‘শরতের মেয়ে মৃন্ময়ী’ এবং সত্যজিৎ রায়ের ‘সমাপ্তি’

তিনকন্যা-র ‘সমাপ্তি’— সত্যজিতের দৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথের গল্প

‘শরতের মেয়ে মৃন্ময়ী’ — এমনটিই লেখা ছিল রবি ঠাকুরের ‘সমাপ্তি’ গল্পে। এই শব্দগুচ্ছ মগ্ন পাঠকের চোখের সামনে অবশ্যই জাগিয়ে তোলে শারদীয়া দুর্গার চালচিত্র। ঝকঝকে প্রকৃতি  আর মাটির মেয়ে হয়ে চিন্ময়ীদেবীর বাপের ঘরে ফেরা— এই তো বাঙালির মনে দুর্গাপুজোর সহজ সূত্র। ‘সমাপ্তি’ গল্প এবং সিনেমা দুটিতেই মৃন্ময়ী ঘরের বাঁধন ছিন্ন করতে চায় আর তারপর মৃদু নরম এক বিরহী মেয়ে এসে ভর করে তার উপর। মৃন্ময়ী উদার প্রান্তরকে অন্তরে নির্বাসিত করে ঘর ও বরকে গ্রহণ করে। আজকে আমাদের কথনের বিষয় রইল— ‘সমাপ্তি’— সত্যজিতের দৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথের গল্প।

সিনেমা আর গল্পের শুরুটা একরকম। দূর থেকে পালতোলা নৌকা ভেসে আসছে। অপূর্বকৃষ্ণ বিএ পাস করে কলকাতা থেকে দেশে ফিরছে। যুবক মনে আবেগ ভরা বর্ষার নদীর মতোই। সিনেমায় অপূর্ব বই পড়তে পড়তে, প্রকৃতি দেখতে দেখতে গ্রামে প্রবেশ করে। অতিরিক্ত উত্তেজনায় নৌকা থেকে ডাঙায় নামতে গিয়ে কাদায় পড়ে একাকার কাণ্ড! সেই অবাঞ্ছিত মুহূর্তেই গল্পের অপূর্ব আর মৃন্ময়ীর প্রথম দেখা। অপূর্বর এই কাদার পড়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে ‘কোথা হইতে এক সুমিষ্ট উচ্চকণ্ঠে তরল হাস্যলহরী উচ্ছ্বসিত হইয়া নিকটবর্তী অশথগাছের পাখিগুলিকে সচকিত করিয়া দিল।’ ইঁটের সারির উপর বসে মৃন্ময়ীর উচ্ছল হাসি অপূর্বর কানের ভিতর দিয়ে একেবারে মরমে প্রবেশ করল। সিনেমায় অপূর্বর নাম হয়েছে অমূল্য। সত্যজিতের যেকোনো সাহিত্য নির্ভর সিনেমাই নতুন কোনো কথা বলেছে। অপূর্বর এই অমূল্য নামকরণের মধ্যে দিয়ে মৃন্ময়ীর মনে ধীরে ধীরে প্রেমের মূল্য বোঝার ইঙ্গিত বেশ স্পষ্ট। সিনেমায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অমূল্য এবং অপর্ণা সেন (তখন দাশগুপ্ত) মৃন্ময়ীর ভূমিকায় অভিনয় করেন। ১৯৬১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘তিন কন্যা’ ছবির শেষটি ‘সমাপ্তি’। ‘পোস্টমাস্টার’, ‘মনিহারা’ ও ‘সমাপ্তি’— অবশ্যই নারীকেন্দ্রিক ছবি।

