
কুঞ্জবিহারীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন শঙ্কর চক্রবর্তী
পয়লা বৈশাখের সন্ধ্যায় দর্শকে উপচে পড়া রবীন্দ্র সদনে প্রথম মঞ্চস্থ হল ‘মুখোমুখি’ প্রযোজিত নতুন নাটক ‘আজকের সাজাহান’। মূল নাটক উৎপল দত্ত, সম্পাদনা ও নির্দেশনায় সুমন মুখোপাধ্যায়। মূল আলোচনায় আসার আগে একটা প্রসঙ্গ একটু বলে রাখা ভালো, প্রথম অভিনয়ের দিন রবীন্দ্র সদনে উপস্থিত ছিলেন উৎপলকন্যা অধ্যাপিকা বিষ্ণুপ্রিয়া দত্ত। নাটক শেষে কলাকুশলীদের সঙ্গে কথা বলার মুহূর্তে ঘটনাচক্রে সেখানে উপস্থিত থাকার সূত্রে বিষ্ণুপ্রিয়া দত্তের কিছু কথা কানে এল। তিনি বলছিলেন, বাবার (উৎপল দত্ত) একটা আক্ষেপ ছিল যে অন্য পরিচালকেরা তাঁর নাটক সমসময়ে মঞ্চস্থ করতেন না। তবে এখন যা চিত্র দেখা যাচ্ছে, প্রতিবাদের মূল ভাষা হিসাবে ভয়ঙ্করভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে উৎপল দত্তের নাটক।
উৎপল দত্ত নিজেকে শিল্পীর থেকে বেশি প্রপাগান্ডিস্ট বলতে পছন্দ করতেন। জব্বর প্যাটেলের ভারতীয় থিয়েটার সংক্রান্ত তথ্যচিত্রে তিনি একথা স্বকণ্ঠে বলেওছেন। তবে তিনি এ-ও মনে করিয়ে দিতেন যে, কেবল প্রোপাগান্ডা থাকলেই হবে না, সেই থিয়েটারকে হয়ে উঠতে হবে একটি ‘ভালো’ থিয়েটার। একইসঙ্গে প্রতিরোধের থিয়েটার হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে উৎপলের নাটক যে বিশেষ জায়গা করে নেয়, হাল আমলে ‘তিতুমীর’, ‘একলা চলো রে’, ‘ব্যারিকেড’, ‘দিল্লি চলো’-র মতো প্রযোজনা বারবার সেই কথা প্রমাণ করে। ‘আজকের সাজাহান’ কিন্তু উৎপল দত্তের প্রোপাগান্ডিস্ট ইমেজ থেকে একটু সরে আসা একটি নাটক, তবে এই নাটক একজন প্রকৃত অভিনেতার চরমতম প্যাশনের খবর দেয়। শিল্পের শুদ্ধতার জন্য শিল্পীর মনুষ্যত্ব ও প্রতিভার মধ্যে দ্বন্দ্বের কথা বলে।

নাটকটির গল্প এখানে বিস্তৃতভাবে বলার কোনো প্রয়োজন না থাকলেও, যাঁরা নাটকটি সম্পর্কে কিছুই জানেন না, তাঁদের জন্য এইটুকু সূত্র ধরিয়ে দেওয়া যায় যে, একজন আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল প্রাজ্ঞ অভিনেতাকে নিয়ে এই নাটক। এই অভিনেতা একদম শেষ জীবনে এক তরুণ পরিচালকের সিনেমায় অভিনয় করতে রাজি হন, তারপর কী ঘটে? সেটা জানতে হলে, প্রিয় দর্শকদের দেখতে হবে নাট্য প্রযোজনাটি।
বলতে কোনো বাধা নেই, এই নাটক মূলত শঙ্কর চক্রবর্তীর। কুঞ্জবিহারীর চরিত্রটি, যেটি একসময় উৎপলবাবু নিজে করতেন, সেটি অদ্ভুত নিপুণতায় উপস্থাপিত করেছেন শঙ্কর চক্রবর্তী। শঙ্কর চক্রবর্তী দীর্ঘদিন উৎপল দত্তের সঙ্গে মঞ্চে অভিনয় করেছেন, পরিচালনায় সহায়তাও করেছেন তাঁকে। বেশ অনেকগুলো বছর পর থিয়েটারে কামব্যাক করলেন শঙ্কর। সার্থক কামব্যাক। এবং তা গভীরভাবে প্রমাণ করে নাটকের শেষ কার্টেন কলে দর্শকদের না থামা অবিরাম হাততালি। গোটা চরিত্রটির গ্রাফ যেভাবে ওঠানামা করেছে, তার সঙ্গে ওথেলো, হ্যামলেট, শাহজাহান, টিনের তলোয়ার আরও অজস্র নাটকের সংলাপ যেভাবে মঞ্চে ফুটিয়ে তুলেছেন শঙ্কর চক্রবর্তী, তা এককথায় অভাবনীয়। বাংলা থিয়েটার কুঞ্জবিহারীর চরিত্রে শঙ্কর চক্রবর্তীর অভিনয় অনেককাল মনে রাখবে।

