
সৌকর্য ঘোষালের আগামী ছবি মুক্তি পাচ্ছে ২১ অক্টোবর, পুজোয়
‘লোডশেডিং’, ‘রেনবো জেলি’ থেকে আসন্ন ‘রক্তরহস্য’, ‘ভূতপরী’ – ইতিমধ্যেই বাংলা চলচ্চিত্রে নিজের স্বতন্ত্র ছাপ ফেলেছেন পরিচালক সৌকর্য ঘোষাল। বারবার সোচ্চার হয়েছেন শিশু অধিকারের কথা নিয়ে। ইলাস্ট্রেটর থেকে পরিচালক হয়ে ওঠার জার্নিতে কী কী দেখলেন তিনি? আগামী ২১ অক্টোবর মুক্তি পাচ্ছে বহু প্রতীক্ষিত ছবি ‘রক্তরহস্য’। সুমন সাধু’র সঙ্গে কথা বলছেন সৌকর্য ঘোষাল।
• শুরুতেই জানতে চাইব আপনি ‘রক্তরহস্য’ ছবিটাকে ইমোশনাল থ্রিলার বলছেন কেন?
সৌকর্য- আমরা যদি বাইরের দেশের সফল থ্রিলারগুলো দেখি, সেখানে দেখব গড়পড়তা থ্রিলারের থেকে তারা বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। মানুষের জীবনের প্রাথমিক জায়গাটা কিন্তু ইমোশনাল। আমরা প্রায় সমস্ত কাজই ইমোশনের জন্য করে থাকি। রক্তরহস্য লেখার সময় মনে হয়েছিল বাংলা থ্রিলারে ওই স্পেসটা কম। আমি বলতে চাইছি ইমোশনের কারণে যে থ্রিলগুলো ঘটে, সেগুলোর বড্ড অভাব বাংলা থ্রিলারে। বাঙালিরা কিন্তু আবেগকে একটা মহৎ স্থান দেয়। আমিও আবেগকে প্রাধান্য দিই। তাই খুব সচেতনভাবে এবং যত্ন নিয়ে গল্পটা লিখেছিলাম। আমার মনে হয়, এরকম জিনিস এর আগে বাংলায় খুব একটা দেখা যায়নি।
• এই ছবিতে কোয়েল মল্লিক শুধুমাত্র অভিনয়ই করেননি, অন্যতম প্রযোজক তিনি। তাঁর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন?
সৌকর্য- অদ্ভুত রকমের ভালো একটা অভিজ্ঞতা। সেটে কোয়েল ঠিক স্কুলের ফার্স্ট গার্লের মতো। কোয়েলের মধ্যে প্রত্যেককে সহযোগিতা করার একটা বিরাট মানসিকতা আছে। আমার মতো নতুন পরিচালকের ক্ষেত্রে তাই কাজ করতে কোনও সমস্যা হয়নি। এটা একটা প্রাপ্তির জায়গাও বটে।
ছবির পোস্টার
• সেই অর্থে এই প্রথমবার কোনো ‘স্টারের’ সঙ্গে কাজ করলেন। এর আগের ছবিগুলিতে তথাকথিত ‘অফবিট’ মুখেদের দেখা গিয়েছিল।
সৌকর্য- হ্যাঁ একদমই। আরেকটা জিনিস বলতে চাই, শট দেওয়ার পর কোয়েল কিন্তু মনিটার দ্যাখে না। যেখানে মেক-আপ আর্টিস্ট বা হেয়ার ড্রেসার বা অ্যাসিস্ট্যান্টরা মনিটার দেখছে, সেখানে কোয়েল একবারের জন্যেও মনিটার দ্যাখেনি। আমি যদি বলতাম, কোয়েল তুমি কি একবার দেখবে শটটা? কোয়েল বলত, দেখব? এইটা কিন্তু আমি অন্যান্য অভিনেতাদের মধ্যেও পাইনি। প্রত্যেকেরই নিজেকে মনিটারে দেখার একটা আগ্রহ থাকে। এটা আমাকে সত্যিই অবাক করেছে।
• ইলাস্ট্রেটর থেকে পরিচালক হওয়া – এই জার্নিটা কতটা সিনেম্যাটিক? আর ইলাস্ট্রেশনের ঠিক কোন জায়গায় আপনি সিনেমা দেখতে পেয়েছিলেন?
সৌকর্য- যখন তুমি আঁকছ, তখন সেই ফিগারের সবটা জুড়েই কিন্তু তুমি থাকো। তাকে কেমন দেখতে হবে, সে কী ডিজাইনের পোশাক পরবে, কী রঙের পোশাক পরবে সবটাই দেখতে পাচ্ছ। সিনেমার ক্ষেত্রে প্রথমেই যেটা তোমাকে ভাবতে হবে, সেটা হচ্ছে তোমার উল্টোদিকের প্রত্যেকটা মানুষকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া। তাঁর যুক্তি তুমি না-ই মানতে পারো, কিন্তু গুরুত্ব দিয়ে সেটা শুনতে হবে। পরিচালক হিসাবে বোঝাতে হবে তুমি ঠিক কী চাইছ আর কেন চাইছ। ইলাস্ট্রেশনে যে গোটা জিনিসটা তৈরি হচ্ছে সেটার মধ্যে রিয়ালিজমটাকে নতুন করে অনেক বেশি মুন্সিয়ানার সঙ্গে আনতে হচ্ছে। কিন্তু সিনেমাতে রিয়ালিজমটাকেই দিয়ে দেওয়া হয়। রিয়্যাল ফিজিক্যাল বাড়ি, রিয়্যাল ফিজিক্যাল শরীর দিয়ে দেওয়া হয়। এইবার তুমি তোমার ন্যারেটিভ বা গল্পের জোরে, ক্যামেরার জোরে ওই রিয়ালিজমের মধ্যে থেকে একটা আনরিয়াল জিনিস তৈরি করো। যেটা দেখে মানুষের মনে হবে ওটা ফিকশন। এটা কিন্তু অন্য মজা। ইলাস্ট্রেশনের সঙ্গে সিনেমার তফাৎ এই জায়গায়।
শ্যুটিং ফ্লোরে পরিচালক অভিনেত্রীকে দৃশ্য বোঝাচ্ছেন
• দেশের যেকোনো পরিস্থিতি নিয়ে আপনি বেশ সোচ্চার। দেশের রাজনৈতিক ইস্যুগুলো নিয়ে সিনেমা বানাবেন না কখনও?
সৌকর্য- হ্যাঁ, ইচ্ছা আছে। অবশ্যই বানাব।
রক্তরহস্য ছবির ট্রেলার
• অপর্ণা সেন ‘ঘরে বাইরে আজ’ ছবিতে তাঁর নিজের আদর্শ এবং দেশের অবস্থার কথা রবীন্দ্রনাথের টেক্সটের মাধ্যমে বলেছিলেন। অন্যদিকে অঞ্জন দত্ত রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’ নাটক মঞ্চস্থ করলেন এখনকার রাজনৈতিক ইস্যুকে সামনে রেখে। যেকোনো শিল্প মাধ্যমে খুব সরাসরি সময়ের কথা বলা কতটা গুরুত্বপূর্ণ আপনার কাছে?
সৌকর্য- সরাসরি সময়ের কথা বলাটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। দ্যাখো, অনেকের অনেকরকম প্রায়োরিটি হয়। আমার কাছে আজকে দাঁড়িয়ে বুঝতে অসুবিধা নেই যে, আমি সিনেমাতেই বাঁচি। দেশের আবেগটাকে আমি প্রাধান্য দিই। দেশ বলতে যে ছবিটাকে বা আইডিয়াটাকে বুঝি, সেখানে আঘাত হলে কথা অবশ্যই বলব। যখনই সিনেমায় সেটা দেখাব, আমার মধ্যে একটা অতিরিক্ত দায়িত্ব কাজ করবে। যেখানে আমি দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক সমস্যাকে আমার সিনেমার মধ্যে দিয়ে অভিব্যক্ত করব তাই নয়, সেটা যেন অনেকটা কাল জুড়ে থেকে যায়। আগামিদিনে যেকোনো ভয়াবহ ইস্যুতে এই কাজটা যেন একইভাবে প্রাসঙ্গিক মনে হয়। যেমন ধরো, ‘লাইফ ইজ বিউটিফুল’ বানানো হয়েছিল মূল ঘটনার অনেক পরে। কিন্তু এই ছবিটা এখন দেখলে তুমি অসমের এনআরসি ক্যাম্পের প্রসঙ্গ স্পষ্ট দেখতে পাবে। ঋত্বিক ঘটকের ছবির কথা ভাবো একবার। এখনও কত প্রাসঙ্গিক মনে হয়। তাই আমি চেষ্টা করব একটা নির্দিষ্ট সময়ে যেন আমার ছবি থেমে না যায়। আজ থেকে কুড়ি বছর পর যখন কেউ ছবিটা আরেকবার দেখবেন, তিনি যেন তাঁর সময়টাকে পরিষ্কারভাবে দেখতে পান এবং রিলেট করতে পারেন।
• আপনার ছবিতে কোথাও গিয়ে বাস্তব আর কল্পনার একটা সুন্দর মিশ্রণ থাকে। যেখান থেকে শিশু চরিত্রদের ‘হিরো’ করা বা ম্যাজিক রিয়ালিজমের মধ্যে ব্যাখ্যা করা কিছু ফ্রেম আপনার সিনেমা বানানোর সঙ্গী। আপনার আরেকটি ছবি ‘ভূতপরী’র ভাবনা কীভাবে মাথায় এল?
সৌকর্য- ‘ভূতপরী’র নায়কও একজন বাচ্চা। দ্যাখো, আমরা নারী স্বাধীনতা বা নারী অধিকারের কথা বলি, প্রগতিশীল সমাজের কথা বলি। কিন্তু এখনও আমরা ভেবেই উঠতে পারলাম না, এই সমাজে শিশুদের জায়গাটা কোথায়! পুরুষ, নারী, ট্রান্সজেন্ডার প্রত্যেকের জায়গা থাকবে, শিশুরা কিন্তু কোথাও নেই। শিশুদের আবার অধিকার কী! এটা ছোটো থেকেই আমাকে খুব ভাবিয়েছিল। শিশুরা কেন চরিত্র হয়ে উঠবে না! তাই ঠিকই করে নিয়েছিলাম আমার ছবিতে শিশুকে ঘিরে সবাই দাঁড়াক। আমার কোনো ছবিকেই কিন্তু শিশুদের জন্য নির্মিত চলচ্চিত্র বলতে পারবে না। ‘রেনবো জেলি’ কি বাচ্চাদের ছবি? না, বাচ্চাদের উপর নির্ভর করা ছবি। এই ভাবনাটা আমাদের সমাজে আসা খুব দরকার।
