সোনাগাছি এলাকার শিশুদের ভালোবাসার পাঠ দিচ্ছেন বড়তলা থানার পুলিশ কর্মকর্তারা

এই উদ্যোগকে তাঁরা বলছেন ‘জয় অফ শেয়ারিং’

২ ফেব্রুয়ারি, গত শনিবার সন্ধেটা ছিল অন্যরকম। মধ্য কলকাতার যতীন্দ্র মোহন অ্যাভিনিউয়ের গণভবনের ভিতরে শতাধিক শিশু শান্ত হয়ে বসে, একমনে দেখে যাচ্ছিল হরবোলা তন্ময় অধিকারীর উপস্থাপনা। ছোটো ছোটো এই ছেলেমেয়েগুলির মধ্যেই কেউ কেউ বড়ো হয়ে হরবোলা হতে চায়, আবার কেউ কেউ জাদুকর।

বেশিরভাগ শিশুই সোনাগাছি এলাকার, যা এশিয়ার বৃহত্তম রেড-লাইট এরিয়াগুলির অন্যতম একটি। হাজার হাজার মহিলা এই এলাকার আশপাশের অলিগলিগুলিতে অসংখ্য ছোটো ছোটো ঘর দখল করে উপার্জন করে চলছে। অনেকেই এই এলাকায় অনাবাসী, আবার অনেকে পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে পতিতাবৃত্তি করে এখানেই সারাজীবন কাটিয়ে দিয়েছেন।

এঁদের সন্তানেরা কি কখনও প্রাত্যহিক জীবনে এই বিষয়গুলো কাটিয়ে ওঠার আশা করতে পারে? কুখ্যাত রেডলাইট এরিয়ায় জন্মবার ‘কলঙ্ক’ নিয়ে তারা কি কখনও এই পৃথিবীতে নিজেদের পছন্দমতো পথ বেছে নিতে পারে? এক্ষেত্রে, ১ নম্বর রাজকৃষ্ণ স্ট্রিটে কলকাতা পুলিশের বড়তলা থানার অফিসার ইনচার্জ, ইন্সপেক্টর দেবাশিস দত্তের উত্তর হল ‘হ্যাঁ’।  

বিশ্বের বেশিরভাগ জায়গাতেই যৌনকর্মী এবং পুলিশের মধ্যে যে ধরনের বিপ্রতীপ সম্পর্ক, তা বিবেচনা করে বড়তলা থানার  কমিউনিটি পুলিশিং-এর এই প্রচেষ্টা সাধারণ মনে না হওটাই সমীচীন। সত্যি কথা বলতে, বড়তলা থানার এই উদ্যোগ যতটা না সোনাগাছির জন্য, তার চেয়ে অনেক বেশি সেখানকার বঞ্চিত শিশুদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

কী সেই উদ্যোগ? মূলত সামাজিক-শিক্ষামূলক প্রকৃতির, ব্যাপকার্থে যার থিম হল ‘জয় অফ শেয়ারিং’ বা আনন্দ ভাগ করে নেওয়া। বড়তলা থানার উদ্যোগেই ২০২১ সালে সোনাগাছি এলাকার শিশুদের নিয়ে একটি ইভেন্ট তথা কর্মশালা আয়োজিত হয়েছিল, তখনই এই ‘ট্যাগলাইন’ বা বাক্যাংশটি (‘Joy of Sharing’) প্রথম ব্যবহার করা হয়েছিল। ইন্সপেক্টর দেবাশিস দত্ত বুঝতে পেরেছিলেন ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েগুলির অনেকের মধ্যেই প্রতিভা রয়েছে কিন্তু তা প্রকাশ করার উপযুক্ত জায়গা নেই। তাঁর কথায় “২০২০ সালে আমি এই থানায় বদলি হয়ে আসি। সোনাগাছির বাচ্চাদের দেখি। তারপরই এই উদ্যোগ।”