তবে এই নাটকের চারটি স্তম্ভের একটি যদি শঙ্কর চক্রবর্তী হন, অপর তিনটি বিমল চক্রবর্তী, আনন্দরূপা চক্রবর্তী এবং অবশ্যই ঋদ্ধি সেন। বিমল চক্রবর্তী বেশ অনেকগুলো বছর পর আবার সুমন মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাজে ফিরেছেন এবং যথারীতি নিজের স্বভাবোচিত অভিনয় কাঠামো নিয়েই ফিরেছেন। আনন্দরূপা এই মুহূর্তে অনেক কাজ করছেন ও ‘আজকের সাজাহান’-এর একটা দিক শক্ত হাতে ধরে থেকেছেন শেষ পর্যন্ত। ঋদ্ধি সেন একাধারে বিশিষ্ট অভিনেতা, তার সঙ্গে তিনি বাস্তবেও চিত্রপরিচালনার কাজ করেন, সেদিক থেকে মঞ্চে পরিচালক সুব্রত-র চরিত্রে ঋদ্ধি যেন এক আলাদা আবেগের সঞ্চার করেন। ঋদ্ধির মতে, সুব্রত চরিত্রটি আদৌ খল চরিত্র কী না সেটা এত সহজভাবে বলা সম্ভব নয়, একজন শিল্পী নিজের শিল্পের প্রতি কতটা নিষ্ঠাবান হলে সে এইরকম একটা চরম পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে সেটা এই চরিত্রটি প্রমাণ করে। তবে এটাও ঠিক যে মূল নাটকের সঙ্গে সুমনবাবুর সম্পাদিত নাট্য এই সুব্রত চরিত্রটির বেশ কিছু কর্মকাণ্ড অদল-বদল করা হয়েছে। একটা সময় তার শীতল শরীরী ভাষায় এতটা ক্রুরতা ফুটে ওঠে যে দর্শকরাও চমকে উঠতে বাধ্য। একটা বিশেষ সময় আমার নিজের দর্শক হিসাবে বসে থাকতে থাকতে মনে হচ্ছিলো স্টেজে উঠে গিয়ে ঋদ্ধিকে থামাই, হাতাহাতি করি; এর থেকেই বোঝা যায় ঋদ্ধি ‘সুব্রত’ চরিত্রটাকে কতটা নিপুণতায় ফুটিয়ে তুলেছেন। একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে এই গোটা প্রযোজনাটি একমাত্র অভিনেতাদের উপরেই টিকে আছে।

এবার আসা যাক সম্পাদনা ও নির্দেশনার প্রসঙ্গে। সুমন মুখোপাধ্যায় ২০২১ সালে ‘মেফিস্টো’-র পরে আবার একটা লার্জস্কেলের কাজে ফিরলেন, এর মধ্যে অবশ্য বেশ কিছু কাজ করেছেন, তবে তাঁর সিগনেচারে ফিরলেন এই ‘সাজাহান’-এই। কিছু জিনিস একটু চোখে লেগেছে। যেমন, নাটকের প্রথম দৃশ্যে (কমপক্ষে ২০-২২ মিনিটের দৃশ্য) কুঞ্জবিহারীর ঘরের সেটআপে আয়না হিসাবে একটি রিফ্লেক্টর ব্যবহার করা হয়, তাতে একটি লাইট সোর্স এমনভাবে রিফ্লেক্ট করছিল, যেটি সরাসরি দর্শকদের চোখে এসে পড়ে। এটি খুবই বিরক্তিকর ও অস্বস্তিকর একটি বিষয়, তবে এটাকে যান্ত্রিক ত্রুটি বলে এড়িয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু আরও এমন কিছু বিষয় আছে যা এড়িয়ে যাওয়া যায় না…
প্রথমত, এই নাটকটির সময়কাল কবে। যদি ১৯৮৫-৯০ হয়, তাহলে তাতে ‘পিডিএফ’ বা ‘সালমান খানের মতো হাঁটা’-র প্রসঙ্গগুলি আসে কী করে? আর যদি নাটকের সময়কাল ২০২৩ হয়, তাহলে একজন মানুষ, যিনি শিশির ভাদুড়ির সঙ্গে দীর্ঘদিন অভিনয় করেছেন, তিনি কী করে সুস্থ শরীরে অভিনয় করেন? কারণ সংখ্যার হিসাবে সেই অভিনেতার বয়স হওয়া উচিত একশোর কাছাকাছি।

দ্বিতীয়ত, একজন এই পর্যায়ের খুঁতখুঁতে পরিচালক, নিজের সিনেমায় এমন একজনকে হিরো হিসাবে কাস্ট করছেন, যিনি সাধারণ জ্ঞান দিয়ে একটা সংলাপ বলতে পারেন না বা সংলাপ মনেও রাখতে পারেন না। এটা সম্ভব?