‘সমাপ্তি’-র মৃন্ময়ী ষোড়শী। রবীন্দ্রসাহিত্যে নানা চরিত্রের মধ্যে বয়ঃসন্ধির সমস্যা এসেছে। মৃন্ময়ী সেই সমস্যাকে যেন ভাষারূপ দেয়। সত্যজিৎ রায় আশ্চর্য কৌশলে নদীর চর, দোলনা, কাঠবেড়ালি, উচ্ছল হাসির প্রতীকে মৃন্ময়ীর শিশু মনকে প্রকাশ করিয়েছেন। তারপর নিখুঁত  দক্ষতায় ঘরের কোণে দিবাস্বপ্নের ইঙ্গিত, মৃন্ময়ীর হাসি ও কান্নার বিচিত্র বিভঙ্গে তাকে নিয়ে গিয়েছেন তারুণ্যের দোরগোড়ায়। সিনেমার শেষে মৃন্ময়ীর ঘরে ফিরে আসা ও অমূল্যের বাহুবন্ধনে আত্মসমর্পণ — তার বড়ো হয়ে যাওয়ার প্রতীক। ‘সমাপ্তি’ সিনেমার নিউক্লিয়াস প্রেম পুরোপুরি নয় বলেই মনে হয়। একটি বালিকার মনে তারুণ্যের অনুভূতি সঞ্চার। সেই ম্যাজিকটি সম্ভব করেছে অমূল্যর রাগ করে কলকাতা ফিরে যাওয়ার ঘটনায়। স্বামীর  বিরহ মৃন্ময়ীকে উল্টোপথে নিয়ে গিয়েছে পূর্বরাগ, অনুরাগ, অভিসারের পথে। গল্পের শেষটা অন্যরকম। অপূর্ব চলে যাওয়ার পর মৃন্ময়ী নিজের মধ্যে পরিবর্তন অনুভব করে। রবীন্দ্রনাথ বেশ বলেছেন, ‘গল্পে শুনা যায়, নিপুণ অস্ত্রকার এমন সূক্ষ্ম তরবারি নির্মাণ করিতে পারে যে, তদ্ দ্বারা মানুষকে দ্বিখণ্ড করিলেও সে জানিতে পারে না, অবশেষে নাড়া দিলে দুই অর্ধখণ্ড ভিন্ন হইয়া যায়। বিধাতার তরবারি সেইরূপ সূক্ষ্ম, কখন তিনি মৃন্ময়ীর বাল্য ও যৌবনের মাঝখানে আঘাত করিয়াছিলেন সে জানিতে পারে নাই—।’ রবীন্দ্রনাথের এই সূত্রটিকেই ব্যবহার করেছেন সত্যজিৎ রায়। সিনেমার মৃন্ময়ীর একটি কাঠবেড়ালির সঙ্গে সখ্য। পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে তার খেলা। অমূল্যর কনে দেখতে যাওয়ার পথে, কনে দেখার আসরে মৃন্ময়ীয় চাপল্য অমূল্যর সবটুকু মনোযোগ কেড়ে নেয়। রোম্যান্টিক অমূল্য বিদেশি গল্পের অনুকরণে প্রেমে পড়ে। কিন্তু অমূল্যর মা ভয়ে ত্রস্ত। আসলে মৃন্ময়ীকে গ্রামের লোকে ‘পাগলি’ বলে। গড়পরতা মেয়েদের থেকে অন্যরকম। এই অন্যরকম বলেই অমূল্য তাকেই পছন্দ করেছে। 

মৃন্ময়ী গল্পেও যেমন পোনি ঘোড়ার মতো ঘাড় বাঁকিয়ে বিয়ে করবে না বলেছিল, সিনেমাতেও বিয়ের বন্ধন তাকে অস্থির করে তোলে। সিনেমার অমূল্যের মা যখন মনের সঙ্গে সমঝোতা করে তাকে ঘরে ডেকে রান্নার ফোড়নের বিষয় জিজ্ঞাসা করেন, মৃন্ময়ী আচারের শিশির দিকে লুব্ধ ভঙ্গিতে চেয়েই উত্তর দেয়। শুভদৃষ্টির সময় বেয়াড়া ভঙ্গিতে অমূল্যের দৃষ্টি প্রত্যাখান করে। বিয়ের রাতে ঘর ছেড়ে দূরে নদীর চরে গিয়ে দোলনায় চড়ে বসে। সিনেমায় পরের দিন তাকে মাঝি মাল্লারা দিয়ে যায়। অপমানে, লাঞ্ছনায় অমূল্য কলকাতায় ফিরে যেতে চায়। যাওয়ার আগে শুধু একটা চিঠির প্রত্যাশা রেখে যায়। ‘আপনি’ নয়, ‘তুমি’ সম্বোধনে সে পত্র পৌঁছবে  অমূল্যর কাছে মৃন্ময়ীর আহ্বান হয়ে। গল্পে সে প্রত্যাশা ছিল একটি চুম্বনের। গল্পের মৃন্ময়ী যেমন উচ্ছল হাসিতে সে চুম্বন প্রত্যাখ্যান করেছিল, সিনেমার মৃন্ময়ীর অবাক ভঙ্গি চিঠির গুরুত্ব বোঝেনি। চুম্বন হোক বা পত্র— দুটিই সম্পর্কের সংযোগ সেতু। মৃন্ময়ীর অপরিণত মন চঞ্চলতা বোঝে, প্রেমের অনুভূতি বোঝার মতো অবসর তার শিশুমন তাকে দেয়নি। অথচ এই মেয়েটিই মনে মনে বড়ো হবে। আঁকাবাঁকা হরফে বরকে চিঠি লিখবে— ‘তুমি চলে এসো। ইতি পাগলি।’ গল্পের বা সিনেমার কোনো চিঠিই অপূর্ব ওরফে অমূল্যর কাছে পৌঁছোয় না। তার আগেই দেখা হয়। গল্পে মৃন্ময়ী আর তার শাশুড়ি কলকাতায় যায়, অপূর্বর বোনের বাড়িতে। সেখানে অপূর্ব এসে রাতে থেকে যেতে বাধ্য হয় আর গভীর রাতে ‘হঠাৎ বলয়নিক্কণশব্দে একটি সুকোমল বাহুপাশ তাহাকে সুকঠিন বন্ধনে বাঁধিয়া ফেলিল এবং একটি পুষ্পপুটতুল্য ওষ্ঠাধর দস্যুর মতো আসিয়া পড়িয়া অবিরল আবেগপূর্ণ চুম্বনে তাহাকে বিস্ময় প্রকাশের অবসর দিল না।’ 

