
১০ বছরে ফিরে দেখা প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যের ছবি ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’
ফেসবুক আর ইন্সটাগ্রামের কোলাহলে মনুষ্য প্রেম আজ শুধুমাত্র স্টেটাসে সীমাবদ্ধ। বর্তমানে আমাদের জীবনে ব্যক্তিগত বলে প্রায় কিছুই যেন নেই। জন্ম থেকে বিয়ে এমনকি মৃত্যু অবধি আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ার টাইমলাইনে পাবলিক করা থাকে। কিন্তু আজ থেকে দশ বছর আগেও কি এমনটা আমরা ভাবতে পারতাম? ২০১৩ সাল। মুক্তি পেয়েছিল পরিচালক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যর সিনেমা বাকিটা ব্যক্তিগত। প্রমিতের চরিত্রে ঋত্বিক চক্রবর্তী, যিনি একজন অপেশাদার তথ্যচিত্র নির্মাতা। প্রমিতের জীবন প্রেমহীন। মেয়েদের কাছে প্রত্যাখান পেতে পেতে সে ক্লান্ত। প্রেম কী? কীভাবে সত্যিকারের প্রেম হয়? এই ধরনের প্রশ্ন দ্বারা বিভ্রান্ত প্রমিত যেভাবেই হোক প্রেমের ধাঁধাটি সমাধান করার দায়িত্ব নেয়। প্রেম নিয়ে একটা তথ্যচিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা করে সে। আর এই পরিকল্পনাই তাঁকে নিয়ে গিয়ে ফেলে এক অদ্ভুতুড়ে গ্রামে।

প্রেমের গ্রাম। নাম তার মোহিনী। কিন্তু এইরকম একটা গল্পের আইডিয়া কীভাবে এল পরিচালকের মনে? প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যকে যারা দেখেছেন কিংবা চেনেন তারা জানবেন পেশায় সম্পাদক এবং পরিচালক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য ভীষণভাবে মাটির কাছাকাছি বাঁচতে ভালোবাসেন। তাঁর গল্প বলার মধ্যেও একইভাবে সেই মাটির গন্ধ খুঁজে পাওয়া যায়। এই সিনেমাটিও সেরকম এক গল্প থেকেই শুরু হয়েছিল। প্রদীপ্তর আদিবাড়ি নদিয়ার তেহট্ট। বাবা চাকরিসূত্রে বহরমপুর চলে আসেন। এবং সেখানেই বাবা মায়ের দেখা, প্রেম এবং বিয়ে। পরিচালকের বড়ো হওয়া মুর্শিদাবাদের বহরমপুরেই। পড়াশুনো এবং কাজের সূত্রে কলকাতায় এসে থাকতে শুরু করা। ১৯৯৮ সালের কথা। এর আগে কোনোদিন কলকাতা থেকে তেহট্ট যাওয়া হয়নি। খোঁজ নিয়ে জানা গেল ধর্মতলা থেকে বাস ছাড়ে শিকারপুরের। সেই বাস থামে তেহট্টে। কিন্তু সেদিন বাস যেখানে নামালো ভর সন্ধেবেলায় অন্ধকারে সেখানে কিছুই চেনা যাচ্ছে না। তখন স্মার্ট ফোন তো দূর, এমনি মোবাইলও ছিল না। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পরে রাস্তায় একজনকে দেখতে পেয়ে জানা গেল এটা তেহট্ট নয়, নাজিরপুর। আরও ২০ মিনিট আগে তেহট্ট পেরিয়ে গেছে। আর এখান থেকেই নাকি শুরু হয়েছিল বাকিটা ব্যক্তিগত ছবির জার্নি।
১৯৯৭ সালের পরে দীর্ঘ পনেরো বছর ধরে কলকাতা থেকে বহরমপুর যাতায়াত করতে করতে পরিচালকের মনে অনেক স্মৃতি, অনেক গল্প জমেছিলো। এই যাত্রাপথের মানুষরা ঠিক কেমন করে কীভাবে বাঁচে সেটাই দেখাতে চেয়েছিলেন প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য। আর প্রেম? প্রেমের ভূমিকা সেখানে ঠিক কী? এক দীর্ঘ অপেক্ষা, জানার মধ্যেও অজানাকে সন্ধান করা। পুরো ছবিটাই যেন একটা অদ্ভুত জার্নি। কলকাতা