বাংলা থিয়েটারের দর্শক হয় না – একথা মানতে নারাজ শ্রীরামপুরের ‘ধ্রুপদ’ নাট্যদল

একুশ বছর ধরে দেশের নানা প্রান্তে অভিনয় করছে ‘ধ্রুপদ’

“বাংলা থিয়েটারের দর্শক হয় না, এ কথা আমি মানি না। ভালো কাজ করতে পারলে নিশ্চয়ই দর্শক হবে”, বাংলা থিয়েটার নিয়ে হাহুতাশ করা বাঙালিকে যোগ্য জবাবটা দিলেন শ্রীরামপুরের ‘ধ্রুপদ’ (Dhrupad) নাট্যদলের পরিচালক দেবাশিস চক্রবর্তী (Debasish Chakraborty)।

হুগলি জেলার শ্রীরামপুর (Serampore), আজ থেকে একুশ বছর আগে যে শহর ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম। শখের থিয়েটার বলতে বেশিরভাগ মানুষ বুঝতো ‘ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো’। ২০০১ সালের মাঝামাঝি, কলকাতার দল ছেড়ে বেরিয়ে এসে মফস্‌সলের বুকে নতুন করে থিয়েটার গড়ার স্বপ্ন দেখেলো একদল মাঝবয়সী। অলীক স্বপ্ন। একদিকে চরম অর্থনৈতিক সমস্যা, রিহার্সাল রুমের অভাব, অন্যদিকে সরকারি অথবা বেসরকারি কোনো সহায়তাও তখন ধারণার বাইরে। দলের সদস্যরা নিজেরাই কেউ সংসার খরচ বাঁচিয়ে, কেউ আবার টিউশন পড়িয়ে শুরু করেছিল একটি থিয়েটার দল। দলের নাম ‘ধ্রুপদ’, আজ দীর্ঘ একুশ বছর পার করে এসেছে।

শ্রীরামপুর শহরের এক চিলতে ভাড়া ঘরে বসে তৈরি হল নতুন থিয়েটার দল (Group Theatre)। কিন্তু নাম কী হবে! দেবাশিসবাবুর কথায়, “দলের নাম কী হবে, সে নিয়ে এক কাণ্ড। বড়োসড়ো তালিকা তৈরি হয়েছিল নামের। তারপর কখন, কে এই ‘ধ্রুপদ’ নামটাকে প্রথম স্বীকৃতি দিয়েছিল তা অবশ্য আজ আর মনে নেই। তবে সকলেই সায় দিয়েছিল নিশ্চিত।” লাইট, সাউন্ড, ক্যামেরা, অ্যাকশন সবই আছে কেবল ‘রিটেক’-এর সুযোগ নেই এখানে। দেবাশিসবাবুর কথায়, মঞ্চেই সকল মুক্তি। কলাকুশলীদের অভিনয় জীবনের এই চরম সত্যটাকে ধরতে চেয়েছেন তিনি আজীবন।

দলে কোনো রথী মহারথীর প্রয়োজন পরেনি কখনও, দৈনন্দিন জীবনে খেটেখাওয়া মানুষের অভিনয়ে দিব্যি এগিয়েছে ‘ধ্রুপদ’। ‘খাঁচার পাখি’, ‘সহচরী’, ‘বুটজুতো’, ‘রঙের হাট’ ‘পুঁটি রামায়ণ’, ইত্যাদি আরও কতো কতো অনবদ্য অভিনয়।

২০১৭ সালে ‘ধ্রুপদ’-এর প্রযোজনায় ‘আরশিনগর’ নাটক দাপিয়ে বেড়াতে শুরু করলো কলকাতায়। কলকাতা ছাড়িয়ে ডাক এল দেশের নানা প্রান্ত থেকে। ৩৫ জনের দল নিয়ে দেশ জুড়ে শো হল। ‘ধ্রুপদ’-এর অভিনয় প্রশংসিত হল সর্বমহলে। ইন্দ্ররঙ্গ মহোৎসবে বাংলার সেরা নাটকের তকমা জিতে নিলো ‘আরশিনগর’। থিয়েটার-ব্যক্তিত্ব তথা মন্ত্রী ব্রাত্য বসুর (Bratya Basu) হাত থেকে এল সেরার শিরোপা। এখনও পর্যন্ত সারা ভারতে প্রায় ২৬টি শো হয়েছে এ নাটকের। প্রতিবারই দর্শকদের ভিড় বুঝিয়ে দিয়েছে, এ নাটকের প্রতি তাঁদের ভালোবাসা।

