ফোক এবং আরবান মোটিফে মেয়েদের চিত্রভাষা
অধ্যাপিকারা ছাত্রীদের সঙ্গে
“আমরা ছবি আঁকি না, কিন্তু ছবি আমাদের প্রতিদিনই আঁকতে হয় কারণ ভূগোল নিয়ে পড়ি। রং-তুলির বদলে আমাদের স্কেল-পেন্সিল লাগে। এরকম ছবি প্রথমবার আঁকছি। দারুণ অভিজ্ঞতা।” বলছিল উইমেন্স ক্রিশ্চান কলেজের ছাত্রী জুনিয়া সেনগুপ্ত। দেওয়ালে উরলির নকশা আঁকতে আঁকতে গলা ছেড়ে গানও গাইছিল সে। জুনিয়া, নেহাদের আশেপাশেই ঘোরাফেরা করছিলেন তাদের অধ্যাপিকারা। মনে মনে গুনগুন করছিলেন তাঁরাও, মনে মনে ছবিও আঁকছিলেন। সকলের চোখেমুখেই বিস্ময়, উদ্দীপনা। হবে নাই বা কেন! ১৯ জুলাই ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত, নীরোজবাসিনী সোম ও স্টেলা বোসের হাতে গড়া উইমেন্স ক্রিশ্চান কলেজে তখন খানিক নিভৃতে এমন একটি ঘটনা ঘটছে, যা মনের গভীরতাকে স্পর্শ করে, বোধ জাগ্রত করে।
২০১৮ সালে উইমেন্স ক্রিশ্চান কলেজে তৈরি হয় হয় ফোক রিসার্চ আর্কাইভ ‘সুমেলি’। লোকশিল্পকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এবং নাগরিক পরিসরে শিকড়ের সন্ধান জারি রাখার জন্য যে সংগঠন কাজ করে চলেছে সারা বছর ধরে। সুমেলি’র সহযোগিতায় উইমেন্স ক্রিশ্চান কলেজের কালচারাল কমিটি আয়োজন করেছিল দু’দিন ব্যাপী (১৭-১৮ মার্চ) একটি কর্মশালার। শিক্ষা মাধ্যমে ফোক এবং আরবান মোটিফের দৃশ্যভাষা কী রকম প্রভাব ফেলে, এই ছিল কর্মশালার বিষয়। আঁকার খাতায় বা ফোনে নয়, অপটূ হাতে অল্পসময়ের মধ্যে দেওয়ালে সরাসরি ম্যুরাল আঁকার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মনে কী ধরনের প্রভাব পড়ছে, তাদের মনে কোনও দৃশ্যচেতনা তৈরি হচ্ছে কিনা দেখতে চেয়েছিলেন শিক্ষিকারা। ‘সৃজনশীলতার মধ্যে দিয়ে শিক্ষা’ এই ছিল কর্মশালার মূল ভাবনা।


এই কর্মশালায় অংশ নিয়েছিল কলেজের বর্তমান এবং প্রাক্তন ছাত্রীরা। যারা স্নাতক শেষ করে বেরিয়ে যাবে, তারা যাতে পরবর্তী কালে এই কর্মকান্ড এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে সেকথা মাথায় রেখেই এই ব্যবস্থা। এই ভাবনার নেপথ্যে রয়েছেন কলেজের অধ্যক্ষা ড. অজন্তা পাল। কলেজের হাল শক্ত হাতে ধরে রেখেছেন তিনিই। এখনও নিয়মিত ইংরেজি বিভাগে ক্লাস নেন। নিজে সুলেখিকাও। তাঁর প্রশ্রয়েই বছরব্যাপী নানান কর্মশালা, অনুষ্ঠান ইত্যাদি চলতে থাকে কলেজে। “আমি ভাবতেই পারিনি এত ছোটো পরিসরে এই কর্মশালা এতটা সফল হবে। মেয়েরা যেভাবে উৎসাহিত হয়ে উঠেছে ছবি আঁকায়, অনেকেই আছে যারা কখনও ছবি আঁকেনি, এতটা আমি আশা করিনি। মেয়েদের অংশগ্রহণ আমাকে চমকে দিয়েছে। এক কথায় দারুণ।” বলছিলেন ড. অজন্তা পাল।
