
৩০০টি পরিবারের হাতে ১০০০ টাকা করে পাঠাতে পেরেছেন তারা
সুন্দরী সুন্দরবন। বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী একটি প্রশস্ত বনভূমি। যা ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো থেকে বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। দুই বাংলার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র বলা হয় এই সুন্দরবনকে। কারণ বাংলাদেশের খুলনা, সাতক্ষীরা এবং পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জুড়ে বিস্তৃত এই অঞ্চল। সুন্দরবনের অপরূপ শোভায় মুগ্ধ হন বহু মানুষ। আরামে নিজেদের শ্বাস-প্রশ্বাস নেয় অসংখ্য পশু-পাখি। আজ সেই সুন্দরবন ভালো নেই। ভালো নেই সেখানকার মানুষজন।
আমফানের তাণ্ডবে ছিন্নভিন হয়ে গেছে সুন্দরবন। গত নভেম্বরের বুলবুলের ঘা শুকোতে না শুকোতেই দ্বীপভূমির মানুষ আবারও বিপর্যস্ত। কার্যত দিশেহারা পরিস্থিতি। আর এই সমস্ত সাহায্যপ্রার্থী বিপন্ন মানুষের ডাকে সাড়া দিয়ে দেশ-বিদেশ থেকে সরাসরি তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাচ্ছেন বাংলার অনুভূতিসম্পন্ন মানুষ। এমন অভিনব উদ্যোগ সুন্দরবন বিষয়ক বহুপ্রশংসিত পত্রিকা ‘শুধু সুন্দরবন চর্চা’র। লকডাউন আর আমফানের জোড়া ফলায় কপর্দকশূন্য প্রান্তিক মানুষের কাছে এটিই এই মুহূর্তে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় হয়ে উঠতে পারে বলেই তাদের বিশ্বাস।
এ প্রসঙ্গেই পত্রিকা সম্পাদক জ্যোতিরিন্দ্রনারায়ণ লাহিড়ী জানালেন, "আমফান আসার আগে থেকেই আমরা বিপদের গুরুত্ব বুঝে ওদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছিলাম। আমাদের ফেসবুক পেজে নিয়মিত আপডেট দিচ্ছিলাম, ছবি আর ভিডিও শেয়ার করছিলাম। শুভানুধ্যায়ী এবং আমাদের বন্ধুবান্ধবরাও একই সঙ্গে ওঁদের জন্য চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। আমরা আমাদের সুন্দরবন প্রতিনিধি মারফত আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে বেশ কিছু বাড়িতে ত্রিপল পাঠাতে পেরেছি। অনেকেই পরে আমাদেরকে তাঁদের সহায়তা করতে চান বলে জানান। একইসঙ্গে, ও প্রান্ত থেকে সুন্দরবনের বহু মানুষ আমাদের কাছে সহায়তা প্রার্থনা করে আবেদন জানাতে থাকেন। আমরা বর্তমান স্বাস্হ্যবিধিকে মাথায় রেখে এইভাবে ত্রাণ বন্টনকেই আমাদের মতো ছোট সংগঠনের জন্য সবচেয়ে বাস্তববাদী আর কার্যকরী পথ বলে মনে করেছি। ইন্টারনেট পরিষেবা মোটামুটি কাজ করতে শুরু করার পর থেকেই আমরা সাধ্যমতো কাজ করতে শুরু করেছি। আমরা খুব ছোট্ট একটি পত্রিকাগোষ্ঠী, তাও এর মধ্যে প্রায় ৩০০টি পরিবারের হাতে ১০০০ টাকা করে পাঠাতে পেরেছি। আমাদের কাজ চলছে। আশা করছি বেশ কিছু পরিবারের হাতে আরও কিছু অর্থসাহায্য পাঠাতে পারব। আর কিছুদিন বাদে পরিস্থিতি একটু সহায়ক হলে আমাদের সরাসরি হাতে হাতে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা আছে, যেমনটা আমরা প্রতিবছরই করে থাকি।"

'শুধু সুন্দরবন চর্চা' পত্রিকার শুরুও এই রকম ত্রাণবন্টনের মধ্যে দিয়েই। এক দশকেরও আগে আয়লার সময় থেকে। তারপর থেকে বছরে চারটি করে সংখ্যা প্রকাশ করার পাশাপাশি 'তেপান্তরের স্বপ্ন' নামের স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা নির্মাণ এবং তার মাধ্যমে নিয়মিতভাবে বছরে একবার অন্তত সুন্দরবনের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার — এটাই বর্তমানে এই বন্ধুদলের মূলমন্ত্র। এদের নব্বই শতাংশ সদস্যই সুন্দরবনের তথাকথিত 'ভূমিপুত্র' নন, কিন্তু 'সুন্দরবন' শব্দটি উচ্চারিত হলেই ঘোর লাগা ভালোবাসায় কাঁধে কাঁধ মেলান। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফে ২০১৬ সালে লিটল ম্যাগাজিন পুরস্কার এবং কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরির তরফে ২০১৮ সালে সারস্বত সম্মান সহ বেশ কয়েকটি পুরস্কার ইতিমধ্যেই পত্রিকার ঝুলিতে।
আপাতত এই পত্রিকা এবং তেপান্তরের স্বপ্ন সংস্থার তরফে আমফানের ত্রাণে পরিবারপিছু এক হাজার টাকা করে ধার্য করা হয়েছে। শুভানুধ্যায়ীরা কেউ যদি দুই বা তিন হাজার টাকা পাঠাতে চান, তাহলে তিনি দুটি বা তিনটি পরিবারকে সেই টাকা পাঠাবেন। "আমরা চেয়েছি যত বেশি সংখ্যক মানুষের হাতে টাকা পৌঁছনো যায়, তাহলে একটা বড়ো অংশের মানুষের আপৎকালীন প্রয়োজন মিটতে পারে। প্রশাসনিক স্তরে কাজ তো চলছেই। চলবেও। কিন্তু আমরা সবাই যদি সামান্যও হাত বাড়াতে পারি, তাহলে সমষ্টিগতভাবে সেটা অনেক বড়ো হয়ে উঠতে পারে।" -বললেন পত্রিকা সম্পাদক, জলজঙ্গলের সুন্দরবনেও যিনি স্বপ্নের তেপান্তর খোঁজেন। রূপকথার গন্ধ পান।