সিনেমায় সারাদিন মৃন্ময়ী তথা মিনুকে খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত অমূল্য যখন ঘরে ফেরে, তখন বিছানায় পড়ে থাকে আঁকাবাঁকা হরফে লেখা চিঠি। তারপরেই বিস্ময়ে বিহ্বল অমূল্য দেখতে পায় মৃন্ময়ী এসে দাঁড়িয়েছে। স্বেচ্ছায়  আত্মসমর্পণের ভঙ্গি তার। অমূল্যের কথার উত্তরে বলে , ‘আমার ইচ্ছে’। ঠিক এই দুটি শব্দ  সিনেমার মৃন্ময়ীকে অনেক বলিষ্ঠ করে তোলে রাবীন্দ্রিক মৃন্ময়ীর থেকে। রবীন্দ্রনাথের মৃন্ময়ী অপূর্ব ফেরার আগেই ঘরে ফেরে। শূন্য ঘরে তার বিরহযাপন ধীরে ধীরে তার জেদি বেপরোয়া সত্তাকে মুছে দেয়। কিন্তু সিনেমার মৃন্ময়ী নিজেকে পুরোপুরি হারিয়ে যেতে দেয় না। অপূর্ব ফিরে এসেছে খবর পেয়েই লুকিয়ে পড়ে। কেউ তাকে খুঁজে পায় না। কারণ রাখাল তাকে বলেছে, মায়ের অসুখ খবর পেয়ে অমূল্য ফিরেছে। বিরহী মেয়ের অভিমান কেউ বোঝে না। অঝোর বৃষ্টিতে কান্না ধুয়ে যায়। এমনি সময় অমূল্যের ডাক মৃন্ময়ীকে সচকিত করে। আশ্চর্য দৃশ্য সৃজন করেছেন সত্যজিৎ। মৃন্ময়ী লাল পাড় শাড়ি পরে কাঁদতে কাঁদতে হেসে ওঠে। বৈষ্ণবপদাবলীর কিশোরী রাধাকে মনে পড়ে। আসলে আহ্বানের এই স্বীকৃতিটুকু না হলে মৃন্ময়ীর পক্ষে ধরা দেওয়া সহজ ছিল না। সত্যজিতের মৃন্ময়ী এতটাই আত্মাভিমানী। এখানেই তার স্বকীয়তা। 

