সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষ পালিত হচ্ছে উৎপলের দেখানো পথেই
নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্বাস, জীবন এবং থিয়েটারকে (Theatre) একইসূত্রে গেঁথেছিলেন তিনি। দুর্ঘটনার কবলে পড়া কয়লাখনিতে ঢুকে পড়ে শ্রমিকদের বয়ান শুনে পনেরো দিনে লিখে ফেলেছিলেন নাটক ‘অঙ্গার’। উৎপল দত্ত (Utpal Dutt)। অভিনেতা, লেখক সর্বোপরি নাট্যকার। তাঁকে ‘থিয়েটারের বিশ্বকর্মা’ বলা যায়, পারফর্মিং আর্টস-এ যিনি নিজেই নিজের তুলনা। মতাদর্শে তিনি ছিলেন মার্কসবাদী। শুধু থিয়েটারের জন্য পুলিশি নির্যাতন, কারাবাস, নাটকের দল থেকে বহিষ্কার… চড়াই-উতরাইয়ে ভরা ছিল তাঁর জীবন। ঠিক যেমনটা একজন শিল্পীর স্বাভাবিক। একজন শিল্পীর যাত্রাপথে কতটা পরিশ্রম থাকে, কতটা সংগ্রাম থাকে, তা সকলের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। উৎপল দত্তের ক্ষেত্রে এই সংগ্রাম চিরকাল ছিল। তবু তিনি নাট্যমঞ্চ ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভাবেননি। রাজনৈতিক আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে অন্য দলে যোগদান করেননি। সেটাই ছিল ওনার সততা বা ‘ইন্টিগ্রিটি’র সবথেকে বড়ো পরিচয়। মিনার্ভা থেকে বেরিয়ে তৈরি করেছিলেন পিপলস লিটল থিয়েটার (People's Little Theatre) বা ‘পিএলটি’ (PLT)। যে নাট্যদলের বয়স পঞ্চাশ ছাড়াল। সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষে (Golden Jubilee) বছর ব্যপী কর্মসূচীর নিয়েছে পিএলটি।
সুবর্ণজয়ন্তী পেরিয়ে সেই নাট্যদল ইতিহাসের সুলুকসন্ধান করছে বর্তমানের প্রেক্ষিতে। টিনের তলোয়ার থেকে সূর্যশিখা, মাও সে তুঙ থেকে তিতুমীর, জনতার আফিম থেকে ঠিকানা, উৎপল দত্তের নাটকের তালিকা দীর্ঘ। এই নাট্যদলের ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে নাট্যউৎসব, সেমিনার, অভিনয় কর্মশালা ইত্যাদির মাধ্যমে উদযাপিত হবে পিএলটি’র সুবর্ণজয়ন্তী। পিএলটি-র বর্তমান সম্পাদক প্রতাপ সি ঘোষ-এর কথায়, “পিএলটি একটা ঐতিহ্য। সেটাকে আমরা বহন করছি।”
বাংলা থিয়েটারে বহু ব্যবহৃত ‘গণনাট্য’ কথাটি এসেছিল রম্যাঁ রলাঁর হাত ধরে, তাঁর ‘পিপলস থিয়েটার’ আবিষ্কারের আলোয়। পিপলস থিয়েটার মানে গণনাট্য, অর্থাৎ জনগণের নাটক। কেমন হবে সেই নাটক? রাজনীতি, শিল্প এবং জনসাধারণ – এই তিন বিন্দুকে যোগ করবে যে ভাবনা, যে শৈলী তার বিকাশ ঘটাবেন সংস্কৃতিকর্মীরা কীভাবে? এ নিয়ে বিতর্ক সেদিনও ছিল, আজও আছে। আর এরই মধ্যে এক অখণ্ড সত্তা নিয়ে ধাবিত হচ্ছে রল্যাঁর পিপলস থিয়েটার। যাকে বলা যেতে পারে নাট্যআন্দোলনের স্বরলিপি। বাংলায় এই স্বরলিপির অন্যতম রচয়িতা উৎপল দত্ত।
