
সত্যরঞ্জন দলুই ও সমর কুমার মণ্ডলের ‘উদ্যান লাইব্রেরি’
অভাবের কারণে, ১৯৮৯ সালে মাধ্যমিক পাশ করেই চাকরির সন্ধানে বেরিয়ে পড়তে হয়েছিল দক্ষিণ ২৪ পরগণার পাথরপ্রতিমার লক্ষ্মীপুরের সত্যরঞ্জন দলুইকে। তখনই কলকাতায় চলে আসা। কম্পিউটার শেখা শুরু করে ডিটিপি করার একটা চাকরিও পেলেন তিনি। ১০ বছর সেই কাজ করে তেমন মাইনে বাড়ল না দেখে অবশেষে প্রাইভেট সিকিওরিটি এজেন্সিতে কাজ নিয়ে সেই এজেন্সির মাধ্যমেই ২০১০ সালে উত্তর কলকাতার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের জগৎ মুখার্জি পার্কে নিরাপত্তা রক্ষীর কাজ শুরু করেন সত্যরঞ্জন।
সমর কুমার মণ্ডল। তাঁর বাড়ি উত্তর কলকাতার শ্যাম পার্কের কাছে রামকান্ত বোস স্ট্রিটে। সমর কুমার মণ্ডলের বয়স যখন মাত্র ৬ বছর, তখন তাঁর বাবা মারা যান। তার পরের বছর গলব্লাডারে স্টোন অপারেশন করার কয়েকদিন পর চিকিৎসার গাফিলতিতে তাঁর মায়েরও মৃত্যু হয়। ভালো তবলা বাজাতে পারেন, ভালো মাউথ অর্গানও বাজাতে পারেন। তবে সেসবের সঙ্গে এখন তাঁর কোনও যোগাযোগ নেই, বলছিলেন সমর কুমার মণ্ডল। তাঁর আফসোস, “ওই অল্প বয়সে বাবা, মা চলে না গেলে আমিও পড়তে পারতাম।” ঠিক যে ভাবে সত্যরঞ্জন দলুইও এখন আফসোস করে বলেন, “আমার জীবনটাও অন্য রকম হতে পারত। সংসারের অভাব সেটা হতে দিল না।”

তবে, তাঁদের দুজনেরই মনের সেই যন্ত্রণা অনেকটাই প্রশমিত হয়ে গিয়েছে এখন। সত্যরঞ্জনবাবু এখন উত্তর কলকাতার যতীন্দ্র মোহন অ্যাভিনিউ-এর উপর কলকাতা পুরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের জগৎ মুখার্জি পার্কের ভিতর “উদ্যান লাইব্রেরি”-র প্রতিষ্ঠাতা। আর এই কাজে তাঁর সহযোগী সমর কুমার মণ্ডল। ১০ হাজারেরও বেশি বই নিয়ে এখন সত্যরঞ্জন দলুইয়ের হাতে গড়া লাইব্রেরিতে সকাল-সন্ধ্যা ভিড়। মূলত পথ শিশুদের জন্যই সত্যরঞ্জন দলুই এই লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করলেও এখন এই লাইব্রেরিতে সাধারণ মানুষও আসেন বই, ম্যাগাজিন, খবরের কাগজ পড়তে। ছাত্রছাত্রীরা আসে সিলেবাসের বই থেকে নোটস নিতে। কোনও পয়সা লাগে না এই লাইব্রেরিতে এসে বই পড়তে। কোনও সদস্য কার্ডও নেই এই লাইব্রেরির। সত্যরঞ্জন দলুইয়ের মনের ইচ্ছেয় গড়ে ওঠা এই লাইব্রেরিতে পাঠকরাও আসেন নিজেদের ইচ্ছেতেই। সকাল ৬টা থেকে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত খোলা থাকে এই লাইব্রেরি।