থেকে তেহট্টর মতোই সিনেমায় দেখা যায় কলকাতা থেকে মোহিনীর যাত্রাপথ। কলকাতার মানুষদের কাছে প্রমিত খুঁজে ফেরে প্রেমের মানে। একে ওকে তাকে ধরে জিজ্ঞেস করে অনেক প্রশ্ন। সেইসব উত্তর ভিডিও রেকর্ড করে রাখে ক্যামেরা সঙ্গী অমিত, অভিনয় করেছেন অমিত সাহা। কলকাতার এক জ্যোতিষীর মাধ্যমেই প্রথম মোহিনী গ্রামের নাম জানতে পারে তারা। সেই জ্যোতিষীর আবার দুই বউ। দুইজনেই একসঙ্গে এক স্বামীর ঘর করে। স্বামীকে ছেড়ে না যাওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করলে বড়ো বউ মুখে আঁচল ঢেকে কাঁদে। কান্নার অদ্ভুত এই দৃশ্য বেশ খানিকক্ষণ ভাবিয়েছে। নিঃস্বার্থ ভালোবাসা হয়তো এমনই। যার জন্যে কতকিছু ত্যাগ করে মুখ বুজে থেকে যাওয়া যায়। এই সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো যেন আজকের যুগে বড়ো বেমানান। এত অপশনের ভিড়ে আমরা অন্তর থেকে প্রেমকে এভাবে উপলব্ধি করতে পারি কি? জানি না। কিন্তু মোহিনী গ্রামে পৌঁছনো যাবে কীভাবে এই রহস্যের সমাধানে একে একে সাহায্য করে এক ফিজিক্স টিচার এবং তাঁরই ছাত্রছাত্রী। বয়স্ক শিক্ষকের ভূমিকায় মনু মুখোপাধ্যায় অনবদ্য। যত গল্প এগোয়, মনে হতে থাকে ছবির প্রতিটা চরিত্রের সঙ্গে যেন একাত্ম হতে থাকছি। প্রেমের খোঁজে মোহিনী গ্রামের উদ্দেশ্যে আমরাও চলেছি ওদের সঙ্গে।
ধর্মতলা থেকে উঠে নাজিরপুরে বাস থেকে নেমে অপেক্ষা করতে হয়। আগে থেকে কেমন করে একজন যেন জেনে যায় মোহিনী গ্রামে যাওয়ার লোক এসেছে। অপেক্ষা করছে তাঁর জন্যে। স্বর্গ থেকে নেমে আসা দূতের মতো একজন ভ্যান নিয়ে আসেন অতিথিদের নিয়ে যাওয়ার জন্যে। অভিনেতা দেবেশ রায়চৌধুরী সেই অদ্ভুত ভ্যানচালকের ভূমিকায়। মোহিনী আর কিছুদূরের রাস্তা। অপেক্ষার শেষ? নাকি সেই সবে শুরু। ছোটো নদীর পাশ দিয়ে এঁকেবেঁকে চলা মাটির রাস্তা আর চারদিকে বাঁশ বাগান। নিকোনো উঠোন, জলখাবারে মুড়ি বাতাসা। আর পাঁচটা গ্রামের মতো দেখতে হলেও এ গ্রাম অনেকটা আলাদা। এই গ্রামে সবাই প্রেম করে। প্রেম ছাড়া এই গ্রামে কেউ বাঁচতে পারে না। শিক্ষক, ডাক্তার, চাষি, সমস্ত জীবিকার সব বয়সের মানুষের বেঁচে থাকার একটাই মন্ত্র। প্রেম। সারাদিনের কাজ শেষে তারা একে অপরের কাছে আসে, মনের কথা আদান প্রদান করে। এটাই যেন তাঁদের কাছে অক্সিজেন। এই সময়ে দাঁড়িয়ে এই মুহূর্তগুলোকে কেমন রূপকথার গল্পের মতো মনে হয়। বোলান গান, হাপু গান, ঝুলন সাজানোর দৃশ্য যেন মোহিনীকে আরও মায়াময় করে তুলেছে।
এই গ্রামেই ঠাম্মার বাড়ি। ঠাম্মার চরিত্রে অভিনেত্রী মাধবী মুখোপাধ্যায়। আর তাঁর নাতনি শম্পার চরিত্রে অপরাজিতা ঘোষ দাস। বছর কুড়ি আগে কলকাতা থেকে এই গ্রামে এসে দুজনে থাকতে শুরু করেছিল। আর ফেরত যাওয়া হয়নি। যেতে মন চায়নি। এ গ্রামে একবার এসে পড়লে আর নাকি ফিরে যাওয়া যায় না। এমনই প্রেমের মায়া। সেই মায়ার আবেশ থেকে বাদ যায়নি প্রমিতও। ঠাম্মার একমাত্র নাতনি শম্পার প্রেমে পড়ে সে। কিন্তু মেয়েটি দেখতে যেন হুবহু শোভাবাজারের জ্যোতিষীর ছোটো বউ। কীভাবে সম্ভব? স্বপ্ন নাকি