দেওয়ালে দেওয়ালে ফুটে উঠেছে কালীঘাটের পটশিল্পে ‘উইমেন্স এমপাওয়ারমেন্ট’, আর্বান মোটিফে বর্তমান প্রজন্মের মেয়েদের ঘরে-বাইরের কথা।
ফোক এবং আরবান মোটিফ নিয়ে এই কর্মশালার মেন্টর ছিলেন শিল্পী হিরণ মিত্র। হিরণ মিত্র ভারতীয় শিল্প জগতের মহীরুহ, অভিভাবক। একজন প্রকৃত শিল্পীর জীবনকে যাপন করেন প্রতিমুহূর্তে। বিগত কয়েক দশক ধরে তিনি শিল্পচর্চা করে চলেছেন। এই চর্চার একটা বড়ো অংশ ফোক-আরবান আর্ট। স্রোতের বিপরীতে নিজেকে নিজেই এক অমীমাংসিত সংঘর্ষের ভিতর ঠেলে দিয়ে এক বিমূর্ত, ব্যক্তিগত চিত্রভাষার সঙ্গে পরিচয় করিয়েছেন আমাদের। এই কর্মশালায় ৪’/৩’ ফুটের একটি ক্যানভাসে অ্যাক্রেলিকের কাজ করেছেন তিনি। ৩২টি বইয়ের প্রদর্শনী হয়েছে এই কর্মশালায়। যতীন্দ্র জৈন’র কালীঘাটের পটের উপরে লেখা একটি বই এছাড়াও মোটিফ নিয়ে মূল্যবান কিছু বই হিরণ মিত্র তাঁর সংগ্রহ থেকে এই কর্মশালার জন্য দিয়েছিলেন। সব সম্প্রদায়ের মধ্যে সব বয়সের মধ্যে শিল্প চেতনা বর্তমান। একটু উসকে দেওয়ার অপেক্ষা, একথাই আজীবন বিশ্বাস করেছেন শিল্পী।

হিরণ মিত্র ও ড. অজন্তা পাল
উইমেন্স ক্রিশ্চান কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপিকা জিনিয়া রায় (অধ্যাপিকা নিবেদিতা রাহা এবং তিনি ‘সুমেলি’র যৌথ কনভেনর) বলছিলেন, “হিরণ মিত্র ছাড়া এই কর্মশালা হত না, আমরা কাজটা করতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম হিরণ মিত্র’র বয়স আর আমাদের কলেজের বয়স একই। উনি এত বছর ধরে যে দর্শনে কাজ করে চলেছেন, সেটার সঙ্গে আমাদের পড়ুয়াদের যুক্ত করা প্রয়োজন ছিল বলেই আমাদের মনে হয়েছে। এই কর্মশালার জন্য ওনার মতো শিল্পীই যথাযথ। আর্বান মোটিফের বিষয়ে আমরা ওনার মহীনের ঘোড়াগুলির লোগো বা কভার ডিজাইন এগুলোর উল্লেখ করেছিলাম। আমরা ওনাকে ‘লিভিং লেজেন্ড অফ মহীন’ বলি।”
এই কর্মশালার অপর মেন্টর ছিলেন কাঞ্চন গুহ। হিরণ মিত্রের দীর্ঘ দিনের চিত্র সহকারী। শিল্পগুরু অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত ‘সোসাইটি অব ওরিন্টাল’-এর স্নাতক। সাধারণত আদিবাসী জনজাতি, গ্রামীণ অর্ধশিক্ষিত মানুষের মধ্যে, মেয়েদের মধ্যে বিশেষ করে কিশোরীদের মধ্যে, ছোটো শিশুদের মধ্যে কাজ করতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। নন ফর্মাল শিল্প শিক্ষায় জীবন কাটাচ্ছেন। এই কর্মশালায় পড়ুয়াদের ছবি আঁকার সময় সর্বক্ষণ পাশে পাশে থাকতে দেখা যাচ্ছিল তাঁকে।


