শিশুশ্রম বিরোধী দিবস : কোদাল-হাতুড়ি নয়, শিশুদের হাতে থাক খাতা-বই-পেন্সিল

আজ বিশ্ব শিশুশ্রম বিরোধী দিবসে কিছু বেসরকারি প্রকল্প ও ব্যক্তি উদ্যোগের কথা

বিশ্ব শিশুশ্রম বিরোধী দিবস—প্রতি বছর এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শৈশব কোনো শ্রমের আবর্তে পিষ্ট হওয়ার জন্য নয়, তা ডানা মেলার সময়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক, আজও বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি শিশুর হাত থেকে বই-খাতা কেড়ে নিয়ে তুলে দেওয়া হয়েছে কোদাল, হাতুড়ি বা চায়ের দোকানের কেটলি। উনিসেফের একটি রিপোর্টের দিকে চোখ রাখা যাক। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ১৯৯০ সালে পাঁচ বছরের নিচে শিশুদের মৃত্যুর হার যেমন কমেছে, তেমনই ১২৯টি দেশে একই সংখ্যক ছেলেমেয়েরা আজ প্রাথমিক স্কুলে যাচ্ছে। ইউনিসেফ-এর দ্য স্টেট অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’জ চিল্ড্রেন রিপোর্টে (The State of the World's Children Report – UNESCO) তুলে ধরা হয়েছে শিশুর অধিকার রক্ষার কথা। আর এই রিপোর্টে উঠে এসেছে পশ্চিমবঙ্গের নামও।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-র সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৬ কোটি শিশু এখনও শিশুশ্রমের শিকার, যার মধ্যে একটি বড়ো অংশই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও সচেতনতার অভাবই শিশুদের এই অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আজ বিশ্ব শিশুশ্রম বিরোধী দিবসে চোখ মেলব শুধুমাত্র শিশুদের জন্য বেসরকারি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে কীভাবে পশ্চিমবঙ্গে একাধিক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে৷ এবং এ-ও সংকল্প নেব, শিশুশ্রম বিরোধী দিবস যেন একটা তারিখেই আটকে না থাকে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-র সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৬ কোটি শিশু এখনও শিশুশ্রমের শিকার, যার মধ্যে একটি বড়ো অংশই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত।

প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে মুর্শিদাবাদের ফরাক্কা থানার অন্তর্গত বাগদাবড়া অঞ্চলের শামলাপুর গ্রামে মূলত আদিবাসী সম্প্রদায়ের ছেলে-মেয়েদের নিয়ে (মার্চ ২০২১ থেকে) চালু হয়েছে গাছের তলায় ‘গাছের ইস্কুল’। আর্থিক সমস্যার কারণে যারা বইমুখী নয়, ইস্কুলে যাওয়া যাদের আর হয়ে ওঠে না, সেই সমস্ত আদিবাসী শিশুদের নিয়েই এমন উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন অংশুমান ঠাকুর। অংশুমান বঙ্গদর্শন.কম-কে জানাচ্ছেন, “পিছিয়ে পড়া আদিবাসী সম্প্রদায়ের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে শিক্ষার সম্প্রসারণ আর প্রকৃতি চেতনা গড়ে তোলাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। তাছাড়া ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে পুষ্টির অভাব দূর করার জন্য সপ্তাহে দুই দিন ডিম বিতরণের ব্যবস্থা করি। অনেকের আর্থিক সহায়তায় ‘গাছ সংগঠন’ এই ‘অনির্বাণ গাছের ইস্কুল’-এর বাচ্চাদের শিক্ষা সুনিশ্চিত করার দায়িত্ব নিয়েছি আমরা। আগামীদিনে আরও অনেককে পাশে পেলে ভবিষ্যৎ সুন্দর ও সুনিশ্চিত হবে।”

গাছের ইস্কুল, মুর্শিদাবাদ

পশ্চিম বর্ধমানের উখরা। স্কুলের নাম ‘সহজ পাঠ’। ২০১৮ সালের জুন মাসে মাত্র পনেরো জন ছাত্রছাত্রী নিয়ে একটি স্থানীয় ছোটো ক্লাবঘরে শুরু হয় পঠনপাঠন। ক্রমে ছাত্রছাত্রী সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে এখানকার একশো ষাট বছরের পুরোনো স্কুল উখরা কুঞ্জবিহারী ইনস্টিটিউশনে চলে আসে ‘সহজ পাঠ’। কয়লাখনি-অধ্যুষিত এই অঞ্চলে দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা ছাত্রছাত্রীদের পেট চালানোর তাগিদে এবং কিছুটা অভ্যাসে শ্রমিক হয়ে ওঠা একরকম সাধারণ ঘটনা। শিশুশ্রমের অভিশাপ থেকে এইসব হতভাগ্য শিশুদের বাঁচানোর ইচ্ছা থেকেই ‘সহজ পাঠ’-এর ভাবনা। সহজে শিক্ষা, তাই সহজ পাঠ।

