স্বাধীন ভারতে মুসলিমদের অবদান ভোলানোর জন্যই কি ‘তিতুমীর’ বাতিল করল দিল্লি?

প্রসঙ্গ: জয়রাজ ভট্টাচার্য নির্দেশিত নাটক ‘তিতুমীর’

পৃথিবীর মানচিত্রে গত শতাব্দীর চল্লিশের দশক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আবহে খুবই উল্লেখযোগ্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর খাদ্য সংকট-হাহাকার, হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্কে চিড় ধরা ও এক শ্রেণির দেশীয় বানিয়ার মুনাফাবাজ মানসিকতার বাড়বাড়ন্তে দিশেহারা হয়ে পড়ে বাংলা। যদিও আদর্শগত ভাবে অবস্থান নিয়েছিলেন সেকালের বহু শিল্পী-সাহিত্যিক। গণ আন্দোলনের মধ্যে থেকে একে একে তৈরি হয়েছিল ফ্যাসিবিরোধী লেখক শিল্পী সংঘ, গণনাট্য আন্দোলন। শহরের বাইরে বেরিয়ে প্রত্যন্ত গ্রামেগঞ্জে তুলসী লাহিড়ী (Tulsi Lahiri), শম্ভু মিত্র (Sombhu Mitra), বিজন ভট্টাচার্য (Bijan Bhattacharya), ঋত্বিক ঘটকরা (Ritwik Ghatak) তৈরি করলেন থিয়েটার। ‘ছেঁড়া তার’, ‘নবান্ন’, ‘দুখীর ইমান’, ‘জ্বালা’ মঞ্চস্থ হল। প্রধান উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষদের সচেতন করা। পাশাপাশি বড়ো ভূমিকা নিয়েছিলেন উৎপল দত্ত (Utpal Dutt)। এঁদের অবস্থান ছিল শাসকের বিরুদ্ধে, অর্থাৎ যেকোনো রকম ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা। শাসক ভয়ও পেয়েছিল। উৎপল দত্ত ‘তিতুমীর’ (Titumir) নাটক লিখে বুঝিয়েছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের অমানবিক চিত্র। যে গণআন্দোলনের জয়গান বেজেছিল চল্লিশ-পঞ্চাশের দশকে, তা এখনও অক্ষত৷ সাংস্কৃতিক গণআন্দোলনকে বাঁচিয়ে রেখেছেন জয়রাজ ভট্টাচার্যের (Joyraj Bhattacharjee) মতো বিশিষ্টরা। তৈরি হয়েছে থিয়েটার ফর্মেশন পরিবর্তক নাট্যগোষ্ঠী।

কথাগুলি উঠছে কারণ, সম্প্রতি এমনই এক ‘আজব’ দৃশ্যের সাক্ষী থাকল বাংলা তথা ভারতীয় থিয়েটার। নাট্যনির্দেশক জয়রাজ ভট্টাচার্য নবনির্মাণ করেছেন উৎপল দত্তের ‘তিতুমীর’ নাটকটিকে। ইতিমধ্যে যার ২৩টি অভিনয় হয়ে গিয়েছে। সম্প্রতি দিল্লির ‘ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা’ (NSD) জয়রাজের ‘তিতুমীর’-কে আমন্ত্রণ জানিয়েও পরে তা বাতিল করে দেয়। কারণ হিসাবে বলা হয়েছে, নাটকের ভিডিও রেকর্ডিং না-পাঠানোর জন্য এই সিদ্ধান্ত। এ প্রসঙ্গে জয়রাজ ভট্টাচার্য বঙ্গদর্শন.কম-কে জানিয়েছেন, ‘‘আমন্ত্রণ জানিয়ে তারপর ভিডিও চাওয়া খুবই হাস্যকর ও অদ্ভুত। এনএসডি নাটকের স্ক্রিপ্ট চায়। তা-ও পাঠাই। কিন্তু ১৮ জানুয়ারি ওঁরা চিঠিতে জানালেন, ভিডিও রেকর্ডিং না-পাওয়ায় শো বাতিল। ২২ ফেব্রুয়ারি শো ছিল বলে দিল্লির টিকিটও কাটা হয়ে গিয়েছিল।’’

