা কিনে নিয়ে তবে বাড়ি ফিরতেন তাঁরা। শোনা যায়, স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (Bidyasagar) মহাশয় নাকি এই মনোহরা খেতে খুব ভালোবাসতেন। মনোহরার প্রেমে তিনি বারবার এসেছেন জনাইতে।

কীভাবে তৈরি হয়?
ছানা আর চিনি দিয়ে তৈরি হয় সন্দেশের মিশ্রণ। তারপর কিছুটা করে মিশ্রণ হাতের তালুতে নিয়ে গোল্লা পাকানো হয়। বিভিন্ন সুগন্ধি মশলা সহকারে চোবানো হয় গরম চিনির রসে। এরপর খানিক সময়ের অপেক্ষা। গোলাকার নরম পাকের সন্দেশের চারধারে চিনির মোড়ক, এ এক অদ্ভুত মিষ্টি। এই মিষ্টির বিশেষত্ব হলো ওই চারিধারের চিনির আস্তরণটাই। ফ্রিজের বাইরে তিন-চারদিন রেখে দিলেও নষ্ট হয়ে যাওয়ার কোনও ভয় নেই। অবশ্য শীতকালে এর স্বাদ আরও বেড়ে যায়, তখন চিনির জায়গায় জুড়ে বসে গুড়ের মোড়ক।
বর্তমানে শুধু হুগলি জেলা নয় এই মনোহরারর জনপ্রিয়তা বাংলার প্রায় সর্বত্র। ব্রিটিশ আমলের অতিথি আপ্যায়ন থেকে আজকের নিমন্ত্রণ বাড়ির মেনু সবেতেই দিব্যি জাঁকিয়ে বসেন ইনি। জনাইয়ের মনোহরায় কামড় বসালেই যেন এক অদ্ভুত মায়া, বাইরের কাঠিন্যকে জয় করতে পারলেই ভিতরে নরম সন্দেশের সন্ধান। মনোহরা তাই বাঙালির মননের তৃপ্তি থেকে জীবনের ছন্দে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল, আছে এবং থাকবে।
