“আমি সাধারণ পুতু-পুতু মার্কা গল্প বলি না” — ঋত্বিক ঘটক

মূল্যবোধের প্রতি তাঁর কিছু দায়বদ্ধতা ছিল বৈকি

জন্মের পর প্রায় ৯৫ বছর কেটে গেছে। কিন্তু এখনও কেন সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ঋত্বিক ঘটক, এ নিয়ে সিলেবাসভিত্তিক পড়াশোনা হয় বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে চলচ্চিত্র বিদ্যা বিভাগে। আসলে ঋত্বিক ঘটক যে শুধুমাত্র একজন ছবি করিয়ে ছিলেন তা নয়, সমাজের প্রতি – মূল্যবোধের প্রতি তাঁর কিছু দায়বদ্ধতা ছিল বৈকি! ছিল বলেই তো, বেঁচে থাকার সময়ে লাথি-ঝাঁটা ছাড়া তাঁর কপালে বিশেষ কিছু জোটেনি৷ বিরক্ত, কিচ্ছু করতে না পারার অসহায়তা এবং কিছু একটা বলতে চাওয়ার অদম্য ইচ্ছায় তাঁর বন্ধু হয়ে গিয়েছিল মদ আর এই পোড়া দেশ।

ঋত্বিক ঘটকের লেখা 'নিজের পায়ে নিজের পথে পড়তে পড়তে বারবার মনে হচ্ছে, তিনি যা চেয়েছিলেন, সেটাই করেছিলেন। আপোষহীন বেঁচে থাকার মজা উপভোগ করেছিলেন আজীবন। খুব সম্প্রতি আবার পড়া গেল বইটি। ঋত্বিক ঘটকের জন্মদিন উপলক্ষে ২০১০ সালের নভেম্বর মাসে বইটি যৌথ উদ্যোগে প্রকাশ করেছিল সিনে সেন্ট্রাল ক্যালকাটা এবং মনফকিরা।

নিজের পায়ে নিজের পথে/ প্রথম প্রচ্ছদ

ঋত্বিক প্রতি মুহূর্তে আপনাকে ধাক্কা দিয়ে বোঝাবেন ‘ইট ইজ নট অ্যান ইমাজিনারি স্টোরি’ অর্থাৎ তাঁর কথায়, ‘আমি আপনাকে সস্তা আনন্দ দিতে আসিনি’। প্রতি মুহূর্তে আপনাকে হন্ট করাবে, বোঝানো হবে যা দেখছেন তা একটা কল্পিত ঘটনা, কিন্তু এর মধ্যে দিয়ে যেটা বোঝাতে চাওয়া হচ্ছে, সেই থিসিসটা বুঝুন, যেটা সম্পূর্ণ সত্যি। সেটার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করানোর জন্যই ঋত্বিক আপনাকে বিচ্ছিন্ন করে দেবেন বারবার। যদি আপনি সচেতন হয়ে ওঠেন, সিনেমা দেখে বেরিয়ে এসে বাইরের সেই সামাজিক বাধা বা দুর্নীতি বদলানোর কাজে লিপ্ত হয়ে ওঠেন, তাহলে শিল্পী হিসাবে ঋত্বিক ঘটকের সার্থকতা এখানেই। কারণ তিনি তাঁর প্রতিবাদকে চারিয়ে দিতে চান আপনার মধ্যেই। এবং এক্ষেত্রে তিনি ভীষণ সচেতন শিল্পী।

