কলেজ লাগোয়া ‘হাজার বস্তি’ অঞ্চলের শিশুদের শিক্ষিত করছেন অধ্যাপিকারা
স্ত্রীশিক্ষা প্রসঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, কোনো পরিবারে মা শিক্ষিত হলে সেই পরিবারের সন্তানরাও সুশিক্ষিত হবে। তবে সেই শিক্ষিতা মা আর সুসন্তানের পরিবার যদি শুধু রক্তের সম্পর্কের গণ্ডিতে আবদ্ধ না থেকে আর একটু বড়ো পরিসরে হয়, তাহলে কী হয় সেটা জানে উত্তর কলকাতার বাগবাজার অঞ্চল। শুধু সিলেবাসভিত্তিক পড়াশোনা না, তার বাইরেও যে বৃহত্তর জগৎ আছে এবং সেই জগতের প্রতিও ছাত্র-ছাত্রীদের সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকে, এই পাঠ ছাত্রীদের হাতে-কলমে শেখাচ্ছেন বাগবাজার উইমেন্স কলেজ-এর শিক্ষিকা-শিক্ষাকর্মীরা, আর ছাত্রীদের সেই সামাজিক শিক্ষার পাঠশালার নাম – সৃজন সেন্টার ফর কমিউনিটি ওয়েলফেয়ার।

শুধু সিলেবাসভিত্তিক পড়াশোনা না, তার বাইরেও যে বৃহত্তর জগৎ আছে এবং সেই জগতের প্রতিও ছাত্র-ছাত্রীদের সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকে, এই পাঠ ছাত্রীদের হাতে-কলমে শেখাচ্ছেন বাগবাজার উইমেন্স কলেজ-এর শিক্ষিকা-শিক্ষাকর্মীরা।
আজ থেকে প্রায় ২০ বছর আগে ২০০৩ সালের ৯ জুলাই পথ চলা শুরু হয়েছিল সৃজনের। লক্ষ্য, কলেজ লাগোয়া ‘হাজার বস্তি’ অঞ্চলের শিশুদের সামাজিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা। স্কুলের বরাদ্দ ক্লাস বাদেও আরও কিছু পড়াশোনা, গান, নাচ, আঁকা প্রভৃতি সৃজনশীল চারুশিল্পের সঙ্গে ওই অঞ্চলের শিশুদের পরিচয় ঘটানোই ছিল বাগবাজার উইমেন্স কলেজের শিক্ষিকাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য। তবে এই ধরনের কাজের চিন্তা ভাবনা শুরু হয়েছিল বেশ কিছুদিন আগে থেকেই। সৃজন সেন্টার ফর কমিউনিটি ওয়েলফেয়ার-এর বর্তমান সচিব অধ্যাপিকা ড. সংহিতা ভট্টাচার্য বঙ্গদর্শন.কম-কে জানিয়েছেন, “২০০০-২০০১ সাল নাগাদ কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপিকা ড. মীনাক্ষী রায় প্রথম কলেজের শিক্ষিকা এবং ছাত্রীদের নিয়ে এই কাজ করার চিন্তা ভাবনা শুরু করেন। তাঁর এই ভাবনার শরিক হন কলেজের অন্যান্য অধ্যাপক-অধ্যাপিকা, ছাত্রী ও অশিক্ষক কর্মচারীরা। তারই ফলশ্রুতি এই সংস্থা।”

২০০৫ সালের এপ্রিল মাসে সৃজন সেন্টার ফর কমিউনিটি ওয়েলফেয়ার রেজিস্ট্রেশন প্রাপ্ত এনজিও হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হয়। সমাজের কিছু শিশুকে আলো দেখানোর এই লড়াইয়ে শিক্ষিকা, শিক্ষাকর্মীদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে কলেজের বর্তমান ও প্রাক্তন ছাত্রীরাও। লেখাপড়ার পাশাপাশি, নাচ, গান, আঁকা প্রভৃতি শিক্ষার মাধ্যমে তারা ছোটো ছোটো শিশুদের মনে বুনে দিতে থাকে সৃজনশীলতার বীজ। দীর্ঘ কুড়ি বছরের পথচলায় বেশ কিছু বীজ আজ মহীরুহে পরিণত, যারা আবার নতুন করে শিল্পের বীজ বোনে আগামী প্রজন্মের বুকে।
কীভাবে চলে এত বড়ো সংস্থাটি? এই ব্যাপারে অধ্যাপিকা ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, “সংস্থাটি মূলত চলে কলেজের কর্মী ও ছাত্রীদের অর্থ সাহায্যেই। ভর্তির সময় ছাত্রীদের কাছ থেকে কিছু অর্থ অনুদান হিসাবে গ্রহণ করা হয়, তাছাড়া কলেজের কর্মীরাও প্রয়োজন মতো নির্দ্বিধায় অর্থ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। এছাড়াও কলেজের বাইরে শিক্ষিকাদের পরিচিত অনেকেই বিদেশে থেকে শরিক হয়েছেন সংস্থাটির আর্থিক প্রয়োজনে।” পাশাপাশি তিনি আরও জানিয়েছেন, এই সংস্থার আর্থিক সমৃদ্ধির জন্য তাঁদের কিছু ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও রয়েছে।
শিক্ষার পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধির ক্ষেত্রেও তাঁরা সচেতন করে তোলে ওই অঞ্চলের বাসিন্দাদের। তাই সাবান, স্যানিটাইজার, ডিটারজেন্ট পাউডারের পাশাপাশি স্যানেটারি ন্যাপকিনের মতো অতিপ্রয়োজনীয় জিনিস বিতরণ করেছেন তাদের মধ্যে।

শুধু শিক্ষাদান নয়, কোভিডকালে লকডাউনের বিভীষিকায়, ২০২১ সালে হাজার বস্তির অগ্নিকাণ্ড সবক্ষেত্রেই আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের সেই উপকারী দৈত্যটার মতোই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে বাগবাজার উইমেন্স কলেজ-এর অপত্য প্রতিষ্ঠানটি। তাই শিক্ষার পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধির ক্ষেত্রেও তাঁরা সচেতন করে তোলে ওই অঞ্চলের বাসিন্দাদের। তাই সাবান, স্যানিটাইজার, ডিটারজেন্ট পাউডারের পাশাপাশি স্যানেটারি ন্যাপকিনের মতো অতিপ্রয়োজনীয় জিনিস বিতরণ করেছেন তাদের মধ্যে।
আরও পড়ুন: ডুয়ার্সের ফুলের বাগানে যুদ্ধবিরোধী পাঠশালা

সুস্থ ও সুশিক্ষিত মানুষ যেকোনো দেশেরই মানবসম্পদ। কিন্তু তার থেকেও মূ্ল্যবান সুন্দর মনন, যা গড়ে তোলে অনেক সুস্থ ও সুশিক্ষিত নাগরিক। মাতৃস্নেহে সেই মানবসম্পদ গড়ে তুলতে আর সেই সম্পদের সঠিক ব্যবহারের কাজে প্রায় দু-দশক ধরে ব্রতী সৃজন সেন্টার ফর কমিউনিটি ওয়েলফেয়ার। সমাজের অস্থির সময়ে ছাত্রী-শিক্ষিকাদের এই যৌথ প্রয়াস দৃষ্টান্ত হয়ে উঠছে সমাজের বুকে।
অধ্যাপিকা সংহিতা ভট্টাচার্যের যোগাযোগ নম্বর: ৯৮৩০০৩৩৯৭৪
সৃজন সেন্টার ফর কমিউনিটি ওয়েলফেয়ার ফেসবুক পেজ: https://www.facebook.com/groups/179333782258990/