যেমন তিনি এমন কিছু বাচ্চাদের হদিশ পেয়েছিলেন যার মধ্যে একটি ছেলের মা গতবছর একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়, একটি বাচ্চা মেয়ে যে ফুটবলার হতে চেয়ে তাঁর কাছে সাহায্য চায়, আরেকটি বাচ্চা সে চায় জাদুকর হতে। তাদের সঙ্গে থেকে, তাদের সবার কথা জেনে, দেবাশিসবাবু শিল্প, ম্যাজিক এবং সাধারণ জ্ঞান সমন্বিত একটি কর্মশালার পরিকল্পনা করেছেন। “আমরা সাধারণ জ্ঞানের আরও বই কিনে বাচ্চাদের হাতে তুলে দেবো। তারপর এমন একটা প্রতিযোগিতার আয়োজন করবো, যেখানে জিততে গেলে বইগুলো ভালো করে পড়তে হবে। বইয়ের পোকা একবার কামড়ালে, আর ফেরার উপায় থাকে না।” হাসতে হাসতে বলেন দেবাশিসবাবু।

ইন্সপেক্টর দেবাশিস দত্ত ও তাঁর টিম

ইতিমধ্যে কমবেশি ২৫০ শিশু পরিকল্পনাটির ছত্রছায়ায় এসেছে। এর মাধ্যমে যেমন তারা ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে, তেমনই শিক্ষার গুরুত্ব বুঝতে শিখবে এবং স্কুলে যেতে আগ্রহী হয়ে উঠবে। এই পুরো প্রক্রিয়াটির মধ্যে দিয়ে যেতে গিয়ে পুলিশকর্মী এবং বাচ্চারা একে অপরের বন্ধু হয়ে উঠেছে। আবারও হেসে উঠে দেবাশিসবাবু বলেন “আমাদের সঙ্গে দেখা হলেই ওরা চুমু খায়, ওদেরকে ভালো না বেসে উপায় নেই। ওরা জানে আমাদের কাছে নিজেদের স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষার কথা ওরা খোলা মনে জানাতে পারে এবং আমরা তা পূরণের যথাসাধ্য চেষ্টা করবো।”   

শুধু ছোটোরা নয়, এই উদ্যোগে সামিল হয়েছে তাদের মায়েরাও। ‘ফুচকা দিবস’ ইত্যাদি মজাদার ক্রিয়াকলাপে অংশ নিয়ে তাঁদের সন্তানদের যথাসম্ভব সুস্থ পরিবেশ উপহার দিতে বদ্ধপরিকর হয়ে উঠছেন তাঁরা।

পুলিশকর্মীদের সৌজন্যে কোভিডের সময়ও বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। যার মধ্যে অন্যতম কমিউনিটি কিচেন। এছাড়াও বড়তলার ১৫০০-এরও বেশি বাসিন্দাকে খাওয়ানোর বন্দোবস্ত করা হয় পয়লা বৈশাখে। দেবাশিসবাবুর কথায় “আমি ব্যাপারটাকে আরও উজ্জ্বল করে তোলার জন্য একজন বেলুনওয়ালাকে ঠিক করেছিলাম এবং বাচ্চারা যে কী খুশি হয়েছিল নিজেদের ইচ্ছেমতো বেলুন সংগ্রহ করতে পেরে, এটা দেখার মতোই একটা বিষয় ছিল।”   

এই সবকিছুর জন্য অর্থ সংস্থান হয় কত্থেকে? বেশিরভাগ টাকা ওঠে বড়তলা থানা থেকেই এছাড়া যখন খরচ সামলানো চাপের হয়ে ওঠে তখন বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষীদের ওপর ভরসা করতে হয়। দেবাশিসবাবু বলেন, “আমরা আরও শুভাকাঙ্ক্ষীদের আমন্ত্রণ জানাতেই পারি যতদিন পর্যন্ত এটা একটা সামাজিক ইভেন্ট থাকবে।” এ সবকিছু জেনে, যদি আপনাদের মধ্যে কেউ এই ধরনের শিশুদেরকে, যারা সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচার জন্য প্রতিমুহূর্তে সংগ্রাম করে চলেছে, তাদের একটা উন্নত জীবন উপহার দিতে উৎসাহিত হয়ে থাকেন, তাঁরা এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝে গিয়েছেন কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।   

ইংরেজিতে মূল লেখাটি পড়তে এখানে করুন।

Developed by DXDasia