সত্যরঞ্জন দলুইয়ের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল এই লাইব্রেরি সৃষ্টির নেপথ্য কাহিনি – এই লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট। তিনি বলছিলেন, “সময়টা ১৯৮৯ সাল হবে। বাড়িতে ভীষণ আর্থিক অনটান। আমি সবে মাধ্যমিক পাশ করেছি। একদিকে পড়ার ইচ্ছে অন্যদিকে সংসারের অভাব এই দোটানায় পড়ে শেষ পর্যন্ত চাকরির সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে কলকাতায় চলে এলাম। কম্পিউটার শেখার জন্য ভর্তি হলাম। কাজ শিখে ডিটিপি-র একটা চাকরিও পেলাম। তাতে তেমন বেতন ছিল না, ২৮০০ টাকা পেতাম। তারপর একটা প্রাইভেট সিকিওরিটি এজেন্সিতে ঢুকে তাদের মাধ্যমেই আমি জগৎ মুখার্জি পার্কের নিরাপত্তা রক্ষীর কাজ পেলাম। আজ আমার মাইনে বেড়েছে। খরচ বহনের জন্য রাতে এক্সট্রা ডিউটি করি, রবীন্দ্রসদনের বাগান পাহারা ও দেখাশোনার কাজ করি। এই দিয়ে আমার লাইব্রেরি আর পাথর প্রতিমার সংসার খরচ চলে যায়।
বেশিদূর লেখাপড়া হয়নি এটা ঠিক তবে, বই পড়ার চাহিদা মেটাতে আমি এই পার্কের বসার জায়গাটা প্লাস্টিক দিয়ে ঘিরে এই লাইব্রেরি তৈরি করেছিলাম। এই কাজে পাশে থেকে সহযোগিতা করেছেন এই পার্কের আর এক নিরাপত্তা রক্ষী সমর কুমার মণ্ডল। আমার মনে আজ পড়তে না পারার কষ্টটা যেমন আছে, তেমনই আছে এতোগুলো মানুষের রোজ এখানে আসা এবং পড়াশোনা করে তৃপ্তি পাওয়ার আনন্দ।”
ভাবতে অবাক লাগলেও সত্যি ঘটনা হল, সত্যরঞ্জন দলুই নিজের বেতনের টাকা থেকেই একটু একটু করে ম্যাগাজিন, কাগজ, বই, বই রাখার তাক কিনে লাইব্রেরিটাকে সাজিয়ে তুলেছেন। তাঁর এমন ইচ্ছে দেখে অনেক মানুষ এই লাইব্রেরিতে তাঁদের সংগ্রহের পুরোনো বই দান করেছেন, বই রাখার বন্দোবস্ত করে দিয়েছেন। তাই এখন সত্যরঞ্জন দলুইকে নিজের বেতনের টাকায় সেভাবে বই কিনতে হয় না তবে, লাইব্রেরি রক্ষণাবেক্ষণের খরচ তিনিই বহন করেন।
এই প্রতিবেদন লেখার জন্য আমি যখন সত্যরঞ্জন দলুই, সমর কুমার মণ্ডলের সঙ্গে দেখা করতে জগৎ মুখার্জি পার্কের ভিতরের উদ্যান লাইব্রেরিতে পৌঁছাই, তখন জবা মুখার্জি নামক এক প্রবীণা তাঁর সংগ্রহের এক ব্যাগ বই দান করতে এসেছিলেন। জানলাম তিনি প্রাক্তন ইংরেজির স্কুল শিক্ষিকা। তাঁর স্বামীও একটা স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। জবা মুখার্জির বয়স হয়েছে। সঙ্গে করে একজন মহিলা ও গাড়ির চালককে নিয়ে তিনি এসেছিলেন এই লাইব্রেরিতে। ভালো ভাবে হাঁটতে পারেন না। এই অবস্থায় সশরীরে এসে বই দিয়ে যাওয়ার পিছনে তাঁর যুক্তি, ““এত ভালো একটা কাজ নিজের চোখে দেখতেই কষ্ট করে এলাম। নতুন বইয়ে যেমন একটা গন্ধ আছে, পুরোনো বইয়েও তেমনই একটা গন্ধ আছে। সেই গন্ধটা নিতে তো বটেই এছাড়া, আমার স্বামী আর আমার কাছে বই ছিল বন্ধুর মতো। স্বামী চলে গেলেন কয়েক বছর আগে। এখন আমি একা। আমিও একদিন চলে যাব। আমাদের সংগ্রহে অনেক বই আছে। আমাদের সম্পদ। তাই এই বইগুলো সত্যরঞ্জন দলুই, সমর কুমার মণ্ডলের হাতে গড়ে ওঠা এই লাইব্রেরিতে আজ দিয়ে গেলাম। ওঁনারা যা করেছেন এটা এখনকার সময় বিরল ঘটনা। নিজেদের টাকায় সত্যরঞ্জনবাবুরা লাইব্রেরি শুরু করেছেন, এই খবর পেয়ে আমি আর বাড়িতে বসে থাকতে পারলাম না। ওঁদের সঙ্গে দেখা করে বই দিয়ে গেলাম। পরে একটা বই রাখার তাকও দিয়ে যাব।”

