পড়াশোনা, ছবি আঁকা, নাচ, ক্যারাটের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন সৌম্যদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
নেহা দাস, রাজলক্ষ্মী বাউরি, রণজিৎ কর্মকার, জয়শ্রী বাউরি। কেউ পড়ে সপ্তম শ্রেণিতে, কেউ দ্বাদশ, কেউ বা পঞ্চম, আবার কেউ কেউ দ্বিতীয় শ্রেণিতে। শ্রেণিকক্ষে বসে পাশাপাশি। সেখানে দ্বাদশ শ্রেণির রাজলক্ষ্মী বা সপ্তম শ্রেণির নেহার মধ্যে কোনও সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্কের আড়ষ্টতা নেই। সকলেই বন্ধু। সকলেই শিখছে একই বিজ্ঞান, একই ইতিহাস, একই ভূগোল। এমন আশ্চর্য স্কুলটির নাম ‘সহজ পাঠ’।

চলছে নাচের ক্লাস
স্কুলের পোশাকি ঠিকানা উখরা, পশ্চিম বর্ধমান। প্রতিষ্ঠাতা ও মূল উদ্যোক্তা স্থানীয় এক তরুণ তুর্কি সৌম্যদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। পেশায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক। কয়লাখনি-অধ্যুষিত এই অঞ্চলে দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা ছাত্রছাত্রীদের পেট চালানোর তাগিদে এবং কিছুটা অভ্যাস-নেশায় শ্রমিক হয়ে ওঠা একরকম সাধারণ ঘটনা। শিশুশ্রমের অভিশাপ থেকে এইসব হতভাগ্য শিশুদের বাঁচানোর ইচ্ছা থেকেই ‘সহজ পাঠ’-এর ভাবনা। সহজে শিক্ষা, তাই সহজ পাঠ। সংস্কৃতির সুস্থ পরিবেশে তাদেরকে নিয়ে আসার জন্য সৌম্যদীপ শিশুদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের বুঝিয়েছেন পড়াশোনার গুরুত্ব। ২০১৮ সালের জুন মাসে মাত্র পনেরো জন ছাত্রছাত্রী নিয়ে একটি স্থানীয় ছোটো ক্লাবঘরে শুরু হয় পঠনপাঠন। ক্রমে ছাত্রছাত্রী সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে এখানকার একশো ষাট বছরের পুরোনো স্কুল উখরা কুঞ্জবিহারী ইনস্টিটিউশনে চলে আসে ‘সহজ পাঠ’। একবছর পেরিয়ে এখন ছাত্রছাত্রী সংখ্যা প্রায় দেড়শো। আরও অনেকেই ভর্তি হতে ইচ্ছুক, শুধুমাত্র জায়গার অভাবে ও আর্থিক সীমাবদ্ধতায় তা সম্ভব হচ্ছে না।

বৃক্ষরোপণে ব্যস্ত 'সহজ পাঠ'-এর ছাত্রছাত্রীরা
নামে রবীন্দ্রনাথ, ভাবনাতেও আছেন রবীন্দ্রনাথ। প্রতি রবিবার সকাল দশটায় শুরু হয় স্কুল। নিয়মানুবর্তিতা ও সময়শৃঙ্খলা মেনে চলা হয় কঠোরভাবে। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা, ছবি আঁকা, নাচ, ক্যারাটে ও ফুটবলের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন সৌম্যদীপ। সামান্য যেটুকু আর্থিক সহায়তা পান, তা আসে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘ন্যাশনাল কোলফিল্ড’স সিটিজেন্স ফোরাম’-এর পক্ষ থেকে। এছাড়া স্থানীয় বন্ধুবান্ধব, কলেজের বন্ধুরাও কিছু-কিছু সাহায্য করেন। ছোটোদের সমস্ত বিষয় পড়ানো হয়। একাদশ বা দ্বাদশ শ্রেণিতে যারা পড়ে, তাদের জন্য আলাদাভাবে গৃহশিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে ‘সহজ পাঠ’-এর পক্ষ থেকে। যতটা সম্ভব, হাতে-কলমে ও গল্পচ্ছলে শিক্ষাদানের চেষ্টা করা হয় এখানে। নানা হাতের কাজেও এখানকার ছাত্রছাত্রীরা দক্ষ।

পরিবেশ সচেতনতায় আবর্জনা পরিস্কারের গুরুত্ব সম্পর্কে অবগত করা হচ্ছে
শিক্ষক-শিক্ষিকা সকলেই সৌম্যদীপের বাল্যবন্ধু। খুবই স্বল্প বেতন পান তাঁরা, কিন্তু শুরুর দিন থেকে একদিনও ক্লাস বন্ধ হয়নি। তাঁদের বক্তব্য- “ছাত্রছাত্রীরা, তাদের অভিভাবকরাও সকলেই খুব সহযোগিতা করেন। সব মিলিয়ে একটা পরিবারের মতো হয়ে গিয়েছি আমরা। আমরা চাইছি, ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কটা মধুর হোক, যতটা পারব ওদের সঙ্গে ফ্র্যাঙ্কলি মিশব।”
একজন ছাত্রীকে নিয়ে একটি সাম্প্রতিক ঘটনার কথা বললেন এক শিক্ষিকা- “মেয়েটি যখন ক্লাস টেনে ওঠে, তখন ওর বিয়ে হয়ে যায়। ও আবার এখন পড়াশোনা শুরু করতে চায় বলে আমাদের এখানে সাহায্যের জন্য এসেছিল। তাকে আমরা শিক্ষার মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনতে পেরেছি। আরও দু’জনকে আমরা ক্লাস ইলেভেনে ডোনেশন মকুব করে স্কুলে ভর্তি করতে পেরেছি। যখন ওই বিবাহিত মেয়েটি আবার নতুন করে পড়াশোনা শুরু করতে চায় বলে আমাদের কাছে এসেছিল, তখন আমার মনে হয়েছিল, ‘সহজ পাঠ’ হয়তো সত্যিই অতটা এগিয়ে যেতে পেরেছে।”