লোকশিল্প এবং সংস্কৃতির বহমানতায় অনুল্লেখিত অজস্র নারীর অবদানকে স্মরণে রেখে দু’দিন ব্যাপী এই আলোচনা আর কর্মশালার আসরে আজকের প্রজন্মকে শিল্পী হিরণ মিত্র এবং ড. অজন্তা পাল তাঁদের বক্তৃতায় মোটিফের নির্মাণ এবং নাগরিক শিল্পের পরিসরে লোক শিল্পের চর্চা কেন ক্রমশঃ অতি গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্য, এই বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন করেছেন। কর্মশালার প্রথম দিন আলাপ-আলোচনার মধ্যে দিয়ে কাটলেও শেষদিন ছাত্রীরা ঝাঁপিয়ে পড়ে ছবি আঁকার কর্মযজ্ঞে। দেওয়ালে দেওয়ালে ফুটে উঠতে থাকে কালীঘাটের পটশিল্পে ‘উইমেন্স এমপাওয়ারমেন্ট’, আর্বান মোটিফে বর্তমান প্রজন্মের মেয়েদের ঘরে-বাইরের কথা। সবশেষে অংশগ্রহণকারী ছাত্রীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় শংসাপত্র।
কেমন লাগলো এই কর্মশালায় অংশগ্রহণ করে? হিরণ মিত্র বলছিলেন, “একটি নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের কর্মশালার অভিজ্ঞতা আমার ছিল না। বিশেষ করে অচেনা মানুষ জন কীভাবে দুদিনের ছোট্ট কর্মশালায় এটাকে সফল করে তুলবে? বেশ সংশয় ছিল। আমি অল্প সময়ে প্রাক ইতিহাসের দেওয়াল অলংকরণ, পট চিত্র, কাঁথার আলপনা ইত্যাদির একটা দৃশ্যভাষার সংযোগ ঘটাই। সহকারী হিসেবে কাঞ্চনকে পাই। এদের উৎসাহ বোঝদারী ও বিষয়কে দ্রুত বুঝে ওঠা, তারপরে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়া আমাকে প্রেরণা জোগালো। কাজ যে পথে সমাধার দিকে গেল, তাতে আমি গর্ব অনুভব করার সুযোগ পেলাম। গর্ব অনুভব করলাম। আমি ভালো শিক্ষক নই, কিন্তু শিল্পচর্চা আমাকে শিখিয়েছে অন্যকে কীভাবে চর্চায় অনুপ্রাণিত করা যায়। সেই চেষ্টা করলাম এবং অনেকটা সফলও হলাম। ধন্যবাদ কলেজ কতৃপক্ষকে, অধ্যক্ষা ড. অজন্তা পালকে ও অধ্যাপক জিনিয়া রায়কে, যাঁদের প্রস্তাব ছাড়া এটা ঘটতো না। কাজটির প্রভাব সুদুর প্রসারী হতে বাধ্য। এই প্রতিষ্ঠানের বয়স আার আমার বয়স একই। তাদের এই দীর্ঘ যাত্রায় এমন ঘটনা তারা দেখেনি। এটাও গর্বের।”
ফোক এবং আরবান মোটিফ নিয়ে এই কর্মশালাটি কিন্তু এখানেই শেষ হয়ে যায়নি। অধ্যাপিকা জিনিয়া রায় জানালেন, এবছরই এই কর্মশালার আরও দুটি সেশন হবে। এই পৃথিবীতে একদিকে যখন রাত, অন্যদিকে দিন। সেরকম ভাবেই আমাদের সমাজে যা যা ঘটছে সবটা অন্ধকার হতে পারে না, অন্ধকারের ভিতর আলোও আছে। আমাদের তা খুঁজে নিতে হবে। ঠিক যেমন ভাবে আলো খুঁজে নিচ্ছে কালীঘাটের ৭৭ বছরের পুরোনো, বাংলার অন্যতম নারীশিক্ষার পথপ্রদর্শক এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি।