তাহাদের কথা : যেভাবে শিবনাথের স্বপ্নের ট্রেন ডুবে গেল স্বাধীন ভারতের কুয়াশায়

১৯৯২ সালে নির্মিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ছবি ‘তাহাদের কথা’, গল্পের ভূগোল ঢাকার তাহেরপুর

কমলকুমার মজুমদার যেন স্ক্রিন-প্লে রাইটার। তাঁর লেখায় ছবি ক্রমশ চলতে থাকে। আর সেই ছবি তৈরি করতে প্রতিবেশের ডিটেলিং, চরিত্রের শরীরী ভাষা, ইঙ্গিতের ভাষা, ডায়ালেক্ট এই সবকিছুর ভূগোল সাপেক্ষে যথাযথ রূপায়ণ থাকে। তাই কমলকুমারের গল্প নিয়ে সিনেমা বানানোয় পরিচালকের খাটনি অনেক কমে যায়। কিন্তু সব পরিচালকই তো বইকে চলচ্ছবিতে রূপান্তরিত করেন না; কিছু পরিচালক মাঝখানে আর একটি স্টেপ রাখেন, তাঁর গল্পকে প্রথমে নিজের গল্প করে নেন, তারপর রূপ দেন। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত এমনই একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা। 

১৯৫৮ সাল নাগাদ কমলকুমার লিখছেন ‘তাহাদের কথা’। গল্পের ভূগোল সাঁওতাল পরগনার গড়শিমলা। ঝাড়খণ্ডী উপভাষার ব্যবহারে, রুক্ষ মালভূমির বর্ণনায় এবং চরিত্রের স্বভাব চিত্রণে তা গল্পের ভূগোলকে স্পষ্ট করে। সময়টা ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষের। যেখানে আধ্যাত্মিক চিন্তা, মানুষের আত্মার মুক্তির জন্য ভারতীয় দর্শন-নির্ভরতা, বেদান্ত-রামপ্রসাদ-উপনিষদে মানুষের মগ্নতাকে পাগলামি নামে চিহ্নিত করে দেওয়ার সামাজিক পরিমণ্ডলে ক্রমশ ভারতীয়ত্ব নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। শিবনাথ এই আধ্যাত্মিক ভাবমণ্ডলের প্রতিনিধি। যেখানে শিবনাথের ছেলে জ্যোতি পারিপার্শ্বিক ঔপনিবেশিক চাপ থেকে বাবাকে রক্ষা করার জন্য সক্রিয়। তা ভারতবর্ষকে রক্ষা করার জন্য যুব প্রজন্মের সংগ্রাম। কিন্তু খুব সচেতনভাবে কমলকুমার গল্পে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন একটি ইতিহাসকে। স্বদেশী আন্দোলন (সন তেরশো চৌদ্দ-র উল্লেখ আছে)। বঙ্গভঙ্গের প্রতিরোধ। শিবনাথ স্বদেশী। এবং দৈশিকতা বজায় রাখার সংগ্রামে ব্যর্থ, ফলে তার পুরো পরিবারের যন্ত্রণার কেন্দ্র (স্ত্রী হেমাঙ্গিনী, মেয়ে অন্নপূর্ণা, ছেলে জ্যোতি)। তাই কমলকুমারের ‘তাহাদের কথা’ ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষের কথা।বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত কমলকুমারের গল্পটি নিয়ে ১৯৯২-এ একটি সিনেমা বানান। কিন্তু বুদ্ধদেবের ‘তাহাদের কথা’ স্বপ্নদর্শী স্বাধীনতা সংগ্রামী শিবনাথ-মহীতোষদের কথা হয়ে যায়, তা আর কমলকুমারের বোধে স্থির থাকেনি। বুদ্ধদেব শুধু চরিত্রগুলিকে নিলেন। বদলে দিলেন তাদের ইতিহাস, তাদের বহুবিধ ভাষা। ঘটনা নিলেন, কিন্তু বদলে গেলো ঘটনার অন্তর্নিহিত ব্যঞ্জনা।স্বাধীনতা-পূর্ব ঢাকা জেলার তাহেরপুরে ছিল শিবনাথের (মিঠুন চক্রবর্তী) বাড়ি। সেখান থেকে সে ধরা পড়ে ১১ বছর জেল খেটেছে। সে উচ্চশিক্ষিত। এই ১১ বছরে দেশের ভূগোল, ভূগোলের রাজনীতি বদলে গেছে। তার উদ্বাস্তু পরিবার এখন থাকে গড়শিমলা। ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষের একটা গল্পকে উপনিবেশ-উত্তর স্বাধীন ভারতে টেনে আনতে বুদ্ধদেব গল্পের ভূগোল-ইতিহাস-রাজনীতি-অর্থনীতি-সংগ্রাম-যন্ত্রণা সব বদলে দিলেন। কিন্তু সেই বদল এল কমলকুমারের মূল ভাবনার সম্প্রসারণে। এখানেও শিবনাথ-জ্যোতির (সুব্রত নন্দী) সম্পর্ককে ইতিহাসের দুই প্রজন্মের প্রতীকে দাঁড় করান বুদ্ধদেব। মেয়ে অন্নপূর্ণা (দেবর্ষি ভট্টাচার্য) হয়ে যায় দেশ মাতৃকা (মনে পড়বে ঋত্বিকের ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’র কথা)। কমলকুমারের গল্পে ঔপনিবেশিক ভারত, ফলে তার ইতিহাস-ভূগোল স্থির। কিন্তু বুদ্ধদেবে তা সচল ইতিহাসের দ্যোতক – ঔপনিবেশিকতা থেকে উপনিবেশ-উত্তর ভারতবর্ষে এর বিস্তার। ফলে গল্পের ভূগোলও স্থির থাকেনি আর, ইতিহাসের সঙ্গে বদলে বদলে গেছে। ফলে সিনেমায় ভূগোলের রাজনীতিও ঢুকে গেছে।শিবনাথ কেন্দ্রীয় চরিত্র। তার স্বপ্ন সংগ্রাম সব ব্যর্থ, স্বাধীন ভারতে। চারপাশে সুবিধাভোগী মানুষ ‘শুয়োপোকার’ মতো থুতু চাটছে কিংবা ‘কলা’র মতো এই পৃথিবীকে খাচ্ছে হনুমানরা। এই সব উপমায় চাপা ক্ষোভ লুকিয়ে (কিংবা তাকে কেউ সংগ্রামের ফলাফল স্বরূপ এই স্বাধীনতা কেমন লাগছে জানতে চাইলে সে বাতকম্ম করে দেয় – এতেও সেই ক্ষোভ স্পষ্ট; কিম্বা ডেপুটিকে ‘দূর ঢ্যামনা’ বলায় ক্ষোভ ও যন্ত্রণা মিলেমিশে যায়, জানেই না তার কী করা উচিত এখন, কেননা এখন সে একা প্রায়, চারপাশে সবাই আদর্শভ্রষ্ট, ক্ষমতালোভী)। তার স্ত্রী হেমাঙ্গিনী (অনসূয়া মজুমদার) তাকে ভয় পায়, ফলে চাপা যৌনতায় সে অস্থির। সে একা। কোথাও তার সঙ্গী নেই (কেবল উত্তরসূরি জ্যোতি তাকে আদর্শ মেনে শ্রদ্ধা করে, ভালোবাসে)। আপাতভাবে সে পাগল নয়। সে শুধু এই সুবিধাভোগী সমাজ-রাষ্ট্রের বিপ্রতীপে মেরুদণ্ডযুক্ত, নৈতিক আদর্শ চরিত্র। তাকে সবাই পাগল বলে দাগিয়ে দিতে চায়, কেননা সে আর সকলের মতো নয়। তার স্বপ্ন আছে – মানুষের মুক্তির। কিন্তু ভারতের স্বাধীনতা কোনো স্বাধীনতা নয়। বিপিনের কথা অনুযায়ী তাদের সংগ্রামের ফসল এই স্বাধীনতা, এখন শুধু বসে বসে সুবিধাভোগ করার, খাওয়ার সময়। যা ভারত ইতিহাসের সত্য – ক্ষমতার লোভ এবং তাই নিয়ে পারস্পরিক খেয়োখেয়ি। কিন্তু তা তো শিবনাথের স্বপ্নের ভারতবর্ষ নয়।