উৎপল দত্ত মনে করতেন, নাটক হল রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার হাতিয়ার। যেহেতু আমাদের দেশে বেশিরভাগ মানুষ পড়তে পারেন না, তাঁদের সাথে সেতুবন্ধন করার একমাত্র উপায় হচ্ছে নাটক, তাঁরা হয়তো পড়তে পারেন না কিন্তু সংলাপ বুঝতে তাঁদের অসুবিধা হয় না। এবং তাঁদেরকে সংলাপ বোঝাতে গেলে যে ভাষাটা ব্যবহার করতে হবে, যে ‘ইডিয়ম’ ব্যবহার করতে হবে তার মধ্যে রসবোধ অন্যতম একটি উপাদান। উৎপল দত্ত তাঁর প্রত্যেকটা নাটকে নিপুণভাবে তাঁর সপ্রতিভ রসবোধের উপস্থিতি রাখতেন; এ ব্যাপারে চার্লি চ্যাপলিনের সঙ্গে তাঁর ভীষণ মিল পাওয়া যায়, তাঁরা দু’জনই সিরিয়াস ট্র্যাজেডি’র কথা সাবলীল-সহজ রসবোধে বলতে পারতেন। যেমন-
‘কল্লোল’ (Kallol) নাটকে উৎপল একটা ছোট্ট ভূমিকায় অভিনয় করতেন। নাটকের দৃশ্যে উনি মঞ্চে ঢুকেই নিজের স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বলতেন, ‘নামগুলো পড়ো…নামগুলো পড়ো’। নামগুলো পড়া হত…
-বিতান মুখার্জি।
-বিতান মুখার্জি ইজ আ ব্লাডি কমিউনিস্ট, অ্যারেস্ট হিম। (উৎপল দত্ত)
-সুজন পাল।
-সুজন পাল ইজ আ কমিউনিস্ট, অ্যারেস্ট হিম। (উৎপল দত্ত)
-বিনতি সাহা।
-বিনতি সাহা ইজ নট আ কমিউনিস্ট, ডোন্ট অ্যারেস্ট হার। (উৎপল দত্ত)
-মনীষ ঘোষ।
-মনীষ ঘোষ ইজ আ ব্লাডি কমিউনিস্ট, অ্যারেস্ট হিম। (উৎপল দত্ত)
-আচ্ছা, মনীষ ঘোষ তো আমাদের সঙ্গে কাল এনকাউন্টারে মারা গেছে!
-মারা গেছে, ও আচ্ছা! তাহলে, ডোন্ট অ্যারেস্ট হিম। (উৎপল দত্ত)
আগামী ১৬ ই মে, সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায়, আকাদেমি মঞ্চে মঞ্চস্থ হবে ‘জনতার আফিম’। যে নাটকে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে “আমি চাই না হিন্দু রাষ্ট্র, আমি চাই না, এমন দেশ যেখানে কোনও একটা ধর্ম সব ধর্মকে মাটিতে ফেলে দলবে।
উৎপল ছিলেন বর্ন ব্রিলিয়ান্ট। কলেজে পড়ার সময় থেকেই শেক্সপিয়রের জগৎকে যেমন আবিষ্কার করেছিলেন, তেমনই মার্ক্স, লেনিন, স্তালিন, হেগেল, কান্টও তাঁর আয়ত্তে ছিল। নকশাল রাজনীতি থেকে পরে নিজেকে সরিয়ে নিলেও উৎপল দত্ত জীবনের ওই পর্বে ছিলেন রাজনৈতিক ভাবে নিঃসঙ্গ। নিজের দল এল টি জি তাঁকে বহিষ্কার করেছিল। সেই নিঃসঙ্গতা ও সংকট মুহূর্তে তিনি মঞ্চস্থ করেন ‘মানুষের অধিকার’ নামে আরও একটি কালজয়ী নাটক। যদিও এই নাটক নকশালপন্থীদের সমালোচনার মুখে পড়েছিল। অতি-বামদের বৈরিতা শুরু হয়। তার প্রভাব এসে পড়ে এল টি জি দলের মধ্যে। সাত সদস্য দলত্যাগ করেন। উপদলের জন্ম হয়। ফলে ১১ বছর ধরে চালিয়ে যাওয়া একটি অন্যধারার পেশাদার থিয়েটারের ইতি ঘটিয়ে উৎপল দত্ত মিনার্ভা ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। গড়ে তোলেন ‘বিবেক নাট্যসমাজ’, যা পরবর্তী কালে নতুন দল ‘পিপলস লিটল থিয়েটার’ বা ‘পি এল টি’ নামে পরিচিতি পায়। ১৯৭১ সালের ১২ অক্টোবর রবীন্দ্র সদনে অভিনীত হয় দলের প্রথম নাটক ‘টিনের তলোয়ার’। এই নাটকে বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসটি সুন্দর ভাবে ধরা পড়লেও ‘অশ্লীল’ ঘোষিত হওয়ায় নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এর পরে ‘সূর্যশিকার’, ‘ব্যারিকেড’, ‘টোটা’, ‘দুঃস্বপ্নের নগরী’, ‘তিতুমীর’, ‘স্তালিন ১৯৩৪’, ‘লালদুর্গ’, ‘জনতার আফিম’ পেরিয়ে তিনি পৌঁছেছিলেন ‘একলা চলো রে’ নাটকে। যে নাটকে তিনি শেষ বারের মতো মঞ্চে নামেন।
“পঞ্চাশ বছর আগের যে থিয়েটার এবং আমরা জানি এগুলো রাজনৈতিক নাটক ছিল, তখনকার যে রাজনীতি সেটার পরিপ্রেক্ষিতে করা। এটার ইতিহাস ভালো করে লেখা হয়নি। এই যে পুরস্কার দেওয়া, পুরস্কার পাওয়া, এসব থেকে একধরনের ইতিহাস তৈরি হয়েছে, এগুলো খুবই ব্যক্তিকেন্দ্রিক, এই ব্যক্তি দারুণ, সবার থেকে বড়ো, আমার বাবা এসবে বিশ্বাস করতেন না। ওঁরা বিশ্বাস করতেন থিয়েটার একটা যৌথ উদ্যোগ। বাবা ‘জনতার আফিম’ লিখেছিলেন বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনার আগে আগে। পিএলটি ও ব্যারিকেট নাটকের সুবর্ণজয়ন্তী পালন করার একটাই উদ্দেশ্য, নতুন প্রজন্মের কাছে তা তুলে ধরা।” একটি সংবাদমাধ্যমে এই ছিল উৎপল-কন্যা বিষ্ণুপ্রিয়া দত্ত-র বিবৃতি।
প্রসঙ্গত, এবছর ৫০ বছর পূরণ করেছে উৎপল দত্তের ‘ব্যারিকেড’ নাটকটিও। পিএলটি আয়োজিত আগামী কর্মসূচীগুলির মধ্যে প্রথম পর্যায়ে আয়োজিত অনলাইন নাটমের শো হয়ে গিয়েছে ২৫ থেকে ২৯ মার্চ। মঞ্চস্থ হয়েছিল তিনটি কালজয়ী নাটক- ‘ব্যারিকেড’, ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’, ‘কল্লোল’। “পঞ্চাশে ব্যারিকেড : রাজনীতি ও থিয়েটার” বিষয়ে বক্তব্য রাখেন শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়, আনন্দ লাল, দেবেশ চট্টোপাধ্যায়।
আগামী ১৬ ই মে, সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায়, আকাদেমি মঞ্চে মঞ্চস্থ হবে ‘জনতার আফিম’। যে নাটকে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ‘আমি চাই না হিন্দু রাষ্ট্র, আমি চাই না, এমন দেশ যেখানে কোনও একটা ধর্ম সব ধর্মকে মাটিতে ফেলে দলবে। আমি চাই এমন দেশ যেখানে ধর্ম নয়, মানুষ হবে রাষ্ট্র ব্যবস্থার মাপকাঠি, যেখানে সবাই সুখে নিজের নিজের ধর্মকর্ম করতে পারবে। ধর্ম যদি কাউকে বলে ওই লোকটিকে হত্যা করো, তবে সেটা আর ধর্ম থাকে না। সেটা হয় আফিম যা খেয়ে আমরা মাতাল হয়ে সত্যিই খুনোখুনি শুরু করে দিই। ধর্ম যদি এসে বলে এখানে রাম জন্মেছিলেন আর এখানে কৃষ্ণ আর সেই জন্য মসজিদ ভাঙ্গো, আমি বলি সেটা হচ্ছে জনতার আফিম। দেশে চাকরি নেই, খাদ্য নেই, এসব যন্ত্রণা ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য এসব আফিম বিলি করে বড়োলোকেরা। বড়োলোকেরা এদেশের মানুষের শান্তি ধ্বংস করতে ধর্মের আফিম বিলোচ্ছে। সে আফিম প্রত্যাখ্যান করার জন্য দেশের মানুষের কাছে আবেদন করছি।’