জয়রাজ ভট্টাচার্য বলছেন, ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে এই নাটক লিখেছিলেন উৎপল দত্ত, হঠাৎ মোদী সরকারের গায়ে লাগছে কেন? তিনি আরও জানান, ভারত রঙ্গ মহোৎসবে অংশগ্রহণের জন্য ভিডিও রেকর্ড-সহ অ্যাপ্লিকেশন পাঠাতে হয়। সেই রেকর্ডিং এবং অ্যাপ্লিকেশনের ভিত্তিতে নির্বাচক কমিটি নাটক মনোনীত করে। এর বাইরে নির্বাচক কমিটি কিছু নাটককে সরাসরি আমন্ত্রণ জানায় ‘আউটস্ট্যান্ডিং প্রোডাকশন’ হিসেবে। ‘তিতুমীর’-এর ক্ষেত্রে সেই বিভাগেই আমন্ত্রণ এসেছিল। আমন্ত্রণ আসার বেশ কিছুদিন পর থেকে বারবার ফোন আসতে থাকে নাটকটা সম্পর্কে নানাবিধ প্রশ্ন নিয়ে। নাটকের স্ক্রিপ্ট চাওয়া হয়। তা পাঠানোও হয়। জিজ্ঞেস করা হয়, নাটকটা কী নিয়ে? “আমি উত্তর দিই- তিতুমীরকে নিয়ে। তাতে অন্য প্রান্ত থেকে- ‘হাঁ ও তো মালুম হ্যায়।’ আমি তাতে জিজ্ঞেস করি- ‘দেন?’ এইটে উল্লেখ করার কারণ- কথাবার্তা আমার পক্ষ থেকে ইংরেজিতে এবং সরকারি পক্ষ থেকে হিন্দিতেই হয়েছে। ওঁরা আমার কাছ থেকে নিশ্চিত হতে চাইছিলেন- নাটকটা সরকার বিরোধী কিনা? আমি জানাই- ‘হ্যাঁ সরকার বিরোধী, ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে।’ প্রসঙ্গত- এবারের নাট্য উৎসবের থিম নাকি- আনসাং হিরোস অফ ইণ্ডিয়ান ফ্রিডম স্ট্রাগল।”

থিয়েটার ফর্মেশন পরিবর্তক নাট্যগোষ্ঠীর কয়েক বছর আগের নাটক ‘তিতুমীর’। তিতুমীর – যিনি শুধু ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধেই লড়াই করেননি, তিনি বাংলার জমিদারদের বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগঠিত করেছিলেন, প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন তাঁর বাঁশের কেল্লা থেকে। ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে মীর নিসার আলি তথা তিতুমীরের নাম আজও উজ্জ্বল হয়ে আছে। হিন্দু ও মুসলমান কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন তিতুমীর। জমিদার ও ব্রিটিশ নীলকরদের বিরুদ্ধে তাদের হাতে অস্ত্র তুলে নিতে উৎসাহিত করেছিলেন। চব্বিশ পরগনা ও নদিয়ার অনেক কৃষক তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। প্রজাদের ওপর অত্যাচারের প্রতিকার তিতুমীর করতে চেয়েছিলেন শান্তিপূর্ণভাবে ও সমঝোতার মাধ্যমে। কিন্তু ব্যর্থ হয়ে বারাসাতে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। কোম্পানির বিরুদ্ধে এটাই ছিল তাঁর প্রথম বিদ্রোহ।

যে নাটক একদিন স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা বলেছিল, সেই নাটকই আজ সাম্প্রতিক অস্থিরতার কথা বলে সোচ্চার কণ্ঠে। আঙুল তোলে সমস্ত অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে। মঞ্চে নির্মিত হয় বাঁশের কেল্লা। আলো-আঁধারি সেই কেল্লায় চলে জনদরদি এক মুসলিম নেতার জীবনকাহিনি। বাংলার কৃষকদের স্বাধীনতার লড়াই অতি চমৎকারভাবে জয়রাজ ভট্টাচার্য উপস্থাপন করেছেন। ‘তিতুমীর’ নাটকটি আরও একবার জানান দিয়েছে, ধর্মের উপর ভিত্তি করে নয়, দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ আসলে গরিব কৃষক ও মজুরের প্রতিরোধের ইতিহাস। জয়রাজ বলেন, “সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতি নতুন রূপে তৃতীয় বিশ্বের উপর আক্রমণ নামিয়ে আনছে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সেই ইতিহাসকে আমরা পুনঃপাঠ করছি। এছাড়াও স্বাধীন ভারতে মুসলমান সম্প্রদায়ের অবদান ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা চাই, রাষ্ট্রের এই চেষ্টা বৃথা হোক। আমরা ঠিক নাটক করছি, ওঁরাও ঠিকই বুঝেছেন। তিতুমীরের তীর ঠিক নিশানায় বিঁধেছে।”

নাটকের আরও এক অভিনেতা ঋদ্ধিবেশ ভট্টাচার্য বলেন, “শিল্পের কাজই হল প্রতিস্পর্ধী হয়ে ওঠা। এই প্রতিস্পর্ধাকে রাষ্ট্র কখনওই মেনে নেয় না।” তৎকালীন রাষ্ট্রশক্তিকে তিতুমীর এবং উৎপল দত্তের নাটক রীতিমতো বেগ দিতে পেরেছিল। এবার কি সেই বেগ পেল বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার? প্রশ্ন উঠছে সাংস্কৃতিক জগতের সমস্ত মহল থেকে।

Developed by DXDasia