সত্যি? পরিচালকের কথায়, তেহট্টের নানান অবিশ্বাস্য জাদুবাস্তবের গল্প শোনার প্রভাব নাকি এই ছবিতে রয়েছে। ছোটো থেকে বাবা মা পিসি জ্যাঠা কাকাদের বানানো অদ্ভুতুড়ে সব রূপকথার গল্প শুনে বড়ো হয়েছেন পরিচালক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, “স্বপ্ন দেখতে এবং দেখাতে আমি খুব পছন্দ করি। রিয়্যালিটির মধ্যে থেকেই”। তাই হয়তো শম্পা আর ছোটো বউ প্রমিতের জীবনে ঘুরেফিরে আসে বারবার। প্রেমের নেশায় বুঁদ প্রমিত এসব ভাবনা ছেড়ে শম্পাকে বিয়ে করবে মনস্থির করে। দুদিন পরে শম্পাকে বিয়ে করে কলকাতায় নিয়ে যাবে ঠাম্মাকে এই কথা দিয়ে ফিরে যায় প্রমিত। এখানেই একটা হ্যাপি এন্ডিং হতে পারত। দর্শককে বেশি ভাবনা চিন্তা করার ঝামেলায় পড়তে হত না তাহলে। কিন্তু তেমনটা হল না। মোহিনীতে আবার ফিরে আসার পথ বন্ধ হয়ে গেল প্রমিতের কাছে। দ্বিতীয়বার আর শম্পার কাছে ফিরে যাওয়া হল না। আর বিয়ে? এবারে খুব তাড়াহুড়ো করে নিজেই বাসস্ট্যান্ডে নেমে মোহিনী গ্রাম-এর খোঁজে বেরিয়ে পড়েছিল প্রমিত। ভ্যানচালকের অপেক্ষা না করার শাস্তি পেল হয়তো। পাগলের মতো খুঁজেও ঠাম্মার বাড়ি, শম্পাকে খুঁজে পেল না। কেউ তাকে মোহিনী গ্রামের সন্ধানও দিতে পারল না। কলকাতা থেকে মোহিনীর গোটা জার্নিটাই কতগুলো ক্যাসেট বন্দি হয়ে থেকে গেল। শুধু রয়ে গেল অনুভূতিগুলো। এখানেই সিনেমার মজা।

শেষে একটা প্রশ্ন থেকে গেল। কোনটা সত্যি? যেটা আগে ঘটে গেল, নাকি যেটা এখন ঘটছে? দর্শকের বিশ্বাসের ওপরে ছেড়ে দেওয়া সবটা। যে যেভাবে ভাবতে ভালোবাসে। মানুষের অভিজ্ঞতাগুলোকে ছবিতে ধরে রাখার জন্যে ডক্যুমেন্টারি ফরম্যাটে তৈরি হয়েছিল এই ছবি। পেশাদার অভিনেতা কিংবা পরিচালকের বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজন যাঁরাই অভিনয় করেছেন, আলাদা করে অভিনয় করছেন এমনটা মনে হয়নি। মজার বিষয় হল আমরা বাস্তবে ঠিক যেভাবে কথা বলি, সেটাই যেন সবার চরিত্রে ফুটে উঠেছে এই ছবিতে। পরিচালকের কথায়, “মাত্র দুজন লোক মিলে গোটা ছবিটা সিংক সাউন্ডে রেকর্ড করেছেন। অদ্ভুতভাবে শেষ অবধি ফলি ডাবিং কিছুই করতে হয়নি।” ন্যাচারাল লাইট, রিয়্যাল লোকেশন এবং বন্ধুবান্ধব পরিবারের লোকজনকে একজোট করে খুব যত্ন করে ভালোবেসে বানানো এই ছবি। এত কাছের মানুষ একত্রিত হয়ে কাজ করেছেন বলেই হয়তো সেই আন্তরিকতার প্রতিফলন দেখা যায়। লোকগীতির অনেক বেশি ব্যবহার দেখা গেছে এই ছবিতে। ২০১৪ সালে ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’ ৬১তম জাতীয় পুরস্কার-এ সেরা বাংলা ছবি হিসেবে সম্মানিত হয়।
আমরা যারা নব্বইয়ের দশকে বড়ো হয়েছি, মফস্সলের সরু গলির রাস্তা ধরে প্রেম করেছি, তাদের কাছে এই ছবি যেন নস্টালজিয়া। বক্স অফিসে সাফল্য না হোক, বহু দর্শক আজও এই ছবি মনে রেখে দিয়েছেন। দশটা বছর পেরিয়ে গেলেও আজও মোবাইল কিংবা ল্যাপটপে মোহিনী গ্রামের মন কেমন করা সব দৃশ্য ভেসে ওঠে। আর ব্যাকগ্রাউন্ডে বেজে ওঠে, “সবার কিছু দুঃখ আছে, দুঃখ আছে ব্যক্তিগত, দুঃখ চাপার ভঙ্গি আছে, সবার আছে নিজের মতো”।