সহজ পাঠ, পশ্চিম বর্ধমান

শিশুরা যেখানে অনেকক্ষেত্রে শ্রমিকের ভূমিকা পালন করে, সেখানে প্রশ্ন ওঠে শিশুদের সুরক্ষা কোথায়? শিশুদের অধিকার কোথায়? তাই শিশুদের হয়ে কথা বলার জন্য চাই সাধারণ মানুষদের কণ্ঠ। তাঁদের এগিয়ে আসাই একপ্রকার সুনিশ্চিত শিশু স্বাধীনতার পাঠ দিতে পারে। আর তার জন্য সবার আগে চাই শিক্ষা। চাপিয়ে দেওয়া শিক্ষা নয়, বরং নিজের ভাষায়, নিজের মতো করে তাদের আপন করে নেওয়া। ধীরে ধীরে মানুষ চেনার মতো তারা অক্ষর চিনবে, শব্দ শিখবে। এই দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন শান্তিনিকেতন থানার ওসি কস্তুরী মুখোপাধ্যায় চট্টোপাধ্যায়। পেশার তাগিদে নয়। ভালোবেসে। বীরভূম জেলার এই একটামাত্র থানাতেই রমরমিয়ে চলছে পুলিশ পাঠশালা। সেখানে পড়াশোনা করে প্রায় ১৩০ জন শিশু। দায়িত্বে শান্তিনিকেতন থানার ওসি কস্তুরী।

শিশুরা যেখানে অনেকক্ষেত্রে শ্রমিকের ভূমিকা পালন করে, সেখানে প্রশ্ন ওঠে শিশুদের সুরক্ষা কোথায়? শিশুদের অধিকার কোথায়? তাই শিশুদের হয়ে কথা বলার জন্য চাই সাধারণ মানুষদের কণ্ঠ। তাঁদের এগিয়ে আসাই একপ্রকার সুনিশ্চিত শিশু স্বাধীনতার পাঠ দিতে পারে। আর তার জন্য সবার আগে চাই শিক্ষা। চাপিয়ে দেওয়া শিক্ষা নয়, বরং নিজের ভাষায়, নিজের মতো করে তাদের আপন করে নেওয়া।

কলেজে পড়ার সময় থেকেই স্বর্ণাভ দে-র মতো কয়েকজন বন্ধু মিলে প্রতি সপ্তাহে শনি-রবিবার পুরুলিয়ার শবর অঞ্চলে যেতেন, বাচ্চাদের পড়িয়ে আবার ফিরে আসতেন। সেখানেই তাঁদের পরিচয় হয় শবরদের মধ‍্যে প্রথম গ্র‍্যাজুয়েট নির্মল প্রসাদ শবরের সঙ্গে। “মূলত ওঁর পরামর্শ ও সহায়তাতেই এই প্রতিষ্ঠানের ভাবনা আসে আমাদের মনে” বলছিলেন স্বর্ণাভ। চাকরি পাওয়ার পর শুরু হয় উদ‍্যোগ। স‍্যোশাল মিডিয়াতে ক্রাউড ফান্ডিং-এর মাধ‍্যমে ২০ লক্ষ টাকার বেশি জোগাড় হয়ে যায়। গড়ে তোলা হয় শবর ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট। দলের নাম দেওয়া হয় ‘স্বপ্নের কারখানা’। পুরুলিয়ার সিন্দরী অঞ্চলে জমি কিনে ও স্কুলবাড়ি-হোস্টেল বানিয়ে ২০১৯ সালের ২৬ জানুয়ারি থেকে শুরু হয় স্বপ্নের স্কুলবাড়ি। শুরুতে ২৫ জন শবর শিশুকে নিয়ে শুরু হয়েছিলো এই স্কুলবাড়ি, এখন সেখানে শিশুর সংখ‍্যা ৬০ ছাড়িয়েছে। প্রথমে শুধুমাত্র ছেলে শিক্ষার্থীদের নিয়ে শুরু হলেও, আগের বছর থেকে মেয়েদেরও এই প্রতিষ্ঠানের আওতায় আনা হয়েছে। ছেলে আর মেয়েদের জন‍্যে আছে আলাদা হোস্টেলও। বাচ্চারা শিশুশ্রম থেকে মুক্তি পেয়েছে।

