
মুকুট তপাদারের লেখা ও ছবিতে শ্রীরামপুর ‘হেরিটেজ ওয়াক’-এর শেষ পর্ব
গত পর্বের পর…
হেরিটেজ ওয়াকে (Heritage Walk) এবারের গন্তব্য ডেনিশ প্রশাসনিক ভবন (Denish Government House) অর্থাৎ আজকের আদালত চত্বর পেরিয়ে কে.এ. সাহা রোডের ওপর মেলা বাড়ি। মেলা বাড়িটির চারপাশ ভাঙাচোরা হয়ে পড়েছে। তবুও প্রাচীনত্বের ঔজ্জ্বল্য খোয়া যায়নি। ব্রিটিশ আমলে ক্ষেত্রমোহন সাহা বিরাট জমি-জমা, পুকুর সহ এই বাড়িটি বানিয়ে ছিলেন। তাঁর তৈরি শিব মন্দিরটিতে আজও রয়েছে বিশেষ ধরনের ডোরিক কাজ। দালান ঘেরা এই বাড়িটির দেওয়ালে টেরাকোটার বহু দেব দেবীর মূর্তি খোদিত আছে। সময়ের সঙ্গে ধস নেমেছে পুরোনো স্থাপত্যে। ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে এখন যা পড়ে রয়েছে তা কেবলই ইতিহাসের ফসিল। বর্তমানে এখানেই গড়ে উঠেছে হত দরিদ্র মানুষের পাকাপাকি আস্তানা।

আবুল ফজলের ‘আইন-ই-আকবরি’ তে শ্রীরামপুরের শ্রীপুর জায়গাটির নাম পাওয়া যায়। দিনেমাররা এই শ্রীপুরেই আলিবর্দি খানের থেকে জমি কিনে প্রথম ব্যবসার কাজে বসতি গড়ে তোলে।
এই বাড়িটি ছাড়িয়ে খানিকটা এগিয়ে গেলেই পড়ে শ্রীরামপুরের পুরোনো ডেনিশ সিমেট্রি (Danish Cemetery)। এখানকার কবরগুলির ফলকের গায়ে শহরের নামের জায়গায় শ্রীরামপুরের (Serampore) বদলে পুরোনো ‘ফ্রেডরিক নগর’ (Fedric Nagar) নামটি পাওয়া যায়। ডেনিশ সমাধিস্থলটি দুভাগে বিভক্ত রয়েছে। একটি ক্যাথলিক এবং অপরটি প্রোটেস্টান্ট। এই সমাধিস্থলে রয়েছে ডেনিশ গভর্নর হলেনবার্গের সমাধি। ডেনিশ সমাধিস্থলটির গায়ের যে রাস্তাটি ধরে জি.টি রোডের দিকে যাওয়া যায়, তার নাম ‘সিমিটারী লেন’। একেবারে অন্যরকম একটি নাম এই রাস্তার। পাশেই ছিল ডেনিশদের গোরস্থান, দীর্ঘকাল ধরে লোকমুখে ‘সিমেট্রি’ হয়ে গিয়েছে ‘সিমিটারী’। এখনও বেশ কিছু বাড়ির নাম-ফলকে ‘সিমিটারী’ শব্দটা খুঁজে পাওয়া যায়। আবুল ফজলের ‘আইন-ই-আকবরি’ তে শ্রীরামপুরের শ্রীপুর জায়গাটির নাম পাওয়া যায়। দিনেমাররা এই শ্রীপুরেই আলিবর্দি খানের থেকে জমি কিনে প্রথম ব্যবসার কাজে বসতি গড়ে তোলে।

হেরিটেজ ফটো ওয়াকের শেষ গন্তব্য ছিল শ্রীরামপুরের বিখ্যাত মাহেশের রথ। পুরীর ঠিক পরেই স্থান মাহেশের। ভারতের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম এটি। ভাগীরথী নদীতে ভেসে আসা নিম কাঠ দিয়ে তৈরি হয়েছিল মাহেশের জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রা মূর্তি। ইতিহাস বলে, সন্ন্যাস গ্রহণের পর একবার নবদ্বীপ থেকে পুরী যাওয়ার পথে মহাপ্রভু চৈতন্যদেব মাহেশের এই মন্দিরে আসেন। পুরীর মন্দির প্রসঙ্গে কথিত ছিল ‘নীলাচল’ নামটি। মাহেশের মন্দির দেখে মুগ্ধ মহাপ্রভু মন্দিরের নাম দেন ‘নব নীলাচল’।