পছন্দের চলচ্চিত্র নির্মাতা সর্বোপরি শিক্ষকদের নিয়ে ঋত্বিক ঘটক লিখছেন, "চলচ্চিত্রশিল্পে আমি বলে নয়, যাঁরা পৃথিবীর সবচেয়ে সিরিয়াস শিল্পী এবং আমার বাংলাদেশেও যারা সিরিয়াস কাজ করেন, যাদের নাম-টাম আপনারা শুনেছেন-টুনেছেন, প্রত্যেকেই একজনের দ্বারা অনুপ্রাণিত এবং সেই ব্যক্তিটি হচ্ছেন সের্গেই আইজেনস্টাইন। আইজেনস্টাইন না-থাকলে আমরা কাজ-কম্মর ‘ক’-ও শিখতাম না। উনি আমাদের বাবা। আমাদের পিতা। তাঁর লেখা, তাঁর থিসিস এবং তাঁর ছবি— এগুলো ছোটোবেলায় আমাদেরকে পাগল করেছিল। এবং তখন ওগুলো আসত না। বহু কষ্টে লুকিয়ে-লুকিয়ে নিয়ে আনা হত। এই আইজেনস্টাইন… সত্যজিৎ রায়কেও আপনারা জিজ্ঞেস করতে পারেন, হি উইল অ্যাডমিট, দ্যাট হি ইজ দ্য ফাদার অফ আস। আর (তাঁর থেকেই) আমরা ছবি কাটতে শিখেছি… ফিল্মমেকিং-এ ওটা একটা ব্যাপার। তারপর পুদভকিন সাহেব। পুদভকিন এসেছিলেন ১৯৪৯ সালে। তখন আমার সৌভাগ্য হয়েছিল পার্টির তরফ থেকে… পার্টি আমাকে চাপিয়ে দিল যে পুদভকিন-এর একটু পিছনে-পিছনে ঘোরো। এই পুদভকিন একটা কথা আমাকে বলে দিয়েছিলেন সে দিন, সেটা আমার শিক্ষার বেসিস। সেটা হচ্ছে যে ফিল্ম ইজ নট মেড। ফিল্মমেকিং কথাটা বাজে কথা। ফিল্ম ইজ বিল্ট। ব্রিক টু ব্রিক। যে-রকম ভাবে একটা বাড়ি তৈরি হয়, ফিল্ম তেমনই শট বাই শট কেটে-কেটে তৈরি হয়। ইট ইজ বিল্ট, ইট'স নট মেড।"

নিজের পায়ে নিজের পথে/ ব্লার্ব

এখানে আরেকজনের কথাও তিনি বলছেন। তিনি লুইস বুনুয়েল। লিখছেন, “ছবি কী, এই ক’টা লোক থেকে আমি পেয়েছি।” ঋত্বিক ঘটক জাতশিল্পী। সিনেমা তাঁর রক্তে৷ একথা অনস্বীকার্য যে, শিল্পের যেকটি পথে তিনি হেঁটেছিলেন— গল্প, নাটক এমনকি প্রবন্ধ তার চেয়ে সিনেমায় তাঁর উদারতা অনেক বেশি। যেখানে তিনি পরীক্ষানিরীক্ষার কাজটি চালিয়ে গেছেন আজীবন। সেই কারণে যন্ত্রসভ্যতা বনাম মানবসভ্যতার কথা বলেন 'অযান্ত্রিক'-এ, 'মেঘে ঢাকা তারা'য় নীতার মা-কে আঁকেন, 'সুবর্ণরেখা'য় পুরাণের ছাপ স্পষ্ট মাধবী মুখোপাধ্যায়ের চরিত্রে কিংবা 'তিতাস একটি নদীর নাম', 'যুক্তি তক্কো আর গপ্প'তে এসে তিনি আরও মানবিক হয়ে ওঠেন। তাঁর চলচ্চিত্রের মোড়কে হাজির হয় কাঁটাতারের রক্তাক্ত গল্প। গভীর প্রেমের দৃশ্যেও তখন মূল্যবান হয়ে ওঠে ওপার বাংলার চলে যাওয়া ট্রেন আর আগমনী-বিজয়ার গ্রামীন সুর। প্রেমের কথা বলতে গিয়ে নিজেই লিখছেন, “আমি কোনো সময়েই একটা সাধারণ পুতু-পুতু মার্কা গল্প বলি না- যে একটি ছেলে একটি মেয়ে প্রেমে পড়েছে, প্রথমে মিলতে পারছে না, তাই দুঃখ পাচ্ছে, পরে মিলে গেল বা একজন পটল তুলল— এমন বস্তাপচা সাজানো গল্প লিখে বা ছবি করে নির্বোধ দর্শকদের খুব হাসিয়ে বা কাঁদিয়ে ঐ গল্পের মধ্যে ইনভলভ করিয়ে দিলাম, দু’মিনিটেই তারা ছবির কথা ভুলে গেল, খুব খুশি হয়ে বাড়ি গিয়ে খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল— এর মধ্যে আমি নেই।”

ঋত্বিক আমাদের দেশজ উপাদান। ঠিক এখানেই তিনি এক এবং অনন্য।

গ্রন্থঋণঃ নিজের পায়ে নিজের পথে/ ঋত্বিককুমার ঘটক

Developed by DXDasia