স্বপ্নের স্কুলবাড়ি, পুরুলিয়া

২০০৩ সালের ৯ জুলাই পথ চলা শুরু হয়েছিল সৃজনের। উদ্যোক্তা বাগবাজার উইমেন্স কলেজ। লক্ষ্য, কলেজ লাগোয়া ‘হাজার বস্তি’ অঞ্চলের শিশুদের সামাজিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা। স্কুলের বরাদ্দ ক্লাস বাদেও আরও কিছু পড়াশোনা, গান, নাচ, আঁকা প্রভৃতি সৃজনশীল চারুশিল্পের সঙ্গে ওই অঞ্চলের শিশুদের পরিচয় ঘটানোই ছিল বাগবাজার উইমেন্স কলেজের শিক্ষিকাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য। তবে এই ধরনের কাজের চিন্তা ভাবনা শুরু হয়েছিল বেশ কিছুদিন আগে থেকেই। সৃজন সেন্টার ফর কমিউনিটি ওয়েলফেয়ার-এর সচিব অধ্যাপিকা ড. সংহিতা ভট্টাচার্য বঙ্গদর্শন.কম-কে জানিয়েছেন, “২০০০-২০০১ সাল নাগাদ কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপিকা ড. মীনাক্ষী রায় প্রথম কলেজের শিক্ষিকা এবং ছাত্রীদের নিয়ে এই কাজ করার চিন্তা ভাবনা শুরু করেন‌। তাঁর এই ভাবনার শরিক হন কলেজের অন্যান্য অধ্যাপক-অধ্যাপিকা, ছাত্রী ও অশিক্ষক কর্মচারীরা। তারই ফলশ্রুতি এই সংস্থা।”

কলকাতার বড়তলা থানার উদ্যোগে ২০২১ সালে সোনাগাছি এলাকার শিশুদের নিয়ে একটি কর্মশালা আয়োজিত হয়েছিল, ট্যাগলাইন ছিল ‘জয় অফ শেয়ারিং’। ইন্সপেক্টর দেবাশিস দত্ত বুঝতে পেরেছিলেন ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েগুলির অনেকের মধ্যেই প্রতিভা রয়েছে কিন্তু তা প্রকাশ করার উপযুক্ত জায়গা নেই। ২০২০ সালে তিমি বড়োতলা থানায় বদলি হয়ে আসেন। সোনাগাছির বাচ্চাদের দেখে উদ্যোগ নেন শিক্ষা দেওয়ার। তারপর থেকে সোনাগাছি এলাকার শিশুদের ভালোবাসার পাঠ দিচ্ছেন বড়তলা থানার পুলিশ কর্মকর্তারা।

‘বঙ্গদর্শন’ পোর্টালের মাধ্যমে ছড়িয়ে গিয়েছিল কাকিমার পাঠশালার কথা। আমফান ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে বাংলার নানা জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ভুবনেশ্বরী গ্রাম ছিল তার মধ্যে অন্যতম। এই সংকটকালে গ্রামের নতুন প্রজন্মের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন অসীমা ভাণ্ডারী। যাঁর পাঠশালা কাকিমার পাঠশালা নামেই পরিচিত।

শুধুমাত্র আইন নয়, শিশুশ্রম বন্ধে সচেতনতা জরুরি। ভারতে গরিব এবং পিছিয়ে পড়া পরিবারের সন্তানদের স্কুলছুট, শ্রমিকের কাজ করতে বাধ্য হওয়ার মতো নেতিবাচক বিষয়ে আটকে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে, একথা অস্বীকার করার উপায় নেই। সরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগের পাশাপাশি চায়ের দোকান, রেস্টুরেন্ট বা কারখানায় শিশু শ্রমিক দেখলেই প্রতিবাদ করতে হবে। দরকার পড়লে পুলিশে অভিযোগ জানাতে হবে। সকলে মিলে যদি এই প্রয়াস গ্রহণ করা যায়, তবেই একদিন শিশু শ্রম বন্ধ হবে। কোদাল বা হাতুড়ি নয়, শিশুদের হাতে থাকবে খাতা, বই, পেন্সিল।

কোদাল-হাতুড়ি দিয়ে হয়তো সাময়িকভাবে কয়েকটি পরিবারে কিছু অর্থ আসে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা একটি জাতির মেরুদণ্ডকে পঙ্গু করে দেয়। শিশুদের হাতে যখন খাতা, বই আর পেন্সিল থাকে, তখন তারা শুধু পড়াশোনাই শেখে না, একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখে। আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা, যাতে কোনো শিশুকে পেটের তাগিদে শৈশব বিক্রি করতে না হয়। প্রতিটি শিশুর জন্য সুরক্ষিত শৈশব ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাই হোক এই দিবসের মূল লক্ষ্য। তবেই গড়ে উঠবে একটি সুস্থ, সুন্দর ও বৈষম্যহীন পৃথিবী; যেখানে শৈশব শুধু বাঁচার স্বপ্ন দেখবে।

__________ 

বিভিন্ন সময়ে উদ্যোক্তাদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লিখিত

Developed by DXDasia