খেজুর গুড় ও লবাৎ তৈরির প্রক্রিয়া চাক্ষুষ করলে এর স্বাদ দ্বিগুণ বেড়ে যায়

বাংলার এই অনন্য সম্পদ ছাড়া বাঙালির শীতকাল কাটে না

“চিঁড়ে মুড়কি তে তার

ভরি দেন ঝুলি,

পৌষে খাওয়ান ডেকে

মিঠে পিঠে-পুলি…”

খেজুরের গুড় বা নলেন গুড় ছাড়া শীতকালে পিঠে-পুলি পায়েস! নাহ্‌, ভাবাই যায় না। খেজুর গুড় বাঙালি সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। শীত আসার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের পশ্চিমবাংলার কয়েকটি জেলা যেমন- নদিয়া, বীরভূম, বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ ইত্যাদিতে খেজুর গুড় তৈরির ধুম পড়ে যায়। রস সংগ্রহকারিরা সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত ব্যস্ত থাকেন রস সংগ্রহ, রস গরম ও গুড় তৈরির কাজে। রাস্তার ধারে, বাড়ির আশে-পাশে, জমির আলে, পুকুর পাড়ে, রেল লাইনের পাশের পরিত্যক্ত স্থানে অযত্ন-অবহেলায় জন্মাতে দেখা যায় খেজুর গাছ, যা বাংলার এক মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ।এই গাছের পাতা, কান্ড, ফলসহ গাছের প্রতিটি অংশই ব্যবহারযোগ্য, কোনও না কোনও কাজে লাগেই। কাঁচা ঘরের ছাউনি, বেড়া এবং কাঠ ঘরের খুঁটি তৈরিতে ব্যবহার করা হয় খেজুর গাছের পাতা। এছাড়াও পাতা দিয়ে পাখা, ঝুড়ি, মাদুর ও বিভিন্ন খেলনা তৈরি করা হয়। খেজুর গাছের শুকনো ডাল বা পাতা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। খেজুর রসে শতকরা ১৫ থেকে ২০ ভাগ শর্করা বিদ্যমান, যা থেকে উন্নত মানের সুস্বাদু গুড় ও লবাৎ(এই শব্দটি কেবল বীরভূম জেলাতেই ব্যবহার করা হয়) তৈরি করা হয়।খেজুরের গুড় আখের গুড়ের চেয়ে বেশি মিষ্টি ও পুষ্টিকর। এছাড়া খেজুরের গুড় সুন্দর ঘ্রাণ ও স্বাদের জন্য প্রসিদ্ধ। খেজুর গুড়ের মন্ডা, সন্দেশ, রসগোল্লা ও রকমারী পিঠে ও পায়েস খুবই সুস্বাদু। আমরা সারাবছর মুখিয়ে থাকি শীতকালের জন্য, শীতকালীন নলেন গুড়ের জন্য। খেজুরের গুড়ে কিন্তু আখের চেয়ে বেশি পরিমাণে প্রোটিন, ফ্যাট ও খনিজ পদার্থ বিদ্যমান। শীতকালে গ্রামাঞ্চলে খেজুরের রস একটি জনপ্রিয় পানীয়। সতেজ গাছ থেকে বেশি পরিমাণে রস পাওয়া যায়। রস সংগ্রহের জন্য কমপক্ষে পাঁচ থেকে সাত বছর বয়সের সুস্থ ও সবল গাছ নির্বাচন করতে হয়। যেসব গাছ দেখতে সুস্থ ও সবল, সেসব গাছ বেছে নিলে তার থেকে বেশি পরিমাণে রস পাওয়া যায়। রস সংগ্রহকারীদের দক্ষতা ও গাছ কাটার ওপরও রস সংগ্রহ অনেকটা নির্ভর করে।  অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি গাছ পরিষ্কারের কাজ শুরু করতে হয়। গাছ পরিস্কার করার পর পর্যায়ক্রমে প্রতিদিন গাছ কাটতে হয়, যাতে গাছে রস নিঃসরণ শুরু হয়। কোনো কোনো গাছ কাটা শুরুর তিন থেকে চার দিনের মধ্যেই রস নিঃসরণ শুরু হয়। এরপর কাটা অংশের যেখানে রস নিঃসরণ শুরু হয়, সেখানে একটি ‘ইউ’ আকৃতির সরু বাঁশের কাঠির আধ ইঞ্চি পরিমাণ গাছে ঢুকিয়ে দিতে হয়। ইউ আকৃতির কাঠির মধ্য দিয়ে রস ফোঁটায় ফোঁটায় গাছের ঝুলন্ত হাড়িতে জমতে থাকে। তবে গাছ একবার কাটলে তিন থেকে চারদিন রস সংগ্রহ করা উচিত এবং পরবর্তী দুই থেকে তিনদিন গাছ শুকাতে হয়। প্রাপ্ত বয়স্ক একটি গাছে নভেম্বর মাস হতে মধ্য মার্চ মাস পর্যন্ত সময়ে দৈনিক ১০ থেকে ২০ লিটার রস পাওয়া যায়। রস সংগ্রহের পর প্রতিবার হাঁড়ি ধুয়ে পরিষ্কার করে রোদে শুকাতে হয়। এতে সংগৃহীত রস গাঁজানো (fermentation) বন্ধ থাকে।