 

দলে এখন সদস্য সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি। শুধু শ্রীরামপুর নয়, অনেক দূরদূরান্ত থেকে ছেলেমেয়েরা নিয়মিত আসে অনুশীলনে (Reharsal)। দেবাশিসবাবু-সহ দলের পুরোনো সদস্যরা নিজেরাই ওয়ার্কশপ (Workshop) করান। সম্প্রতি আসতে চলেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি পাঠ্যের উপর ভিত্তি করে ৪৫ জন সদস্যের নতুন প্রযোজনা। প্রায় ১০ বছর ধরে দলের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইমন দাস (Iman Das)। তরুণ এই সদস্যের কথায়, “প্রথম থেকেই ধারাবাহিক মঞ্চসজ্জা কিংবা গতে বাঁধা গল্পের বাইরে গিয়ে অন্যaভাবে থিয়েটার নিয়ে কাজ করতে চেয়েছিল ‘ধ্রুপদ’। তার জন্য অবশ্য বেগও পেতে হয়েছে অনেক। অর্থনৈতিক টানাপোড়েন, সুযোগ সুবিধার অভাব, সর্বোপরি পরিচিতির অভাব। একটা শোয়ের জন্য ঘুরতে হয়েছে এদিক-সেদিক। কিন্তু নিজেদের জায়গা থেকে সরেনি আমাদের দল। বিশ্বাস রেখেছিল ভালোভাবে কাজ করে যেতে পারলে একদিন ঠিকই মঞ্চ (Stage) জুটে যাবে।”

২০০২ সালে রেজিস্ট্রেশন হয় ‘ধ্রুপদ’ নাট্যদলের। যদিও দলগত অভিনয়ের যাত্রাটা শুরু হয়ে গিয়েছিল আগেই। ইমনের কথায়, “দলের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল ‘নাকাল’ নাটকটি।” এ নাটকের প্রযোজনায় অভিনয় করেছিলেন মফস্‌সলের আরো কিছু তরুণ। দেবাশিস চক্রবর্তীর নির্দেশনায় এই নাটকে উঠে এসেছিল খেটেখাওয়া মানুষের রোজনামচা।

থিয়েটারকে কেন্দ্র করে এখনও সমাজের বৃহত্তর এক অংশের মানুষের জীবন অতিবাহিত হয়। মাঝে করোনার কারণে প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল সমস্ত শিল্পমাধ্যম। কিন্তু হাল ছাড়েনি ‘ধ্রুপদ’। দেবাশিস চক্রবর্তী জানান, “কাজ ছাড়লে চলবে না, ওটাই ঘুরে দাঁড়ানোর আসল মন্ত্র।” দলে কোনো রথী মহারথীর প্রয়োজন পড়েনি কখনও, দৈনন্দিন জীবনে খেটেখাওয়া মানুষের অভিনয়ে দিব্যি এগিয়েছে ‘ধ্রুপদ’। ‘আরশিনগর’ বা ‘নাকাল’ ছাড়াও ‘খাঁচার পাখি’, ‘সহচরী’, ‘বুটজুতো’, ‘রঙের হাট’ ‘পুঁটি রামায়ণ’ – এরকম আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রযোজনা মঞ্চস্থ করেছে মফস্‌সলের ছোট্ট এই দলটি। জানা যায়, দীর্ঘ সাত বছর ধরে চলেছিল ‘ধ্রুপদ’ প্রযোজিত নাটক ‘রঙের হাট’। ‘পুঁটি রামায়ণ’ প্রযোজনায় ছিল বাংলার ছৌ শিল্পের অসাধারণ মেলবন্ধন।

দলে এখন অনেক নতুন মুখ। পুরোনোদের সঙ্গে নতুনরাও এখন একুশ বছর আগের স্বপ্নগুলো নিয়ে প্রতিনিয়ত পথ চলছে। মঞ্চ-যাপনে তাঁরা সকলেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। আলো, শব্দ, সংলাপ আর অভিনয় এটুকুই সম্বল। এটুকুর জন্য আজীবন ছুটে বেড়াতে প্রস্তুত শ্রীরামপুরের ‘ধ্রুপদ’ নাট্যগোষ্ঠী।

Developed by DXDasia