এ সব বোঝাতে বুদ্ধদেব বিপিন (দীপঙ্কর দে), আত্মারাম, ডেপুটি (হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়) চরিত্রগুলিকে তৈরি করেন, যেখানে পুরুষতন্ত্র (আত্মারাম স্কুলের নাম মায়ের নামে নয় বাবার নামে করতে চায় কিংবা ডেপুটি অন্নপূর্ণাকে শরীরে হাত দিয়ে আদর করে), ক্ষমতার স্তরভেদ, অর্থনৈতিক শ্রেণিভেদ সবকিছুতেই বিরাট একটা পরাধীনতা আছে। এখানে পরাধীন মেরুদণ্ডহীন বিপিন (এমনকি বিপিন শিবনাথকেও ব্যবহার করতে চেয়েছে নিজের ক্ষমতাবৃদ্ধির স্বার্থে)।বুদ্ধদেব ক্ষমতার ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত করতে কিছু প্রতীকী দৃশ্য সিনেমায় আনেন। একটি বানজারা ভানুমতির খেলা দেখাচ্ছে। লোককে ধাঁধায় ফেলে গাধা, ছাগল বানিয়ে দিচ্ছে, পাতা খাওয়াচ্ছে, থুতু চাটাচ্ছে। লোকজন সেই অতি-লৌকিক ক্ষমতায় মোহিত হচ্ছে। সিনেমার ক্ল্যাইমেক্সে দেখি শিবনাথ তাকে গলা টিপে মারে। এইটা আসলে শিবনাথের ভিতরের প্রতিবাদের প্রতীকী ছবি। 

কমলকুমারের শিবনাথ শিকল পরে। তার বউ, মেয়ে, প্রতিবেশী সবাই মিলে তাকে শিকল পরিয়ে দেয়। সেখানে প্রতিবাদ করে আঘাত খায় জ্যোতি, প্রতিরোধ করতে পারে না। সেটা উপনিবেশের কড়া বাস্তব। কিন্তু বুদ্ধদেবের শিবনাথকে তার বউ, মেয়ে শিকল পরাতে পারে না, জ্যোতি সফল হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শিকল শিবনাথকে পরতেই হয়, স্বাধীন ভারতের শাসন-নিয়ম অনুসারে। ফলে কমলকুমারে যা ছিল ঔপনিবেশিক ভারতের আধ্যাত্মিক মুক্তির শিকল পরা, বুদ্ধদেবে তাই রাজনৈতিক মুক্তির শিকল পরা।শেষ দৃশ্যে শিবনাথকে বন্দি করে নিয়ে স্বাধীন ভারতের ট্রেন ক্রমশ কুয়াশার ভিতরে ঢুকে যায়, আর জ্যোতি বাবাকে ধরতে চেয়ে রেল লাইনের উপর দিয়ে ট্রেনের পিছনে ছুটতে থাকে। একটা আদর্শকে ছুঁতে চেয়ে জ্যোতির, শিবনাথদের উত্তরসূরির এই দৌড়ানো। কিন্তু সামনে কুয়াশা। ভারতের ইতিহাস কি সেইসব শিবনাথদের আর পেয়েছে? তাহাদের পেয়েছে? বুদ্ধদেবের ‘তাহাদের কথা’ আসলে শিবনাথদের কথা। স্বপ্নদর্শী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কথা। যাদের খুঁজতে খুঁজতে কত যুব প্রজন্ম কুয়াশায় হারিয়ে গেল, কিন্তু খুঁজে পেল না।

ফলে কমলকুমারের ইতিহাসবোধ এবং বুদ্ধদেবের ইতিহাসবোধ দুই-ই আঁকাড়া বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে। শুধু বুদ্ধদেব মাঝে একটা ইউটোপিয়া তৈরি করেন, একটা প্রতিরোধ, একটা সংগ্রামের বীজ বুনে দেন। কেননা সময়ে সময়ে সংগ্রামী মানুষের ভিতরে শিবনাথদের অবস্থানটিও তো সত্য, ঐতিহাসিক সত্য।

 

 

Developed by DXDasia