কথিত আছে, জগন্নাথদেবের স্বপ্নাদেশ পেয়ে ধ্রুবানন্দ বলরাম, জগন্নাথ ও শুভদ্রার মূর্তি ও মন্দির স্থাপন করেন। কালের গতিতে ভাগীরথীর পশ্চিম পাড় ভাঙ্গতে থাকায় মন্দিরের গর্ভগৃহটি নদীতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা যায়। সেইসময় কলকাতার এক বিত্তবান ব্যবসায়ী নয়নচাঁদ মল্লিক গঙ্গার পাড় থেকে মন্দির সরিয়ে নিয়ে আসেন মাহেশের রাজপথ অর্থাৎ জি.টি রোডের ওপরে। আজও সেখানেই স্বমহিমায় রয়েছেন জগন্নাথ, বলরাম এবং সুভদ্রা। রয়েছে তাঁর বার্ষিক ভ্রমণের রথটিও। মাহেশের রথযাত্রা শুরু করেন চৈতন্য শিষ্য কমলাকর পিপলাই। পরে মন্দিরে তিনিই প্রধান পুরোহিত হন।
ধ্রুবানন্দের প্রতিষ্ঠিত সেই পুরোনো বিগ্রহ পূজিত হলেও, রথের ইতিহাস খানিক অন্যরকম। মন্দিরে প্রথম কাঠের রথ দান করেন কৃষ্ণরাম বসু। যদিও ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে পুড়ে যায় সেই রথ। ১৮৮৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হুগলি জেলার তৎকালীন দেওয়ান ছিলেন শ্যামবাজারের এক ব্যক্তি। তাঁর উদ্যোগেই লোহার ওপর কাঠের প্রলেপ দেওয়া পাঁচটি চূড়া বিশিষ্ট বর্তমান রথটি তৈরি করে বিখ্যাত মার্টিন বার্ন কোম্পানি। এই লোহার রথটির এক-একটি তলা আলাদা আলাদা পুরাণকথা বলে। কৃষ্ণলীলা, চৈতন্যলীলা, রাসলীলার ছবি আঁকা আছে রথের দেওয়ালে। রথের সামনে রয়েছে তামার ঘোড়া এবং কাঠের সারথি। এখনও নিয়ম করে রঙ করে জৌলুস ধরে রাখা হয়েছে প্রাচীন রথটির। শুধু রথ উৎসব নয়, বছরের অন্যান্য উৎসবেও আলোয় মুড়ে ফেলা হয় রথটিকে। যা আজও টানা হচ্ছে। রাজ্য সরকারের সহায়তায় বর্তমানে মন্দিরে নতুন ভাবে গড়ে তোলা হয়েছে সুন্দর পরিকাঠামো। গত দু’বছর করোনা আবহে জাঁকজমক বন্ধ থাকলেও এবছর আবারও পুরোনো মেজাজে সেজে উঠছে মাহেশের বিখ্যাত রথযাত্রা। চলছে একমাসব্যাপী বিখ্যাত রথের মেলাও।

একদিকে ৬২৬ বছরের বিখ্যাত মাহেশের রথ (Mahesh Rath), অন্যদিকে চটকল, প্রথম ছাপাখানা, গির্জা, কোর্ট, ড্যানিশ ঐতিহ্য ইত্যাদি নানান ইতিহাসের ছড়িয়ে রয়েছে এ শহরে। হেরিটেজ ফটো ওয়াকের একদিনের সফরে সবটুকু হয়তো ছুঁয়ে যাওয়া সম্ভব হলো না আমাদের, তবে প্রাচীন ইতিহাসের গা থেকে খানিকটা ধুলো যে সরাতে পারলাম, এ নিশ্চিত।
শেষ।