শেখানো হচ্ছে গুড টাচ ব্যাড টাচ
বিকালে হয় নাচের ক্লাস। পঁয়তাল্লিশ জন ছাত্রী এখানে নাচ শেখে। প্রত্যেককেই খুব আগ্রহের সঙ্গে নৃত্য অনুশীলনে ব্যস্ত দেখা গেল। নাচের শিক্ষিকার কথায়- “নাচের প্রতি ওদের খুব আগ্রহ। এতজনকে সামলানো একটু অসুবিধার ঠিকই, তবে ওরাও তো ছোটো। একটু তো দুরন্ত হবেই। আমার নিজের খুব ভালো লাগছে ওদের শেখাতে পেরে।”
সৌরজগৎ পড়াচ্ছেন সৌম্যদীপ
ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলেও বোঝা গেল, প্রত্যেকে ফর্মাল স্কুলে পড়লেও এখানকার পঠনপাঠনের ধরন তাদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। পড়ানোর জন্য প্রোজেক্টারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মাঝেমাঝে তাতে দেখানো হয় ‘লায়ন কিং’ কিংবা ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’। পালিত হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ক্লাসের শেষে প্রার্থনায় তারা সমস্বরে আবৃত্তি করে ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য/ উচ্চ যেথা শির।’

ছাত্র রূপম দাসের হাতের কাজ, মুগ আর দেশলাই কাঠির অংশ দিয়ে বানিয়েছে এই বাড়ি
পড়াশোনা ও বিভিন্ন আনুষঙ্গিক কলাশৈলীর পাশাপাশি অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে প্রদান করা হচ্ছে নীতিশিক্ষা। বয়োঃজ্যেষ্ঠ কেউ ক্লাসে ঢুকলেই সকলে উঠে দাঁড়িয়ে বলবে ‘গুড মর্নিং’। নম্রভাবে কথা বলা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সমস্ত কিছুই শেখানো হচ্ছে তাদের। বর্তমান পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে গুড টাচ, ব্যাড টাচের শিক্ষা দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন সৌম্যদীপ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবেশ সচেতনতার শিক্ষা। ছুটির সময় সকলের হাতে বিস্কুটের প্যাকেট দিতে দিতে সৌম্যদীপ আদেশ করেন উচ্চৈঃস্বরে- “কেউ রাস্তায় প্যাকেট ফেলবে না।” প্যাকেট সত্যিই ফেলে না কেউ। পালিত হয় বৃক্ষরোপণও। শুধু তাই নয়, রাস্তায় চলতে চলতে গাছের ফুলপাতা ছেঁড়াও একরকম ভুলে গেছে ওরা। কারণ, ওদের যে শেখানো হয়েছে- “গাছ আমাদের অক্সিজেন দেয়, তাই গাছের ক্ষতি করতে নেই।”

প্রার্থনায় সকলে সমস্বরে আবৃত্তি করে 'চিত্ত যেথা ভয় শূন্য, উচ্চ যেথা শির'
বাচ্চারা যাতে ভালো বই পড়তে পারে, সেজন্য পঞ্চায়েত-উপপ্রধানের সঙ্গে কথা বলে গ্রামীণ পাঠাগারে বাচ্চাদের ফ্রি-অ্যাক্সেসের ব্যবস্থা করেছেন সৌম্যদীপ। এখন নিজেদের একটি আলাদা গ্রন্থাগার খুলছেন তিনি। ঘর, বইয়ের র্যানক, চেয়ার-টেবিল, বিদ্যুতের ব্যবস্থা হয়ে গেছে। বইয়ের ব্যাপারে সাহায্য পেয়েছেন উখরা ও কলকাতার বন্ধুদের কাছ থেকে। অন্যান্য বিষয়ে সাহায্য পেয়েছেন তাঁর কলেজ-সিনিয়র ও অধ্যাপকদের কাছ থেকে। ভীষণভাবে পাশে পেয়েছেন পরিবারকেও। ভবিষ্যতে একটি স্থায়ী ভবন গড়ার পরিকল্পনাও আছে তাঁর। মানুষের ভালোবাসা, আর্থিক প্রতিকূলতা সব নিয়েই স্বপ্নের উদ্দেশ্যে এগোচ্ছেন সৌম্যদীপ। সেই স্বপ্ন মানুষ গড়ার, কেরিয়ারিস্ট গড়ার নয়।

স্ক্রিনে দেখানো হচ্ছে 'গুপি গাইন বাঘা বাইন' চলচ্চিত্র
নিজস্ব চিত্র (সর্বসত্ব সংরক্ষিত)