তৃতীয়ত, শুটিং-এর দৃশ্যে বারবার সংলাপ ভুলে যাওয়ার অংশটি দীর্ঘক্ষণ রাখার ফলে নাটকের গতি শ্লথ হয়েছে, কিছুক্ষেত্রে সূক্ষ্মতাও বিঘ্নিত হয়েছে বলে মনে হয়।
চতুর্থত, সুমন মুখোপাধ্যায়ের নাটকের একটি বৈশিষ্ট্য ছায়া ও প্রোজেকশনের ব্যবহার, তবে এই নাটকে সেটি কেমন যেন দানা বাঁধেনি। এতবার কার্টেন উঠেছে এবং নেমেছে, সেটা কন্সেন্ট্রেশন ব্রেক করে অনেক ক্ষেত্রে, তার সঙ্গে ভিডিওগুলি অত্যন্ত নিম্নমানের। ‘লনের সিন্’-এ যখন বড়োপর্দায় কুঞ্জবিহারীর মুখ ভেসে ওঠে, তাতে ফ্যাটফ্যাটে আলো ও মাথার পিছন দিয়ে প্লাস্টিকের পাতা দেখতে পাওয়া, অত্যন্ত পীড়াদায়ক একটি অভিজ্ঞতা।
বলতে কোনো বাধা নেই, এই নাটক মূলত শঙ্কর চক্রবর্তীর। কুঞ্জবিহারীর চরিত্রটি, যেটি একসময় উৎপলবাবু নিজে করতেন, সেটি অদ্ভুত নিপুণতায় উপস্থাপিত করেছেন শঙ্কর চক্রবর্তী। শঙ্কর চক্রবর্তী দীর্ঘদিন উৎপল দত্তের সঙ্গে মঞ্চে অভিনয় করেছেন, পরিচালনায় সহায়তাও করেছেন তাঁকে। বেশ অনেকগুলো বছর পর থিয়েটারে কামব্যাক করলেন শঙ্কর। সার্থক কামব্যাক। এবং তা গভীরভাবে প্রমাণ করে নাটকের শেষ কার্টেন কলে দর্শকদের না থামা অবিরাম হাততালি। গোটা চরিত্রটির গ্রাফ যেভাবে ওঠানামা করেছে, তার সঙ্গে ওথেলো, হ্যামলেট, শাহজাহান, টিনের তলোয়ার আরও অজস্র নাটকের সংলাপ যেভাবে মঞ্চে ফুটিয়ে তুলেছেন শঙ্কর চক্রবর্তী, তা এককথায় অভাবনীয়।
‘আজকের সাজাহান’ নিঃসন্দেহে একটি অনবদ্য টেক্সট, যা বারবার মঞ্চে ও পর্দায় ফিরে এসেছে। ১৯৮৫ সালে উৎপল দত্ত নিজে মঞ্চস্থ করেছেন এই নাটক, ২০০৭-এ সাজাহান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ঋতুপর্ণ ঘোষ নির্মাণ করেন ‘দ্য লাস্ট লিয়ার’, ২০২৩-এ মুখোমুখি ও সুমন মুখোপাধ্যায়ের হাত ধরে আবার মঞ্চে ফিরলেন কুঞ্জবিহারী চক্রবর্তী। প্রযোজনা নিয়ে অনেক প্রশ্ন থাকলেও, একথা বলা যায় সাধারণ রঙ্গালয়ের ১৫০ বছর ও বাংলা গ্ৰুপ থিয়েটারের ৭৫ বছর উদযাপনে এই নাট্য প্রযোজনা তার অভিনয়ের কারণেই অনেকদিন দর্শকদের মনে থেকে যাবে।
‘আজকের সাজাহান’-এর পরবর্তী অভিনয় আগামী ৪ জুন, সন্ধে সাড়ে ছটায়, গিরিশ মঞ্চে।
নাটক – আজকের সাজাহান | মূল নাটক – উৎপল দত্ত | নির্দেশক – সুমন মুখোপাধ্যায় | প্রযোজনা – মুখোমুখি | অভিনয় – শঙ্কর চক্রবর্তী, বিমল চক্রবর্তী, ঋদ্ধি সেন, আনন্দরূপা চক্রবর্তী
