সরস্বতী পুজো এবং কুল খাওয়া-না খাওয়ার একটি ‘মনগড়া’ পৃথিবী

সরস্বতী পুজোর আগে কুল খাওয়া নাকি পাপ!

আমরা যারা নব্বই বা তার আগের দশকে বড়ো হয়ে উঠেছি, আমাদের কাছে সময় কাটানোর সম্বল ছিল মূলত মা-ঠাকুমাদের মুখে গল্প শোনা, পাড়ায় খেলতে বেরনো কিংবা বাংলা কমিকসের বই পড়া। সময় বদলেছে ধীরে ধীরে। নব্বইয়ে একটু একটু করে আসতে থেকেছে সাদা-কালো ফোন, ইন্টারনেট, কম্পিউটারের অধিক ব্যবহার। সকালের রেডিও খুললেই মনমাতানো জীবনমুখী গান— একদিকে মহীন কিংবা সুমন, অন্যদিকে অঞ্জন-নচিকেতা। সরস্বতী পুজো এলেই রাস্তায় রাস্তায় হলুদ জামা-কাপড়ের ভিড় (যদিও সে ভিড় এখনও আছে)। সরস্বতী পুজোর প্রসঙ্গ এলেই আমাদের মানে বাঙালিদের কুল খাওয়া-না খাওয়ার একটা বিধান বেশ জোরের সঙ্গেই সমস্ত বাঙালি বাড়িতে পালন করা হত।

সরস্বতী পুজোর আগে কুল খাওয়া নাকি পাপ। খেলেই ধরা পড়ার ভয় এবং বাড়িতে কিছু না জানানো। সে টোপা, বিলিতি, নারকেল যা-ই হোক না কেন। সরস্বতী পুজোর পরেই থাকত স্কুলে স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষা। রেজাল্ট কেমন হবে, তার একটা বাড়তি চাপ তো থাকতই। এমনিতে সরস্বতী পুজোর দুটো দিন বই-খাতা সব তেনার পায়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়ানো যেত। পরীক্ষার কথা উঠতেই বলা যেত, পরীক্ষা তো কী হয়েছে! এই দু-দিন পড়তে নেই। স্কুল থেকে ফেরার পর আমাদের জন্যই যেন অপেক্ষা করত লাল লাল টোপা কুল। সঙ্গে বাড়ি থেকে চুরি করা বিটনুন। সরস্বতী পুজো না হওয়া অবধি আমাদের বার্ষিক পরীক্ষা মাথায় থাকত না, থাকত সংযমের পরীক্ষা। খাব নাকি খাব না! খেলে কী হবে আর না খেলেই বা কী হবে! ইত্যাদি প্রভৃতি নানান প্রশ্ন ঘুরপাক খেত। এই সংযমের পরীক্ষা কিন্তু কুল বিক্রেতারাও নিতেন। একবার যেই মুখে কুলটি পড়ত, ব্যাস সমাজের কাছে সেই ছেলেটি বা মেয়েটি পেত, ‘খারাপ ছেলে’ বা ‘খারাপ মেয়ে’র তকমা। কিন্তু তাতে মনখারাপ থাকত না। সমাজের চোখরাঙানি অস্বীকার করে থাকত মুক্তির স্বাদ (এমনকি কুলের স্বাদও)।

এখন কথা হচ্ছে কুল খাওয়া না খাওয়ার এই মিথ তৈরি হল কোথা থেকে? ভারতীয় পুরাণে এ সংক্রান্ত কিছু কথা বলা হয়েছে। এই ইতিহাস জানার জন্য ফিরে যেতে হবে পুরাণকাহিনিতে। 

পুরাণ মতে, দেবী সরস্বতীকে তুষ্ট করতে একদিন বদ্রিকাশ্রমে তপস্যা করার সিদ্ধান্ত নেন মহামুনি ব্যাসদেব। কিন্তু তপস্যা শুরুর আগেই দেবী একটি শর্ত দেন তাঁকে। একটি কুল বীজ রেখে তিনি বলেন, এই বীজ থেকে গাছ হয়ে কুল হবে। সেই কুল যেদিন ব্যাসদেবের মাথায় পড়বে সেদিন তিনি সন্তুষ্ট হবেন এবং মহামুনির তপস্যা সম্পূর্ণ হবে। শর্ত মেনে তপস্যা শুরু করেন ব্যাসদেব। অতঃপর সেই বীজ থেকে গাছ হল, গাছে কুল ধরল এবং কুল পেকে তা ব্যাসদেবের মাথাতেও পড়ল। ঘটনাচক্রে সেই দিনটা ছিল পঞ্চমী। সরস্বতীর অর্চনায় মহামুনি কুল ফল নিবেদন করেন মহামুনি। জনশ্রুত আছে, সেই থেকেই বিদ্যার দেবীর প্রসাদ হিসেবেই মরসুমের প্রথম কুল খাই আমরা। এবং এই নিয়মমতে পুজোর আগে কারোর কুল খাওয়া উচিত নয়।

এমন সব রোমহষর্ক পুরাণকাহিনি থেকে বঞ্চিত এখনকার অধিকাংশ স্কুল পড়ুয়া। স্মার্টফোন আর ফাস্টফুডের যুগে একমাত্র মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছে লাইক-কমেন্ট আর শেয়ারের গোপন সূত্র। ফেলে আসা নব্বই দশক এখন যেন অবাস্তবই। সহজ জীবনে দানা বাধা ডিপ্রেশন আর প্রতিযোগিতার ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে ‘লুকিয়ে’ পাওয়া-দেখা-খাওয়ার সমীকরণ। 

আগামীকাল বাঙালিদের ঘরে ঘরে বসন্ত পঞ্চমী। সরস্বতী পুজো। কোভিডের কারণে প্রায় সাত-আটমাস বন্ধ ছিল সমস্ত বিদ্যালয়। ছাত্র-ছাত্রীরা খানিক অভ্যস্ত হয়ে পড়ছিল অনলাইন ক্লাসে। সেখানে সরস্বতী পুজো তো দূরের কথা, বন্ধুদের সঙ্গে কীভাবে দেখা হবে তার উপায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। অবশেষে খুলল সমস্ত বিদ্যালয়। তবে অনেক বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভিড় এড়ানোর জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এবছর সরস্বতী পুজো করবেন না। করলে ওই নমোঃ নমোঃ করে। পড়ুয়াদের মনখারাপ কাটছে না। এমন অবস্থায় একটু নিয়ম ভাঙলে ক্ষতি কী! কুল খাওয়া না খাওয়ার এই অবাস্তব পৃথিবীতে এগুলোই তো একটুকরো বাঁচার রসদ।

Developed by DXDasia