এরপর সিনেমায় যখন অমূল্যের মা সিঁড়ি দিয়ে খাবার নিয়ে উঠতে থাকে তখন সজোরে দরজা বন্ধ হয়ে যায়। ইঙ্গিতে দাম্পত্যের নিভৃত অন্তরঙ্গতার সঙ্গে সত্যজিৎ আরো একটি বিষয় স্পষ্ট করেন— ‘প্রাইভেসি’। দাম্পত্যজীবনে এই নিরালা অবসর বড্ড প্রয়োজন। পরস্পরকে বোঝার জন্য। সমাজ ও পরিবারের প্রবল অনুপ্রবেশ সম্পর্ক নষ্ট করে দিতেও পারে। গল্পে কিন্তু অপূর্ব মৃন্ময়ীর মিলনে পরিবারের ভূমিকা অনেকখানি। ১৯৭১ সালে সমাপ্তির গল্প অবলম্বনে আরেকটি হিন্দি  সিনেমা হয়েছিল ‘উপহার’। পরিচালক ছিলেন সুধেন্দু রায়। স্বরূপ দত্ত ও জয়া ভাদুড়ি ছিলেন নাম ভূমিকায়। সেখানে কিন্তু গল্প হুবহু অনুসরণ করা হয়েছিল। অথচ তার দশ বছর আগে সত্যজিৎ রায় দৃপ্ত ভঙ্গিতে অন্য কথা বলে গিয়েছেন। সত্যজিতের সমাপ্তি যেন রবি ঠাকুরের গল্পের পুনর্নিমাণ।

সিনেমার প্রতিটি দৃশ্য স্বতন্ত্র। ইঙ্গিতে কথা বলে। নৌকা, বই, ফোটোফ্রেম, চকচকে জুতো, সূঁচ সুতোর ফোঁড়ে ‘পতির পূণ্যে সতীর পূণ্য’ কথার ইঙ্গিত, গ্রামোফোন-রেকর্ড, দোলনা, কাঠবেড়ালি, চিঠির পাতা— সব বিশেষ বিশেষ অনুভূতির প্রতীক। সিনেমার শুরুতে চড়কি নামের কাঠবেড়ালির প্রতি মৃন্ময়ীর প্রবল আবেগ তার শৈশবের প্রতীক করে তোলে কাঠবেড়ালিটিকে। শেষে ওই কাঠবেড়ালির মৃত শরীর দেখে দর্শক শিউরে ওঠে। কিন্তু মৃন্ময়ীর তেমন ভাববিকার হয় না।  কাঠবেড়ালিটি অবশ্যই মৃন্ময়ীর শৈশবের প্রতীক। কাঁচি দিয়ে নিজের চুল কেটে একসময় রাগ দেখাতো মৃন্ময়ী, গাছে গাছে চড়ে, দোলনায় দুলে দিন কাটতো তার। অথচ তার মধ্যেও লক্ষ্মীমন্ত নারী হয়ে ওঠার সব সম্ভাবনা ছিল। শুক্তোয় কী ফোড়ন দেওয়া হয় সেটাও জানা ছিল। এই মেয়েটির বাবার জন্য মনকেমন করত। গল্পের অপূর্ব হোক বা সিনেমার অমূল্য মৃন্ময়ীকে বোঝার চেষ্টার ত্রুটি রাখেনি। কোনোরকম জোরও করেনি তার উপর। হয়তো তাই তার বিরহ মৃন্ময়ীকে পুরোপুরি নারী করে তুলবে। বিধবা মা ও ছেলের সম্পর্কের হালকা জটিলতা ও অধিকারবোধও দেখানো হয়েছে। অমূল্য প্রথম যে কনে দেখতে যায়, সেখানে এক সময়কার কনে দেখার আসরের নিখুঁত বর্ণনা রয়েছে। নির্মল হাস্যরস সমাজের অনেক জটিল রীতিনীতি সহজ করে বলে দিয়েছে সত্যজিতের ছবিতে। 

‘তিনকন্যা’-র তিনটি ছবির মধ্যে সমাপ্তি সিনেমাটি অন্য মাত্রার। বেশ কয়েকটি মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা দেখানো হয়েছে দৃশ্যগুলির আড়ালে। রবীন্দ্রনাথের গল্পের শেষটিকে একেবারেই নিজের মতো করে সৃজন করেছেন সত্যজিৎ। এইখানেই তাঁর স্বকীয়তা। হয়তো তাই ‘সমাপ্তি’ সিনেমাটি রাষ্ট্রপতির স্বর্ণপদক পেয়েছিল। এছাড়াও বার্লিন ও মেলবোর্ন চলচ্চিত্র উৎসবেও আলাদা করে সম্মানিত হয় সমাপ্তি সিনেমা। লাইট, সাউন্ড, ক্যামেরা, অ্যাকশনের রুপোলি জগতে ‘সমাপ্তি’ একটি মেয়ের মিনু থেকে মৃন্ময়ী হয়ে ওঠার গল্প। মেয়েটির বড়ো হওয়ার আধুনিক কাহিনি।

Developed by DXDasia