স্বাস্থ্যসম্মত ও উন্নত মানের খেজুরের গুড় উৎপাদনের জন্য রস সংগ্রহের পর পরিষ্কার কাপড় দিয়ে রস ছেঁকে উনানের ওপর বসানো লোহার বা স্টিলের কড়াইয়ে ঢালা হয়। উনানের উপর কড়াই বসানোর সময় খেয়াল রাখতে হবে, যাতে কড়াই ও উনানের মাঝে কোনো ফাঁকা জায়গা না থাকে। আরও খেয়াল রাখতে হবে যেন মাটির ছোটো চিমনি থেকে বের হওয়া ধোঁয়া বাতাসে কড়াইয়ের রসের সঙ্গে মিশতে না পরে। রস গরম করার প্রথম অবস্থায় রসের উপরি ভাগে যে গাদ ভেসে ওঠে তা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ছাকনি বা হাতা দিয়ে ফেলে দিতে হবে। তারপর রস ঘনীভূত হলে ঘনীভূত রস হাতা দিয়ে অল্প তুলে ফোঁটা ফোঁটা করে ফেলে দেখতে হবে শেষের ফোঁটায় আঠালো ভাব এসেছে কিনা। ঘনীভূত রস আঠালো হয়ে এলে, তা নামিয়ে গুড় তৈরি করতে হবে।লবাৎ করতে গেলে ঘণীভূত গুড়কে পালিশ করতে হয়। বীরভূমের প্রান্তিক স্টেশন থেকে প্রায় ৭-৮ কিমি দূরের গ্রাম গোপীনাথপুর, গদাধরপুর ও দর্পশীলা গ্রামটিতে গুড় প্রস্তুতকারিরা ৪০০ গাছ লিজ নিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৩০ কেজি গুড় ও ৩০ কেজি লবাৎ তৈরি করেন। কয়েকদিন খেজুর গুড়ের ডেরায় এবং গেছেলদের পিছনে পিছনে ঘুরে ঘুরে কিছু ছবি তুলেছি ও তথ্য সংগ্রহ করেছি মুঠোফোনে। সে এক অনন্য অভিজ্ঞতা। আর একটি কথা পরিশেষে বলি, গুড় তৈরির প্রক্রিয়া, পরিশ্রম সামনে থেকে পরিদর্শন করলে দেখবেন এর স্বাদ অনেক কিন্তু অনেক গুণ বেড়ে যায়। বিশ্বাস না হলে পরখ করে দেখুন।

Developed by DXDasia