বই দান করছেন জবা মুখার্জি
সমরবাবু যখন জবা মুখার্জির হাত থেকে বইয়ের ব্যাগটা নিয়ে এক এক করে বইগুলো বের করছিলেন, তখন সত্যরঞ্জনবাবুর মুখে লেগে ছিল তৃপ্তিমাখানো হাসি। সমরবাবু বলেন, “আমাদের কাজ সার্থক হয়েছে। দেখলেন তো, এই বয়স্ক ভদ্রমহিলা নিজে এসে প্রায় ২০০ বই দিয়ে গেলেন। বই রাখার জন্য একটা তাকও দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিলেন। এখন মনে হয় নিজে পড়তে না পারলেও অন্যদের পড়ার ব্যবস্থা তো করে দিতে পেরেছি, এই বা কম কী! এটাই আমার তৃপ্তি, আমাদের তৃপ্তি।”
তিনি আরও বলছিলেন, "আমরা দেখতাম সকাল, বিকেল বহু মানুষ এই পার্কে আসেন। তাঁদের অনেকেই দেখতাম খবরের কাগজ বা ম্যাগাজিন এনে এখানে বসে বহুক্ষণ সময় কাটাতেন। ভাবলাম যদি আমরাই এখানে খবরের কাগজ, ম্যাগাজিন রাখি মন্দ হয় না।”
আস্তে আস্তে ভিড় বাড়ছে দেখে এর পরই সত্যরঞ্জন দলুই ২০১১ সালে নিজের মাইনের টাকায় দৈনিক সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন এখানে রাখতে শুরু করলেন। আজ যেটা লাইব্রেরি সেটাই ছিল ওপরে ঢাকা চারদিকে পিলার দেওয়া একটা বসরা জায়গা। সত্যরঞ্জনবাবু মাইনের টাকায় সেই জায়গাটাকে প্লাস্টিক, বিজ্ঞাপনের ফেলে দেওয়া ফ্লেক্স দিয়ে ঘিরে, বই রাখার তাক কিনতে শুরু করেন। বই কেনার পাশাপাশি বই পেতেও শুরু করলেন। বহু মানুষ বই দান করেন। এখন লাইব্রেরিটির বই সংখ্যা ১২ হাজার ছাড়িয়েছে। কলকাতার উপর দিয়ে ২০০৯ থেকে পরপর অনেকগুলো সাইক্লোন হয়ে গেছে। সেইসব সময়গুলোতেও তাঁরা সযত্নে বইগুলো আগলে রেখেছিলেন।

জবা মুখার্জির দেওয়া বইগুলি গুছিয়ে রাখছেন সমর কুমার মণ্ডল
সত্যরঞ্জন দলুই এই লাইব্রেরিটা মূলত পথশিশুদের কথা ভেবেই করেছিলেন। যারা স্কুলে পড়ে তারা এই লাইব্রেরিতে নিয়মিত আসে। এছাড়াও এই লাইব্রেরির নাম এখন মুখে মুখে অনেকটা ছড়িয়ে পড়েছে বলে সাধারণ পাঠক, পথচারী সহ বিভিন্ন মানুষ এখানে আসছেন বই পড়তে, খবরের কাগজ পড়তে।
লাইব্রেরির পাশের ফুটপাথে এমন অনেক মানুষ বসবাস করে যারা ড্রাগ অ্যাডিক্ট। তারা বহুবার রাতে লাইব্রেরির প্লাস্টিক সরিয়ে বই চুরি করার চেষ্টা করেছে বলে সমরবাবুর অভিযোগ। তবে সেই চেষ্টা রুখে দিয়েছেন তিনি। তিনি এই পার্কের নৈশ নিরাপত্তা রক্ষী। সমরবাবু বলছিলেন, “আমি অনেকবার এইসব আক্রমণ থেকে লাইব্রেরিকে রক্ষা করেছি, এখনও করছি। আমি মনে করি এই লাইব্রেরিটা আমার সন্তান। রাত্রে আমাকে সাহায্য করে এই লাইব্রেরিতে থাকা দুটো সারমেয়।”

সত্যরঞ্জন দলুই

সত্যি! সন্তান স্নেহে, কঠোর পরিশ্রম করে, নিজের উপার্জনের অর্থ খরচ করে সত্যরঞ্জন দলুই যে ভাবে শহরের মধ্যে একটা পার্কে এই লাইব্রেরি গড়ে তুলেছেন সেটা সত্যিই বিরলতম ঘটনা। বর্তমানে ‘উদ্যান লাইব্রেরি’ চালাতে অনেকটাই উৎসাহ দিচ্ছেন ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পূজা পাঁজা। তাঁর সহযোগিতায় এই লাইব্রেরিকে আগামীদিনে আরও ভালো ভাবে চালাতে পারবেন, আশায় বুক বাঁধছেন দুই নিরাপত্তা রক্ষী। সত্যরঞ্জন দলুই ও সমর কুমার মণ্ডল, তাঁরা এখন শুধু শহরের একটি পার্কের নিরাপত্তা রক্ষী নন, তাঁরা নিজেদের অজান্তেই সমগ্র শিক্ষাজগৎকে নিরাপত্তা দিচ্ছেন, আলোকিত করছেন।
_________
ছবি: শিবপ্রিয় দাশগুপ্ত
